হাইলাইটস

  •  পরাজয়ের পরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করে চলেছেন, তৃণমূল হারেনি, তাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।
  •  দলের ভিতরে এই তত্ত্বে কার্যত কেউ বিশ্বাস করছে না, অথচ নেতৃত্ব নিজেদের অবস্থান থেকে একচুলও সরছে না।
  •  নেতাদের পদত্যাগ, সংগঠনের ভাঙন, কর্মীদের হতাশা— সবকিছুর মধ্যেও আত্মসমালোচনার বদলে চলছে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের চর্চা।
  •  দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে যে ‘বাস্তববিচ্ছিন্নতা’ তৈরি হয়, তারই ক্লাসিক উদাহরণ হয়ে উঠছে তৃণমূল।
  •  রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, যে দল পরাজয় স্বীকার করতে শেখে না, তার পুনরুত্থানও কঠিন হয়ে পড়ে।

পরাজয় নয়, সমুদ্রের ষড়যন্ত্র

রাজনীতিতে পরাজয়েরও একটা সৌন্দর্য আছে।

কেউ হেরে গিয়ে মাথা নিচু করেন। কেউ হেরে গিয়ে দলের কর্মীদের ডেকে বলেন, “ভুলটা কোথায় হল?” কেউ আবার ফলাফল বিশ্লেষণ করে নতুন করে পথ খোঁজেন।

কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে আমরা এখন এক অভিনব দৃশ্য দেখছি।

একটি দল পরাজিত হয়েছে। ব্যাপকভাবে হয়েছে। সংগঠনের ভিতরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। নেতারা দল ছাড়ছেন। কর্মীরা হতাশ। কিন্তু দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের বক্তব্য- তাঁরা হারেননি। তাঁদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এবং সেটাও এমন নয় যে পাঁচ-দশটি কেন্দ্রে কোনও অনিয়ম হয়েছে। অভিযোগের পরিধি একেবারে মহাকাব্যিক। প্রায় দেড়শো কেন্দ্রে।

অর্থাৎ এমন এক সর্বব্যাপী ষড়যন্ত্র, যার সামনে বিশ্বের সমস্ত গোয়েন্দা সংস্থা মিলেও নেহাত অপেশাদার বলে মনে হয়।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, এই তত্ত্বে বিরোধীরা বিশ্বাস করছে না, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দলের নিজেদের লোকেরাও বিশ্বাস করছে না।

তবু পিসি-ভাইপো অবিচল।

এ যেন টাইটানিক ডুবে যাচ্ছে, যাত্রীরা লাইফবোটে পালাচ্ছেন, অর্কেস্ট্রার সদস্যরাও বেহালা নামিয়ে ফেলেছেন, আর ক্যাপ্টেন দাঁড়িয়ে ঘোষণা করছেন—

“জাহাজ কোথাও যায়নি। সমুদ্রটাই ষড়যন্ত্র করছে।”

দল ছাড়ছে সবাই, কিন্তু ভুল করছেনা কেউ 

রাজনীতিতে আত্মপ্রবঞ্চনা নতুন নয়।

কিন্তু আত্মপ্রবঞ্চনারও একটা সীমা থাকে।

সাধারণত নেতারা বাইরে কর্মীদের সামনে আশাবাদী কথা বলেন, কিন্তু ভিতরে বসে বাস্তব বিশ্লেষণ করেন। কোথায় সংগঠন দুর্বল হল, কোথায় জনরোষ তৈরি হল, কোন সিদ্ধান্ত ভুল ছিল তা নিয়ে আলোচনা করেন।

এখানে সেই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না।

বরং দেখা যাচ্ছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য।

একদিকে নেতারা দল ছাড়ছেন।

অন্যদিকে নেতৃত্ব বলছে যে সব ঠিক আছে।

কেউ প্রকাশ্যে পদত্যাগ করছেন। কেউ “ব্যক্তিগত কারণ” দেখাচ্ছেন। কেউ আবার নতুন রাজনৈতিক আশ্রয়ের খোঁজে ব্যস্ত।

বাংলার রাজনৈতিক অভিধানে “ব্যক্তিগত কারণ” কথাটির প্রকৃত অর্থ সাধারণত—

“ডুবন্ত জাহাজে আর দাঁড়িয়ে থাকলে আমিও ডুবে যাব।”

কিন্তু জাহাজের ক্যাপ্টেন এখনও ঘোষণা করছেন “জাহাজ ভাসছে।”

যারা একসময় সব নিয়ন্ত্রণ করত, তারা আজ অসহায়?

এই যুক্তির মধ্যে সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি অন্যত্র।

পনেরো বছর ধরে বাংলার রাজনীতিতে যে দল প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক শক্তির প্রতীক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেছে, আজ তারাই বলছে তারা অসহায়।

একসময় দাবি ছিল—

পুলিশ তাঁদের কথা শোনে।

প্রশাসন তাঁদের কথা শোনে।

পঞ্চায়েত তাঁদের নিয়ন্ত্রণে।

বুথ তাঁদের নিয়ন্ত্রণে।

ক্লাব তাঁদের নিয়ন্ত্রণে।

রাস্তা তাঁদের নিয়ন্ত্রণে।

প্রতিষ্ঠান তাঁদের নিয়ন্ত্রণে।

অর্থাৎ রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি স্তরে তাঁদের প্রভাব।

কিন্তু আজ সেই একই দল বলছে—“আমাদের ভোট বাঁচানোর কেউ ছিল না।”

এ যেন সেই চোর, যিনি সারাজীবন অন্যের পকেট কেটে বেড়িয়েছেন, আর একদিন নিজের মানিব্যাগ হারিয়ে থানায় গিয়ে অভিযোগ করছেন— “দেশে আইনশৃঙ্খলা বলে আর কিছু নেই।”

সমস্যা ইভিএমে নয়, আয়নায়

দলের ভিতরে এখন একটা নীরব সত্য ঘুরে বেড়াচ্ছে।

কেউ প্রকাশ্যে বলছেন না।

কিন্তু প্রায় সকলেই বুঝছেন।

সমস্যাটা ইভিএমে নয়।

সমস্যাটা আয়নায়।

কারণ কোনও রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় তখনই আসে, যখন সে নিজের প্রতিচ্ছবিকে বাস্তবের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করতে শুরু করে।

দীর্ঘ ক্ষমতা সেই রোগ তৈরি করে।

চারপাশে তখন শুধু প্রশংসাবাহিনী থাকে।

“দিদির বিকল্প নেই।”

“অভিষেকই ভবিষ্যৎ।”

“মানুষ এখনও আমাদের সঙ্গেই আছে।”

এইসব বাক্য এত বেশি শোনা হয় যে একসময় নেতারাও সেগুলো বিশ্বাস করতে শুরু করেন।

ফলে জনগণ যখন উল্টো কথা বলে, তখন নেতারা জনগণকে নয়, ফলাফলকেই ভুল বলে ধরে নেন।

এ যেন পরীক্ষায় ফেল করা ছাত্র খাতা দেখে ঘোষণা করছে— “গণিতটাই ভুল।”

অভিষেক মডেলের পতন এবং ডেটার সীমাবদ্ধতা

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক প্রকল্পের বড় অংশটাই তৈরি হয়েছিল আধুনিকতা, ডেটা এবং ম্যানেজমেন্টের ভাষায়।

“ডায়মন্ড মডেল।”

“ডেটা-ড্রিভেন সংগঠন।”

“কর্পোরেট দক্ষতা।”

“নতুন প্রজন্মের রাজনীতি।”

এই শব্দগুলো বারবার উচ্চারিত হয়েছে।

কিন্তু রাজনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, ভোটারকে কখনও এক্সেল শিটে বন্দি করা যায় না।

মানুষ ডেটা নয়।

মানুষের রাগ আছে।

অপমানবোধ আছে।

ক্ষোভ আছে।

হতাশা আছে।

এই আবেগগুলো কোনও সফটওয়্যার মাপতে পারে না।

ফলে যখন বাস্তব ভোটের বাক্সে ধরা পড়ে, তখন বহু সময় সবচেয়ে নিখুঁত রাজনৈতিক মডেলও ভেঙে পড়ে।

আজ সেই দৃশ্যই দেখা যাচ্ছে।

ষড়যন্ত্রতত্ত্ব: পতনশীল শক্তির শেষ আশ্রয়

ইতিহাসে একটি জিনিস বারবার দেখা গেছে।

ক্ষমতা হারানো শাসকরা খুব কমই স্বীকার করেন যে জনগণ তাঁদের প্রত্যাখ্যান করেছে।

তাঁরা বরং নতুন নতুন ব্যাখ্যা খোঁজেন।

ষড়যন্ত্র।

বিশ্বাসঘাতকতা।

অদৃশ্য শক্তি।

বাইরের চক্রান্ত।

এই শব্দগুলো তখন রাজনৈতিক বিশ্লেষণের জায়গা দখল করে নেয়।

কারণ বাস্তব স্বীকার করা কঠিন।

বাস্তব স্বীকার করতে গেলে বলতে হয় “হ্যাঁ, আমরা ভুল করেছি।”

এই একটি বাক্যই সম্ভবত আজ তৃণমূল নেতৃত্বের কাছে সবচেয়ে কঠিন বাক্য।

শেষ কথা: বাস্তবের সঙ্গে লড়াইয়ে কেউ জেতে না

রাজনীতিতে পরাজয় শেষ কথা নয়।

বরং অনেক সময় পরাজয়ই পুনর্জন্মের শুরু।

কিন্তু তার জন্য প্রথম শর্ত হল বাস্তবকে স্বীকার করা।

যে দল ভুল স্বীকার করতে পারে, তার ফেরার সম্ভাবনা থাকে।

যে দল আত্মসমালোচনা করতে পারে, তার ভবিষ্যৎ থাকে।

কিন্তু যে দল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ছায়াকেও ষড়যন্ত্রকারী ভাবে, তার পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন।

আজ বাংলার রাজনৈতিক মঞ্চে তাই এক অদ্ভুত দৃশ্য।

মঞ্চে এখনও ডুয়েট চলছে।

একজন বলছেন “আমরা হারিনি।”

অন্যজন সুর মিলিয়ে বলছেন “আমাদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

আর দর্শকাসনে বসে মানুষ নিঃশব্দে ভাবছেন “তাহলে এতদিন রাজ্যটা চালাচ্ছিল কারা?”