বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে “লক্ষ্মীর ভান্ডার” এখন আর শুধু একটি সরকারি প্রকল্প নয়। গত কয়েক বছরে এটি বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে। গ্রামের উঠোন থেকে শহরতলির রান্নাঘর—অসংখ্য মহিলার মাসের সংসার চালানোর হিসেবের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে এই টাকা। কেউ ওষুধ কেনেন, কেউ নাতির স্কুলফি দেন, কেউ আবার বাজারের খরচ সামলান। ফলে বিরোধীরা যতই সমালোচনা করুক, একটা সত্য এখন স্পষ্ট—লক্ষ্মীর ভান্ডার বাংলার মহিলা ভোটনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছে।

এই কারণেই বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই বুঝতে পারছিল, শুধু লক্ষ্মীর ভান্ডারের সমালোচনা করে লাভ নেই। পাল্টা কোনও বিকল্প দেখাতেই হবে। সেই প্রেক্ষাপটেই সম্প্রতি শুভেন্দু অধিকারী বিজেপির প্রস্তাবিত “অন্নপূর্ণা যোজনা”-র ১১ পাতার ফর্ম প্রকাশ করেছেন। রাজনৈতিক মহলে সঙ্গে সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে—এ কি তবে লক্ষ্মীর ভান্ডারের সরাসরি বিকল্প? নাকি আরও বড় কোনও সামাজিক প্রকল্পের প্রস্তুতি?

দুটি প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল হল দুটিই মহিলাদের কেন্দ্র করে তৈরি। কিন্তু এখানেই মিল প্রায় শেষ। কারণ ভিতরের দর্শন, উপভোক্তা বাছাইয়ের পদ্ধতি এবং রাষ্ট্র নাগরিককে কীভাবে দেখছে, এই জায়গাগুলিতে বড় পার্থক্য রয়েছে।

লক্ষ্মীর ভান্ডারের দর্শন খুব সহজ। সরকার বলেছে—সংসারের মহিলারা যে অদৃশ্য শ্রম করেন, তারও মূল্য আছে। রান্না, সন্তান পালন, বৃদ্ধদের দেখাশোনা, সংসার চালানো এসবের কোনও বাজারদর নেই ঠিকই, কিন্তু এগুলি ছাড়া সমাজও চলে না। তাই প্রতি মাসে সরাসরি মহিলাদের হাতে কিছু টাকা পৌঁছে দেওয়া হবে।

এই প্রকল্পের জনপ্রিয়তার পিছনে আরেকটি বড় কারণ হল এর সরলতা। আবেদনপত্র খুব জটিল নয়। বয়স, পরিচয়পত্র, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, রেশন কার্ড—এই ধরনের সাধারণ তথ্য দিলেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে আবেদন করা যায়। সরকারি চাকরিজীবী বা আয়করদাতা পরিবার বাদ গেলেও, বাস্তবে বিপুল সংখ্যক নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মহিলা এর আওতায় এসেছেন।

ফলে গ্রামের বহু মহিলার কাছে এটি প্রথম “নিজের টাকা”। পরিবারের পুরুষ সদস্যের হাত ঘুরে নয়, সরাসরি নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা আসছে। এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনটিই লক্ষ্মীর ভান্ডারকে শুধু একটি প্রকল্পের সীমা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে।

অন্যদিকে বিজেপির প্রস্তাবিত অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম দেখে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মানসিকতা বোঝা যাচ্ছে।

১১ পাতার ফর্মটি হাতে নিলে প্রথমেই চোখে পড়ে তথ্যের বিপুল পরিমাণ। পরিবারের আয় কত, বাড়িতে কী সম্পত্তি আছে, বিদ্যুতের সংযোগ কেমন, গ্যাস আছে কি না, গাড়ি আছে কি না, পরিবারের আর কে কে সরকারি সুবিধা পাচ্ছেন, ব্যাংকের বিবরণ, রেশন কার্ডের ধরন—এমন অসংখ্য তথ্য চাওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ এখানে মূল জোর “কে সত্যিই দরিদ্র” সেটি নির্ধারণে।

লক্ষ্মীর ভান্ডারের ক্ষেত্রে সরকার অনেকটা বিস্তৃত ভিত্তিতে সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু অন্নপূর্ণা যোজনার কাঠামো দেখে মনে হচ্ছে বিজেপি আরও কড়া বাছাই করতে চাইছে। তাদের যুক্তি সম্ভবত এই যে রাষ্ট্রের টাকা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিলে অপচয় হয়; প্রকৃত দরিদ্রকে চিহ্নিত করেই সাহায্য দিতে হবে।

এখানেই দুটি প্রকল্পের রাজনৈতিক দর্শনের সংঘর্ষ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

লক্ষ্মীর ভান্ডারের মূল কথা—“বেশি সংখ্যক মহিলাকে অন্তর্ভুক্ত করা”।
অন্নপূর্ণা যোজনার সম্ভাব্য মূল কথা—“যারা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনমন্দ, শুধু তাদের বেছে নেওয়া”।

একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কল্যাণনীতির রাজনীতি।
অন্যটি লক্ষ্যভিত্তিক কল্যাণনীতির রাজনীতি।

কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে বিষয়টি এত সরল নয়।

কারণ বাংলার মানুষ কল্যাণ প্রকল্পের সঙ্গে শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন না, আবেগগত সম্পর্কও তৈরি করেন। লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা হয়তো খুব বড় অঙ্ক নয়, কিন্তু নিয়মিত আসে। সেই নিয়মিততা থেকেই ভরসা তৈরি হয়। গ্রামের বহু মহিলা বলেন, “নিজের একটা টাকা আছে।” এই “নিজের” শব্দটাই গুরুত্বপূর্ণ।

অন্নপূর্ণা যোজনার ক্ষেত্রে বিজেপি আপাতত সেই আবেগের বদলে “যাচাই” এবং “যোগ্যতা”-র ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—অতিরিক্ত তথ্য, কাগজপত্র, যাচাই-বাছাই কি সাধারণ মানুষের কাছে প্রকল্পটিকে কঠিন করে তুলবে?

আবার বিজেপির সমর্থকেরা বলছেন, এটাই দায়িত্বশীল পদ্ধতি। তাঁদের যুক্তি, লক্ষ্মীর ভান্ডারে এমন বহু মানুষ সুবিধা পাচ্ছেন যাঁদের প্রকৃতপক্ষে সেই সহায়তার প্রয়োজন নেই। ফলে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে। অন্নপূর্ণা যোজনার মাধ্যমে তারা “লিকেজ” বন্ধ করতে চাইছে।

কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে কল্যাণ শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়, উপলব্ধিরও বিষয়।

যে প্রকল্পে মানুষ মনে করেন “কম ঝামেলায় সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে”, সেটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়। যে প্রকল্পে মানুষ ভাবেন “অনেক জেরা, অনেক বাদ পড়ার ভয়”, সেখানে রাজনৈতিক প্রতিরোধও তৈরি হতে পারে।

তাই অন্নপূর্ণা যোজনার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে বিজেপি শেষ পর্যন্ত কোন পথে হাঁটে তার ওপর। যদি তারা লক্ষ্মীর ভান্ডারের চেয়ে বেশি অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় কিন্তু যোগ্যতার শর্ত অত্যন্ত কঠোর রাখে, তাহলে এক ধরনের সমস্যা হবে। আবার যদি খুব বেশি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করতে যায়, তাহলে সেই প্রকল্পের আর্থিক চাপ বিশাল হয়ে দাঁড়াবে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত অন্য জায়গায়। বিজেপি কার্যত মেনে নিয়েছে যে বাংলার রাজনীতিতে এখন নগদ সামাজিক সহায়তা-কেন্দ্রিক কল্যাণনীতি এড়িয়ে চলা অসম্ভব। একসময় যেসব দল “ফ্রি-খোর সংস্কৃতি” বলে এই ধরনের প্রকল্পের সমালোচনা করত, তারাও এখন পাল্টা ওয়েলফেয়ার আর্কিটেকচার তৈরি করতে বাধ্য হচ্ছে।

অর্থাৎ লড়াইটা এখন আর “ভাতা থাকবে কি থাকবে না” সেই প্রশ্নে নয়।
লড়াইটা এখন কার ভাতা বেশি কার্যকর, কার প্রকল্প বেশি বিশ্বাসযোগ্য, আর কার ওপর বাংলার মহিলারা বেশি ভরসা করবেন।