মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান ও আমেরিকার মধ্যে নতুন করে বড় মাপের যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। সেই প্রচেষ্টার কেন্দ্রে রয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তেহরানের কাছে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে তাঁর পাঠানো একটি ব্যক্তিগত চিঠির জবাবের অপেক্ষায় এখন ওয়াশিংটন। তবে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আগাম কোনও বড় অঙ্গীকার করতে নারাজ ইরান। ফলে নতুন করে সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
কাতারের মধ্যস্থতায় তৈরি হওয়া ওই চিঠি রবিবার ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসেন রেজাইয়ের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, আলোচনার প্রক্রিয়া শুরুর আগেই পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কিছু অঙ্গীকার করতে হবে তেহরানকে। তার পর সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী খুলে দেবে ইরান। বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে আমেরিকা।
শীঘ্রই জবাব দিতে পারে তেহরান। তবে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে এমন কোনও প্রতিশ্রুতি দিতে নারাজ ইরান, যা একবার কার্যকর হলে আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। যেমন, অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত তৃতীয় কোনও দেশে পাঠিয়ে দেওয়া। তেহরানের আশঙ্কা, এর বিনিময়ে আমেরিকা তেল রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও পরে তা আবার ফিরিয়ে আনতে পারে। অর্থাৎ, ইরান একবার নিজের দর-কষাকষির হাতিয়ার ছেড়ে দিলে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে সমপরিমাণ নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে না।
এই অবিশ্বাস কাটাতে দু’পক্ষের অঙ্গীকার পালনের নিশ্চয়তা দিতে পারে, এমন কোনও তৃতীয় পক্ষকে যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বারবার উঠে এসেছে চিনের নাম। আন্তর্জাতিক প্রভাব ও কূটনৈতিক ক্ষমতার নিরিখে দু’পক্ষের মধ্যে সমঝোতা কার্যকর রাখার মতো অবস্থানে একমাত্র চিনই রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
যুদ্ধের ব্যাপারে সংশয়ী ভ্যান্সের ফের আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এতে স্পষ্ট, ওয়াশিংটন এখনও কূটনীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
এ দিকে, ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে অবহিত এক ডেমোক্র্যাট সেনেটর নতুন করে যুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এই পরিকল্পনা ‘উন্মত্ত’। এর পরিণতিতে ‘আইনের শাসনের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার সম্ভবত ধ্বংস হয়ে যাবে’।
কে আগে কোন পদক্ষেপ করবে, তা নিয়ে আমেরিকার দাবি মেনে নিতে ইরানের অনীহা স্পষ্ট হয়েছে সে দেশের প্রধান আলোচক মহম্মদ গালিবাফের বক্তব্যে। সমাজমাধ্যম এক্স-এ তিনি লিখেছেন, “ইরানের শর্তগুলি মধ্যস্থতাকারীদের বারবার স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে। প্রলোভন আর হুমকির কৌশল ইরানের উপর কোনও প্রভাব ফেলে না। ইরানের সাতটি শর্ত মেনে নেওয়া হলেই কেবল অগ্রগতি সম্ভব।”
ইরানের সেই শর্তগুলির মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আটকে থাকা সম্পদের উপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া এবং সব রণাঙ্গনে যুদ্ধের অবসান। শেষের শর্তটির তাৎপর্য হল, লেবাননেও ইজরায়েলকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে।
অন্য দিকে, আলোচনার শুরুতেই অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার চাইছে আমেরিকা। কিন্তু নিজেদের এই গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির হাতিয়ার ছাড়তে রাজি নয় তেহরান। রাষ্ট্রপুঞ্জের পরমাণু পরিদর্শকদের ফেরানোর বিষয়েও আপত্তি রয়েছে তাদের। ইরানের আশঙ্কা, পরিদর্শকেরা ইউরেনিয়ামের অবস্থান ও পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে তা আমেরিকার হাতে তুলে দিতে পারেন।
এর বদলে ইরানের পাল্টা প্রস্তাব, মজুত অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সঙ্গে কম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মিশিয়ে তার সমৃদ্ধির মাত্রা এমন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হোক, যাতে তা দিয়ে আর পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব না হয়।
সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে কারা?
ভ্যান্স তাঁর চিঠি ইরানের প্রধান আলোচক গালিবাফ কিংবা বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে পাঠাননি। পরিবর্তে চিঠি পাঠানো হয়েছে মহসেন রেজাইকে। ওয়াশিংটনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা মূলত তাঁদের হাতেই, যাঁরা ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের ঘনিষ্ঠ। বাস্তবে সরকারের সর্বোচ্চ স্তরের ছয় সদস্যের একটি কমিটির মাধ্যমে ঐকমত্য তৈরি করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করে তেহরান।
নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা করতে গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইয়ের সঙ্গে দেখা করেন গালিবাফ ও রেজাই। খামেনেই জানিয়েছেন, বর্তমানের ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ পরিস্থিতির অবসান চান তিনি।
তবে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও সামরিক প্রস্তুতি থেকে সরে আসেনি ইরান। এই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থে পাল্টা আঘাত হানার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রের জল লবণমুক্ত করার কারখানা, ইন্টারনেটের কেব্ল এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় হামলা চালাতে পারে তেহরান।
অন্য দিকে, দু’বছরের মধ্যে তৃতীয় বার ইরানের উপর মার্কিন হামলা চালানোর যুক্তি তৈরি করতে হলে, কিংবা সামরিক অভিযানের মাধ্যমে তেহরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে হলে, ওয়াশিংটনকে এমন কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে হবে, যেগুলি এত দিন হামলার আওতার বাইরে ছিল। সম্ভবত ইজরায়েলের একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে যৌথ ভাবেই এমন অভিযান চালাতে হতে পারে। ইউরোপের দেশগুলি তাতে যোগ দেবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে উপসাগরীয় দেশগুলির অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইরানের পাল্টা হামলার প্রধান নিশানা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে তাদেরই।
এই যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সেনেটর ক্রিস মার্ফি। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের একটি আলোচনায় তিনি বলেন, “যুদ্ধের পরিকল্পনা কী হতে পারে, তা নিয়ে আমার সঙ্গে বেশ বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে... শুধু এটুকুই বলব, ওদের পরিকল্পনা উন্মত্ত। এর ফলে সংঘাত ভয়াবহ ভাবে বাড়বে এবং আইনের শাসনের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার সম্ভবত ধ্বংস হয়ে যাবে।”
মার্ফি আরও বলেন, “কোন কোন অসামরিক পরিকাঠামোকে নিশানা করা হতে পারে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে খবর বেরিয়েছে। আমার বিচারে, এই পরিকল্পনা যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করবে, সংঘাত বাড়াবে। আমাদের নিরাপত্তাগত স্বার্থের পক্ষেও তার পরিণতি হবে বিপর্যয়কর।”
ভ্যান্সের উপর আস্থা, ট্রাম্পকে নিয়ে সংশয়
হোয়াইট হাউসের অধিকাংশ রাজনীতিক ও কূটনীতিকের তুলনায় ভ্যান্সের উপর তেহরানের আস্থা কিছুটা বেশি। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে তাঁর প্রকৃত কর্তৃত্ব কতটা, তা নিয়ে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সন্দেহ এখনও কাটেনি।
এর আগেও ভ্যান্সের উদ্যোগে আলোচনার মাধ্যমে ১৪ দফার একটি সমঝোতাপত্র তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের অন্য সদস্যেরা সেটি কার্যকর করার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ে।
এর পর হরমুজ প্রণালী ফের খুলে দিতে একতরফা পদক্ষেপ করে আমেরিকা। তেহরানের অভিযোগ, ওই পদক্ষেপ সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘন করেছিল। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পও ওই সমঝোতার বিরোধিতা করেন। কারণ, তাতে পরমাণু আলোচনা শুরু হতে ৬০ দিন পর্যন্ত দেরি হওয়ার সুযোগ ছিল।
সম্প্রতি রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে তেহরান যে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে পরমাণু আলোচনা শুরুর আগে অপেক্ষার সময় কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। ইরানের বক্তব্য, আমেরিকা যদি তাদের তেল রফতানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার ছাড় ফিরিয়ে আনে এবং হরমুজ প্রণালী ফের খুলে দেওয়া হয়, তা হলে ছয় থেকে সাত দিনের মধ্যেই পরমাণু আলোচনা শুরু হতে পারে।
অর্থাৎ, আলোচনার দরজা এখনও খোলা। কিন্তু পরমাণু কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা এবং পারস্পরিক নিরাপত্তার প্রশ্নে দু’পক্ষের অবিশ্বাস কাটানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।