Home খবরবঙ্গের ভোট রঙ্গ প্রশংসার পাত্র? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং একটি অসম্পূর্ণ রাজনৈতিক মূল্যায়ন

প্রশংসার পাত্র? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং একটি অসম্পূর্ণ রাজনৈতিক মূল্যায়ন

উত্তরাধিকারের রাজনীতি এবং যোগ্যতার প্রশ্ন

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 74 views 5 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: বাংলার রাজনীতিতে এই মুহূর্তে একটি অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ছে। ভোটের মরশুমে কবি-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী মহল সকলে মিলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুণগান গাইছেন। জয় গোস্বামীর মতো কবি, যাঁর কলম একদা নিপীড়িতের পক্ষে সরব থেকেছে, তিনিও এই প্রশংসার সারিতে যোগ দিয়েছেন।

এই প্রশংসা কি সত্যিই যুক্তিসম্মত? নাকি এটি নিছক ক্ষমতার আলোয় স্নান করার আকাঙ্ক্ষা? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন একটিমাত্র পরিচয় নিয়ে ,তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো। এটি কোনো অপবাদ নয়, এটি একটি তথ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিচয়ের বাইরে তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন, প্রশাসনিক দক্ষতা বা জনকল্যাণমূলক কাজের ভান্ডার কতটুকু? ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্র থেকে তিনি বারবার নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু এই নির্বাচনী সাফল্যকে কি ব্যক্তিগত যোগ্যতার প্রমাণ বলা চলে? বাংলার বাস্তবতা জানেন যাঁরা, তাঁরা জানেন এই রাজ্যে তৃণমূলের শক্তিশালী বুথ ব্যবস্থাপনা এবং দলের পেশীবল ছাড়া ডায়মন্ড হারবারে জেতা মানেই ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার নিদর্শন নয়। সেই একই কেন্দ্রে যদি অন্য কোনো তৃণমূল প্রার্থী দেওয়া হতো, তিনিও কি জিততেন না? সম্ভবত জিততেন। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এই জয় আসলে কার — ব্যক্তি অভিষেকের, নাকি দলের, নাকি পিসিমার?

যাঁরা তাঁর প্রশংসা করছেন, তাঁরা প্রায়ই বলেন তিনি “নতুন প্রজন্মের নেতা”, “তরুণ মুখ”, “আধুনিক রাজনীতিবিদ”। কিন্তু তারুণ্য বা আধুনিকতা কি নিজেই যোগ্যতার মাপকাঠি? তারুণ্য থাকলেই কি দুর্নীতির দায় মাফ হয়ে যায়? আধুনিক বক্তৃতার ভাষা থাকলেই কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকা পড়ে?

কয়লা কাণ্ড, গরু পাচার এবং প্রশ্নবিদ্ধ নাম

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে বাংলায় একের পর এক দুর্নীতির তদন্ত মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কয়লা পাচার কাণ্ড, গরু পাচার কাণ্ড, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি — এই সব ঘটনার তদন্তে সিবিআই এবং ইডি যখন তৎপর হয়েছে, তখন বারবার একটি নামই উঠে এসেছে — অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর স্ত্রী রুজিরা নারুলা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তদন্তকারী সংস্থা জিজ্ঞাসাবাদ করতে চেয়েছে, সমন পাঠিয়েছে। অভিষেক নিজেও ইডির জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়েছেন। এখন কেউ বলতে পারেন, এগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা। হয়তো কিছু ক্ষেত্রে তা-ও হতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধীদের বিরুদ্ধে তদন্তকারী সংস্থাকে ব্যবহার করে  এই অভিযোগ সত্য এবং গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই যুক্তিটিকে সর্বজনীন ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কি সমস্ত প্রশ্নকে নস্যাৎ করা যায়? তদন্ত রাজনৈতিক হলেই কি অভিযুক্ত নিরপরাধ? এই সরলীকরণটি গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। কয়লা পাচার মামলায় তাঁর ঘনিষ্ঠদের নাম বারবার উঠে আসা, শিক্ষা দফতরের নিয়োগ দুর্নীতিতে তৃণমূলের একাধিক নেতার গ্রেফতার এবং সেই সময়ে দলের সর্বোচ্চ পদে থেকে অভিষেকের নীরবতা, এগুলো নিছক কাকতালীয় ঘটনা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যাঁরা আজ তাঁর প্রশংসা করছেন, তাঁরা কি এই প্রশ্নগুলোর সদুত্তর দিতে পারবেন?

বুদ্ধিজীবীর প্রশংসা এবং ক্ষমতার মৌতাত

জয় গোস্বামীর মতো কবি যখন কোনো রাজনৈতিক নেতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন, তখন স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন জাগে — এই প্রশংসার উৎস কোথায়? বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বুদ্ধিজীবীরা বারবার ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেছেন, ক্ষমতার আলোয় নিজেদের আলোকিত করে নিয়েছেন। বামপন্থী শাসনের সময় এই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল, তৃণমূল আমলেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রশংসার এই সংস্কৃতিটি আসলে একটি পারস্পরিক লেনদেন। কবি বা বুদ্ধিজীবী তাঁর সাংস্কৃতিক মূলধন ব্যয় করেন নেতার ভাবমূর্তি নির্মাণে। বিনিময়ে তাঁরা পান ক্ষমতার সান্নিধ্য, সরকারি পুরস্কার, সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানে পদ, বা শুধুমাত্র “গুরুত্বপূর্ণ” মানুষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার তৃপ্তি। জয় গোস্বামী একজন প্রতিভাবান কবি ,এতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁর কাব্যপ্রতিভা এবং তাঁর রাজনৈতিক বিচারবুদ্ধি, এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। একজন বড় কবি নিজের পছন্দের রাজনৈতিক নেতার প্রশংসা করলেই সেই নেতা প্রশংসার যোগ্য হয়ে যান না। কবিতার সৌন্দর্যবোধ রাজনৈতিক দুর্নীতির দায় মোচন করতে পারে না।

“ইউথ আইকন” মিথটির বিশ্লেষণ

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর সমর্থকরা প্রায়ই “তরুণ প্রজন্মের আশার আলো” বলে চিহ্নিত করেন। এই ভাষ্যটি নির্মাণে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে দলের নিয়মিত প্রচার — সবকিছুর ভূমিকা আছে। কিন্তু এই নির্মাণটির ভেতরে কী আছে, সেটা দেখা দরকার। তরুণ বলতে যদি বোঝায় বয়সে অল্প এবং ইংরেজিতে সাবলীল, তাহলে অভিষেক নিঃসন্দেহে “তরুণ”। কিন্তু তরুণ মানে কি শুধু বয়স? নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদ মানে কি শুধু ইনস্টাগ্রাম পেজ আর ইংরেজি বক্তৃতা? তরুণ রাজনীতিবিদ হওয়ার অর্থ কি এই নয় যে তিনি পুরনো স্বজনতোষণকারী রাজনীতির বাইরে গিয়ে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করবেন? সেই মাপকাঠিতে অভিষেক কতটা “নতুন”? তিনি পিসিমার ছায়ায় রাজনীতিতে এসেছেন, পিসিমার দলের সর্বেসর্বা হয়েছেন, দলের ভেতরে এমন একটি বলয় তৈরি করেছেন যেখানে “অভিষেক ঘনিষ্ঠ” এবং “অভিষেক বিরোধী” এই দুই শিবির স্পষ্ট। তৃণমূলের ভেতরকার দলাদলির কথা যাঁরা জানেন, তাঁরা জানেন এই বিভাজন কতটা গভীর এবং কতটা ক্ষতিকর। তাঁর তরুণ চেহারার আড়ালে আসলে সেই পুরনো পারিবারিক রাজতন্ত্রের রাজনীতি, যেখানে মেধা বা জনসেবার যোগ্যতা নয়, রক্তের সম্পর্কই সর্বোচ্চ নির্বাচনী মাপকাঠি।

ডায়মন্ড হারবারের বাস্তবতা

অভিষেকের সমর্থকরা বলেন তিনি তাঁর নির্বাচনী কেন্দ্রের জন্য অনেক কাজ করেছেন। এই দাবিটি একটু খতিয়ে দেখা দরকার। ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রটি সুন্দরবন সংলগ্ন একটি অত্যন্ত দরিদ্র, পিছিয়ে পড়া অঞ্চল। এই কেন্দ্রে বছরের পর বছর ধরে যে সমস্যাগুলো রয়েছে, বন্যা, নদীভাঙন, মৎস্যজীবীদের দুর্দশা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অভাব, সেগুলো কি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে? সংসদে তাঁর উপস্থিতি এবং বক্তৃতার রেকর্ড দেখলে কী পাওয়া যায়? লোকসভার অধিবেশনে তাঁর যোগদানের হার, প্রশ্ন উত্থাপনের সংখ্যা, কমিটির কাজে অংশগ্রহণ, এই সূচকগুলোতে তিনি কি সত্যিই উজ্জ্বল? একজন দলীয় নেতা হিসেবে লোকসভায় তাঁর ভূমিকা মূলত মমতা সরকারের পক্ষে সাফাই গাওয়া এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করা। এটি দলীয় দায়িত্ব পালন, জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন নয়।

ভয়ের রাজনীতি এবং প্রশংসার প্রণোদনা

বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক বাতাবরণে একটি বিষয় খুবই স্পষ্ট — যাঁরা তৃণমূলের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাঁদের মূল্য চোকাতে হয়। সাংবাদিক থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক  কেউই এই রাজনৈতিক চাপের বাইরে নন। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে, যাঁরা অভিষেকের প্রশংসা করছেন তাঁরা কি সত্যিকারের বিশ্বাস থেকে করছেন, নাকি এই প্রশংসার পেছনে ভয়ের একটি অদৃশ্য ছায়া আছে? বাংলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আজ যে মানুষটি তৃণমূল বা অভিষেকের সমালোচনা করেন, তিনি সরকারি অনুষ্ঠান থেকে বাদ পড়তে পারেন, পুরস্কার হারাতে পারেন, সামাজিকভাবে কোণঠাসা হতে পারেন। এই পরিবেশে “স্বতঃস্ফূর্ত প্রশংসা” এবং “বাধ্য হয়ে প্রশংসা”  এই দুটির মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তুলনামূলক মূল্যায়ন এবং মিথ্যা দ্বিধাবিভাজন

অভিষেকের প্রশংসকরা প্রায়ই তাঁকে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। এই ফ্রেমিংটি চতুর, কারণ বিজেপির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানেই ভালো নেতা  এই যুক্তিটি বাংলার উদারপন্থী মহলে সহজে গ্রাহ্য হয়। কিন্তু এই যুক্তিটি একটি মিথ্যা দ্বিধাবিভাজন তৈরি করে। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং নিজে দুর্নীতিমুক্ত শাসন দেওয়া  এই দুটি একসঙ্গে করা কি সম্ভব নয়? একজন নেতা বিজেপির বিরোধী হলেই কি তিনি প্রশংসার যোগ্য হয়ে যান, তাঁর নিজের দলের দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা নির্বিশেষে? এই যুক্তি মানলে বাংলার মানুষ চিরকাল “কম খারাপ” বেছে নিতে বাধ্য হবে, “ভালো” পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে

প্রশংসার দায়িত্ব

জয় গোস্বামীর মতো বড় কবির একটি কথা সমাজে যে ওজন বহন করে, সাধারণ মানুষের একটি কথা তা করে না। এই সামাজিক দায়িত্বটি তাঁর মনে রাখার কথা। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা করার আগে যদি তিনি এবং অন্যান্য প্রশংসকরা কয়েকটি প্রশ্নের সৎ উত্তর দেওয়া আবশ‍্যক। তাঁর পরিচয় কি স্বজনতন্ত্রের উদাহরণ নয়? তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা তদন্তের প্রশ্নগুলো কি সম্পূর্ণরূপে নিষ্পত্তি হয়েছে? তাঁর নেতৃত্বে তৃণমূল কি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক দল হয়ে উঠেছে? তাহলে হয়তো প্রশংসার পরিমাণটা কিছুটা সংযত হতো। ভোটের আগে প্রশংসার জোয়ার আসে। ভোট চলে গেলে সেই জোয়ার ভাটায় পরিণত হয়। বাংলার মানুষ এই চক্রটি বহুবার দেখেছে। যাঁরা আজ প্রশংসা করছেন, তাঁরা হয়তো জানেন যে এই প্রশংসা কতটা সাময়িক, কতটা সুবিধাবাদী। কিন্তু তবুও করছেন, কারণ এই মুহূর্তে এটাই লাভজনক।

নির্মম ইতিহাস কিন্তু মনে রাখে।​​​​​​​​​​​​​​​​

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles