Home খবরবঙ্গের ভোট রঙ্গ ইস্যুহীনতার নির্বাচন: বাংলার ভোটযুদ্ধে হারিয়ে গেল সাধারণ মানুষ

ইস্যুহীনতার নির্বাচন: বাংলার ভোটযুদ্ধে হারিয়ে গেল সাধারণ মানুষ

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 27 views 5 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের ভোটের মাঠে এবার একটি অদ্ভুত শূন্যতা। মাইকে গান বাজছে, মঞ্চে নেতারা গলা ফাটাচ্ছেন, দেয়ালে দেয়ালে প্রার্থীদের মুখ। কিন্তু সেই হট্টগোলের মধ্যে যা নেই, তা হল একটি সত্যিকারের রাজনৈতিক ইস্যু — এমন কোনো প্রশ্ন যা রাজ্যের ছয় কোটির বেশি ভোটারের জীবনকে সরাসরি স্পর্শ করে এবং যার উত্তর দিতে প্রতিযোগী দলগুলো বাধ্য অনুভব করে। বাংলার রাজনীতিতে ইস্যুহীন নির্বাচন আগেও হয়েছে, কিন্তু এবারের মতো এতটা নির্লজ্জভাবে তা প্রকাশ্যে আসেনি।

কর্মসংস্থান ও শিল্প: কথা হয়েছে, উত্তর আসেনি

কর্মসংস্থান, শিল্পের পুনরুজ্জীবন, বিলম্বিত নিয়োগ পরীক্ষা এবং নিয়োগ দুর্নীতির প্রভাব — এগুলো নিয়ে প্রচারের মঞ্চে কথা হয়েছে বটে। বিজেপি রাজ্য সরকারের সমালোচনায় চাকরি ও শিল্পকে সামনে রেখেছে, আর তৃণমূল কংগ্রেস কল্যাণ প্রকল্প ও পরিকাঠামো উন্নয়নের কথা বলেছে। কিন্তু এই কথাগুলো যতটা না নীতির প্রতিশ্রুতি, তার চেয়ে বেশি পারস্পরিক আক্রমণের ঢাল। চাকরির দাবিতে বছরের পর বছর রাস্তায় বসে থাকা চাকরিপ্রার্থীদের জন্য কোনো দল কংক্রিট রোডম্যাপ দেয়নি। শিল্পের নাম উচ্চারিত হয়েছে, কিন্তু কোথায় শিল্প আসবে, কার জমিতে, কোন শর্তে — এই প্রশ্নগুলো মঞ্চের আলোয় আসেনি।

ব্যক্তিগত আক্রমণের অন্তহীন উৎসব

পরিবর্তে যা এসেছে, তা হল ব্যক্তিগত আক্রমণের এক অন্তহীন উৎসব। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে বিজেপির মন্তব্য, আর তার পালটা তৃণমূলের তীক্ষ্ণ প্রতিক্রিয়া — এই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াই হয়ে উঠেছে নির্বাচনী প্রচারের মূল বিষয়বস্তু। তৃণমূল কংগ্রেস কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের একটি মন্তব্যকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি ‘বিদ্রূপ’ হিসেবে চিহ্নিত করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। অন্যদিকে ভোটার তালিকা ও নিরাপত্তা মোতায়েন নিয়েও দু’পক্ষের মধ্যে তীক্ষ্ণ বাকযুদ্ধ চলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই গালাগালির সংস্কৃতি এবার এতটাই তীব্র আকার নিয়েছে যে সাধারণ ভোটার অনেক সময় বুঝতেই পারছেন না কোন দল আসলে কী চাইছে।

ধর্মের আশ্রয়: মেরুকরণের রাজনীতি

এই শূন্যতার মধ্যে সবচেয়ে সুবিধাজনক আশ্রয় হয়ে উঠেছে ধর্ম। রাজ্যের বাঙালি হিন্দু জনগণের মধ্যে ধর্মীয় মেরুকরণ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। বামফ্রন্টের পতন এবং ২০১৯ সালের পর থেকে হিন্দুত্ববাদী শক্তির প্রসার এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। বাংলাদেশ থেকে কথিত অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘মুসলিম তোষণ’-এর দাবি মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বিজেপি এই আবেগকে সুচিন্তিতভাবে ব্যবহার করেছে। ধর্মের নামে যা বলা হচ্ছে তা অনেক সময় সত্যিকারের ধার্মিকতার সঙ্গে সম্পর্কহীন — এটি নিছক ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি, সাজানো ভয় ও কৃত্রিম শত্রুর গল্প।

ভোটার তালিকা: গণতন্ত্রের নিজেই রণক্ষেত্র

নির্বাচনী তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR পর্বে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ অনিষ্পন্ন মামলায় মুসলিম ভোটাররা, এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের দলিত হিন্দুরাও উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এই একটি তথ্যই বলে দেয় কীভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিজেই একটি রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তৃণমূল বলছে প্রকৃত ভোটাররা বঞ্চিত হচ্ছেন, বিজেপি বলছে ভুয়ো এন্ট্রি মুছে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু কোটি মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে এই টানাটানিতে গণতন্ত্রের যে বিপদ তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে কোনো দলের প্রকৃত উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে না।

CAA ও নাগরিকত্ব: জটিলতাকে সরলীকরণ

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা CAA-ও প্রচারে এসেছে, বিশেষত যেসব এলাকায় শরণার্থী ও মতুয়া রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূলের অভিযোগ, CAA, SIR এবং নাগরিকত্বের বক্তব্য একত্রে সংখ্যালঘু ও অভিবাসী সম্প্রদায়গুলির মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কিন্তু এই জটিল প্রশ্নগুলোকে সহজ প্রতিপক্ষ-শত্রু বয়ানে সরলীকৃত করে ফেলা হচ্ছে, যাতে ভোটার আবেগে উত্তাপিত হয়, ভাবতে না পারেন।

দুর্নীতি: অভিযোগ আছে, প্রতিশ্রুতি নেই

দুর্নীতির প্রসঙ্গটি বিরোধী প্রচারে এসেছে, কিন্তু তাও গভীরতায় পৌঁছায়নি। স্কুল সার্ভিস কমিশন নিয়োগ দুর্নীতি, গরু পাচার কাণ্ড, রেশন দুর্নীতি — এই সব মিলিয়ে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির একটি দীর্ঘ ফিরিস্তি তৈরি হয়েছে। বিজেপি এটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে ঠিকই, কিন্তু দলটি নিজে ক্ষমতায় এলে কী করবে, কোন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আনবে, বিচার ব্যবস্থাকে কীভাবে স্বাধীন করবে — এই প্রশ্নের কোনো উত্তর তারা দেয়নি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যিকারের লড়াই দাবি করতে হলে প্রতিশ্রুতি লাগে, শুধু অভিযোগ নয়।

হারানো বাংলা: তরুণ, কৃষক ও উন্নয়নের প্রশ্ন

যে বাংলা একসময় দেশের রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্র ছিল, যে রাজ্যে বামপন্থী আন্দোলন কৃষিসংস্কার ও ভূমি বণ্টনের নতুন ইতিহাস রচনা করেছিল, সেখানে আজ নির্বাচন মানে দুই শিবিরের পরস্পরবিরোধী চিৎকার। তরুণ প্রজন্ম, যারা রাজ্যে চাকরি না পেয়ে বাইরে পাড়ি দিচ্ছেন, তাঁদের জন্য কোনো দলের কাছে কোনো দৃষ্টিভঙ্গি নেই। কৃষক, যিনি ন্যায্য দামের অপেক্ষায় আছেন, তাঁর কথা কেউ বলছেন না। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার মান, পরিবেশ — এই বিষয়গুলো হয় অনুপস্থিত, নয়তো মঞ্চ গরম করার জন্য পরিসংখ্যানের খেলায় পরিণত।

ক্ষোভের ঢেউ, কর্মসূচির অভাব

পনেরো বছরের শাসনের পর তৃণমূলবিরোধী ক্লান্তি একটি ফ্যাক্টর বটে, তবে তা দুর্নীতি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলার অভিযোগগুলোর সঙ্গে মিলেমিশে গেছে, আলাদাভাবে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়নি। এই জটিলতাকে দলগুলো সুযোগ হিসেবে দেখেছে — পরিষ্কার কর্মসূচি না দিয়েও ক্ষোভের ঢেউকে নিজের দিকে ঘোরানো যায়, এই ধারণায়।

জবাবদিহিতাহীন গণতন্ত্র: সবচেয়ে বড় পরাজয় সাধারণ মানুষের

গণতন্ত্রের মূল কথা হল জবাবদিহিতা — ক্ষমতাপ্রার্থীরা ভোটারদের সামনে দাঁড়িয়ে বলবেন আমি কী করব এবং কেন। এই নির্বাচনে সেই কথোপকথন হয়নি। বদলে যা হয়েছে তা একটি মেলা — শব্দের মেলা, ঘৃণার মেলা, ভয়ের মেলা। ভোটার হয়তো রায় দেবেন, কিন্তু কার পক্ষে দিচ্ছেন তা যতটা না সমর্থনের প্রকাশ, তার চেয়ে বেশি একটি বিরুদ্ধতার বিবৃতি। আর এই শূন্যতার মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশি হারলেন, তিনি সেই সাধারণ বাঙালি, যিনি শুধু চেয়েছিলেন কেউ একটু তাঁর কথা বলুক।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles