Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: প্রতিটি মহামারিতে একই প্রশ্ন ওঠে — রোগটি এল কোথা থেকে? কোভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে আঙুল উঠেছিল হর্সশু বাদুড়ের দিকে, হান্টাভাইরাসের ক্ষেত্রে লম্বা-লেজওয়ালা পিগমি ধানের ইঁদুরের দিকে। কিন্তু ইবোলার ক্ষেত্রে বিষয়টি আজও অমীমাংসিত। রোগ আবিষ্কারের ৫০ বছর পরেও বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না, ঠিক কোন প্রাণী এই মারণ ভাইরাসের স্থায়ী আশ্রয়দাতা।
বাদুড়কেই সন্দেহ, কিন্তু প্রমাণ অপর্যাপ্ত
বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন বারবার একই দিকে ইঙ্গিত করেছে — টেরোপোডিডি পরিবারের ফলখেকো বাদুড়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০২৫ সালের এপ্রিলেও লিখেছে, এই বাদুড়গুলোকেই অর্থোইবোলাভাইরাসের “সম্ভাব্য” প্রাকৃতিক আশ্রয়দাতা মনে করা হয়।
তবে ২০২৩ সালে বায়োলজি লেটার্স পত্রিকায় প্রকাশিত এক গবেষণায় বাদুড়-বিশেষজ্ঞদের আন্তর্জাতিক দল ১৯৭৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১৬২টি গবেষণা পর্যালোচনা করে সরাসরি জানিয়েছে — আফ্রিকান ভাইরাস গবেষণায় বাদুড়কে আশ্রয়দাতা হিসেবে প্রমাণ করার মতো যথেষ্ট নিশ্চিৎ তথ্য নেই।
মারবার্গে প্রমাণ মিলেছে, ইবোলায় মেলেনি
একই পরিবারের ভাইরাস মারবার্গের ক্ষেত্রে ছবিটা অনেক স্পষ্ট। মিশরীয় ফলখেকো বাদুড় থেকে ভাইরাস আলাদা করা সম্ভব হয়েছে, মানুষের শরীরে পাওয়া ভাইরাসের সঙ্গে ৯৯.৩ শতাংশ জিনগত মিল মিলেছে এবং পরীক্ষাগারে দেখানো গেছে যে বাদুড় কোনও উপসর্গ ছাড়াই ভাইরাস বহন ও ছড়াতে পারে।
কিন্তু ইবোলার ক্ষেত্রে এর কিছুই সম্ভব হয়নি। ভাইরাস আবিষ্কারের ৫০ বছর পরেও কোনও বাদুড় থেকে ইবোলা ভাইরাস আলাদা করা যায়নি। ভাইরাসটি শিম্পাঞ্জি, গরিলা, অ্যান্টিলোপ ও সজারুতে পাওয়া গেছে বটে, তবে এরা গৌণ আশ্রয়দাতা — সংক্রমিত হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মারা যায়, তাই এদের প্রধান সন্দেহভাজনের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায়।
অ্যান্টিবডি ও জিনগত চিহ্ন: অসম্পূর্ণ সাক্ষ্য
ফলখেকো বাদুড়ের শরীরে বারবার ইবোলার অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে। কিন্তু ফরাসি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IRD)-এর গবেষণা পরিচালক এরিক লেরো সতর্ক করেন — এর মানে কেবল এটুকুই যে প্রাণীটি কোনও এক সময় ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছিল। এর বেশি কিছু এই তথ্য বলে না।
২০০৫ সালে নেচার পত্রিকায় লেরো ও তাঁর সহকর্মীরা তিনটি বাদুড় প্রজাতির শরীরে ইবোলার জিনগত উপাদান খুঁজে পান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হিপসিগন্যাথাস মনস্ট্রোসাস— আফ্রিকার বৃহত্তম বাদুড়, যার দৈর্ঘ্য ২৮ সেন্টিমিটার এবং ডানার বিস্তার ২ মিটার পর্যন্ত। তবে লেরো নিজেই স্বীকার করেন, “বিশ বছর পরেও আমরাই একমাত্র দল যারা এটা পেয়েছি। তবুও এটা যথেষ্ট নয়।”
কোনও প্রাণী ভাইরাসের প্রকৃত স্থায়ী আশ্রয়দাতা কি না, তা প্রমাণ করতে হলে দেখাতে হবে যে ভাইরাসটি সেই প্রাণীর শরীরে কোনও উপসর্গ ছাড়াই বংশবিস্তার করতে পারে। এখন পর্যন্ত সেটি কেউ দেখাতে পারেননি।
বাদুড় খেয়ে শুরু হয়েছিল প্রাদুর্ভাব?
২০০৭ সালে ডিআরসিতে ইবোলার এক প্রাদুর্ভাবে ১৮৬ জন মারা যাওয়ার পর তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ওই বছরের এপ্রিল-মে মাসে হিপসিগন্যাথাস মনস্ট্রোসাস প্রজাতির একটি বিশাল বাদুড়ের ঝাঁক কয়েক সপ্তাহ স্থানীয় একটি পরিত্যক্ত পামগাছের বাগানে অবস্থান করেছিল। গ্রামবাসীরা সেই সুযোগে বাদুড় শিকার করে খান। মহামারি-সংক্রান্ত তদন্তে জানা যায়, সম্ভাব্য প্রথম রোগী একটি সদ্য মারা যাওয়া বাদুড় কিনে খেয়েছিলেন।
পিঁপড়ের পেটে লুকিয়ে আছে রহস্যের চাবিকাঠি?
রহস্যের সমাধানে এবার অভিনব পথে হাঁটছেন লেরো। তিনি আশ্রয় নিচ্ছেন আর্মি অ্যান্ট বা সৈনিক পিঁপড়ের যাদের ডাকনাম “আফ্রিকার আবর্জনা পরিষ্কারক”। এই পিঁপড়ের ঝাঁক পথে পড়া প্রায় সব মৃতদেহ খেয়ে ফেলে। গবেষকেরা ইতিমধ্যেই এই পোকাগুলোর পরিপাকতন্ত্রে ১৫৭টি ভিন্ন ভাইরাসের জিনগত অনুক্রম খুঁজে পেয়েছেন।
লেরোর ব্যাখ্যা: পিঁপড়ের পেটে ইবোলার চিহ্ন মিললে এবং তারা কোন প্রাণীর মৃতদেহ খেয়েছিল তা নির্ধারণ করা গেলে হয়তো বাদুড়ের পক্ষে আরও একটি প্রমাণ মিলবে অথবা সামনে আসবে সম্পূর্ণ নতুন কোনও আশ্রয়দাতা প্রাণী, যাকে এতদিন কেউ সন্দেহই করেননি।
ইবোলার রহস্য উন্মোচনের অপেক্ষায় বিজ্ঞান এখনও।