বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রস্তাবিত অন্নপূর্ণা যোজনার ১১ পাতার ফর্ম প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই একটি প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে—এটি কি সত্যিই শুধুমাত্র একটি মহিলা কল্যাণ প্রকল্প, নাকি এর আড়ালে আরও বড় কোনও উদ্দেশ্য রয়েছে? কারণ সাধারণত একটি মাসিক ভাতা প্রকল্পের জন্য যত তথ্য প্রয়োজন, এই ফর্মে তার চেয়ে অনেক বেশি তথ্য চাওয়া হয়েছে।

এই কারণেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে একটি প্রশ্ন—অন্নপূর্ণা যোজনা কি ওয়েলফেয়ার স্কিমের চেয়ে বেশি একটি ডেটা কালেকশন এক্সার্সাইজ?

প্রথমেই দেখা যাক, ফর্মটিতে কী ধরনের তথ্য চাওয়া হয়েছে।

শুধু আবেদনকারী মহিলার নাম বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নয়; পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের নাম, আধার নম্বর, ভোটার কার্ড নম্বর, মোবাইল নম্বর, পেশা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, প্যান কার্ড, সম্পত্তির বিবরণ, জমির নথি, গাড়ি আছে কি না, অন্য সরকারি সুবিধা পাওয়া হচ্ছে কি না—এই সব কিছু জানতে চাওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ সরকার শুধু একজন উপভোক্তাকে চিহ্নিত করতে চাইছে না; একটি সম্পূর্ণ পরিবারের সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রোফাইল তৈরি করতে চাইছে।

এখানেই প্রশ্ন উঠছে—একটি ভাতা প্রকল্পের জন্য এত বিস্তৃত তথ্য কি সত্যিই প্রয়োজন?

বিজেপির যুক্তি অবশ্য আলাদা। তাদের বক্তব্য, বর্তমান কল্যাণ প্রকল্পে বিপুল সংখ্যক অযোগ্য মানুষ ঢুকে পড়েছেন। মৃত ব্যক্তি, ভুয়ো নাম, প্রকৃত বাসিন্দা নন এমন মানুষ—সব মিলিয়ে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে। ফলে প্রকৃত উপভোক্তাকে চিহ্নিত করতে গেলে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতেই হবে।

এই যুক্তির বাস্তব ভিত্তিও কিছুটা আছে।

ভারতের প্রায় সব রাজ্যেই ওয়েলফেয়ার স্কিমে ডুপ্লিকেশন, ঘোস্ট বেনিফিশিয়ারি এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নাম তোলার অভিযোগ রয়েছে। ফলে আধুনিক কল্যাণনীতিতে তথ্য-ভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ (ডেটা-ড্রিভেন টার্গেটিং) এখন একটি বড় প্রবণতা। কেন্দ্রীয় সরকারও রেশন, গ্যাস, আবাসন, কৃষি সহায়তা, সব ক্ষেত্রেই আধার-সংযুক্ত ডেটাবেস তৈরির দিকে গিয়েছে।

অন্নপূর্ণা যোজনা সেই বৃহত্তর প্রবণতারই একটি রাজ্যভিত্তিক সংস্করণ হতে পারে।

কিন্তু এখানেই অন্য প্রশ্ন উঠে আসে।

যদি লক্ষ্য শুধুই মহিলা ভাতা দেওয়া হয়, তাহলে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের ব্যাংক তথ্য, ভোটার তথ্য, সম্পত্তির খুঁটিনাটি, পেশাগত পরিচয়—এসব কেন প্রয়োজন? সমালোচকদের মতে, এই ফর্ম আসলে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবহারের জন্য একটি বিশাল ভোটার-আর্থসামাজিক ডেটাবেস (Voter-Socioeconomic Database) তৈরির চেষ্টা।

এবং বাস্তবে সেই আশঙ্কা একেবারে অমূলকও নয়।

কারণ এই ধরনের তথ্য এক জায়গায় জমা হলে সরকার বা রাজনৈতিক দল সহজেই বুঝতে পারে—

কোন এলাকায় কোন ধরনের ভোটার বেশি,
কার আর্থিক অবস্থা কেমন,
কোন পরিবার কোন প্রকল্প পাচ্ছে,
কোন পরিবার সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল,
কোথায় অসন্তোষ বেশি,
কোথায় রাজনৈতিক সমর্থন গড়ে তোলা সম্ভব।

অর্থাৎ, কল্যাণমূলক প্রকল্পের আবেদনপত্র ধীরে ধীরে রাজনৈতিক তথ্য সংগ্রহের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।

বিশেষ করে ভোটার কার্ডের বিধানসভা ও পার্ট নম্বর পর্যন্ত চাওয়া হওয়ার ফলে এই বিতর্ক আরও বেড়েছে। কারণ এতে প্রশাসনিক যাচাইয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক ম্যাপিং-এর সম্ভাবনাও তৈরি হয়।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—ভারতের রাজনীতিতে জনকল্যাণ এবং নজরদারির সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

একসময় কল্যাণ প্রকল্প মানে ছিল সাধারণ ভর্তুকি। কিন্তু এখন রাষ্ট্র ক্রমশ নাগরিকের সম্পর্কে আরও বেশি তথ্য জানতে চাইছে। আধার, মোবাইল, ব্যাংক, ডিজিটাল রেশন, স্বাস্থ্যবিমা—সব একসঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি ইন্টিগ্রেটেড সিটিজেন প্রোফাইল (Integrated Citizen Profile) তৈরি করছে।

এই পরিবর্তনের সমর্থকেরা বলেন, এতে দুর্নীতি কমে, ভুয়ো উপভোক্তা বাদ যায় এবং সরকারি অর্থ সঠিক জায়গায় পৌঁছয়।

সমালোচকেরা বলেন, এতে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম সেই বৃহত্তর জাতীয় বিতর্ককেও বাংলার রাজনীতিতে নিয়ে এসেছে।

আরও একটি সূক্ষ্ম রাজনৈতিক দিক এখানে আছে।

লক্ষ্মীর ভান্ডারের জনপ্রিয়তার বড় কারণ ছিল তার সরলতা। মানুষ মনে করতেন সরকার তাঁদের খুব বেশি সন্দেহ করছে না। অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্মে কিন্তু উল্টো বার্তাও যেতে পারে—রাষ্ট্র প্রথমেই ধরে নিচ্ছে আবেদনকারীকে যাচাই করা প্রয়োজন।

এই মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি ওয়েলফেয়ার নাগরিককে “অধিকারভিত্তিক সুবিধাপ্রাপক” হিসেবে দেখে।
অন্যটি নাগরিককে “যাচাইযোগ্য আবেদনকারী” হিসেবে দেখে।

অন্নপূর্ণা যোজনা আপাতত দ্বিতীয় মডেলের দিকে ঝুঁকছে বলেই মনে হচ্ছে।

তবে এটাও সত্যি যে ভবিষ্যতের কল্যাণ রাজনীতি সম্ভবত এদিকেই এগোবে। কারণ সরকারগুলি এখন শুধু ভাতা দিতে চায় না; তারা জানতে চায় কারা সেই ভাতা পাচ্ছেন, তাঁদের আর্থিক অবস্থান কী, তাঁরা আর কী কী সুবিধা নিচ্ছেন, এবং ভবিষ্যতে কোন সামাজিক গোষ্ঠীকে কীভাবে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করা যায়।

ফলে অন্নপূর্ণা যোজনার ১১ পাতার ফর্মকে শুধু একটি আবেদনপত্র হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একই সঙ্গে তিনটি জিনিস—

একটি সম্ভাব্য মহিলা কল্যাণ প্রকল্প,
একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক জরিপ,
এবং একটি রাজনৈতিক ডেটাবেস তৈরির প্রচেষ্টা।

এই তিনটির মধ্যে কোনটি শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, সেটাই এখন দেখার।