শিকাগো (এপি): উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠার কথা ছিল। তার বদলে এ বার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন শিকাগোর দক্ষিণ এশীয়রা। ইলিনয়ের অরোরায় একটি হিন্দু মন্দিরে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যার পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পর নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে। তবে ভয় পেয়ে ঘরে বসে থাকতে নারাজ তাঁরা। বরং নিজেদের ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে, একজোট হয়ে ঘৃণা ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর বার্তা দিচ্ছেন।
সরকারি কৌঁসুলিদের দাবি, গত ১১ অক্টোবর নবরাত্রির সূচনা উপলক্ষে যখন হিন্দু মন্দিরগুলিতে ভক্তদের ভিড় জমছিল, তখন ইলিনয়ের অরোরায় শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর স্বামী (বালাজি) মন্দিরে হাজির হয়েছিলেন ১৯ বছরের আলেকজান্দ্রোস পাপোরাকিস। মন্দিরের পার্কিং লটে বসে ছিলেন তিনি। কিন্তু রাইফেলে গুলি আটকে যাওয়ায় একটিও গুলি চালাতে পারেননি। তার পরেই সেখান থেকে পালিয়ে যান তিনি।
সেই দিনই ইলিনয়ের প্যালাটাইনে নিজের বাড়ির কাছে গ্রেফতার হন পাপোরাকিস। মন্দির থেকে জায়গাটির দূরত্ব প্রায় ৪০ মাইল বা ৬৪ কিলোমিটার। কৌঁসুলিদের বক্তব্য, একটি টাকো বেল রেস্তোরাঁয় তাঁর সহকর্মী কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন, পাপোরাকিসের পরিকল্পনা ছিল, “ভারতীয়দের হত্যা করা”।
পাপোরাকিসের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলার হুমকি দেওয়া এবং বেআইনিভাবে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার মতো গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে। শুক্রবার সকালে তাঁকে ফের আদালতে হাজির করার কথা।
এলাকার দক্ষিণ এশীয়দের একত্র করার লক্ষ্যে কাজ করা অলাভজনক সংস্থা ‘দ্য শিকাগো কসম’-এর নির্বাহী পরিচালক আশা রাওয়ের কথায়, এই ঘটনা গোটা সম্প্রদায়কে স্তম্ভিত করেছে। যে সময়টা পরিবার, বন্ধু ও প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দে কাটানোর কথা, সেই উৎসবের মরসুমেই নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছে তাঁদের।
রাও বলেন, “আমাদের অনেকেই এই ঘটনায় ভীষণ স্তম্ভিত। ঘৃণাও হচ্ছে। আমাদের সম্প্রদায়ের কাছে এই সময়টা তো শান্তিপূর্ণ হওয়ার কথা। সবাই একত্র হব, প্রিয়জন, পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সময় কাটাব, নিরাপদে উৎসব পালন করব—এটাই তো হওয়ার কথা।”
দেবী দুর্গার আরাধনায় টানা নয় রাত ধরে পালিত হয় নবরাত্রি। দশেরা বা বিজয়াদশমীতে শেষ হয় সেই উৎসব। তার প্রায় তিন সপ্তাহ পরেই দীপাবলি। হামলার নিশানা হওয়া মন্দিরে মাঝেমধ্যে যান স্বাধীন কলামলেখক অবতংস কুমার। তাঁর কথায়, নবরাত্রির নয় রাতের উপবাস শেষে দশমীর দিন অনেকেই বড় করে উৎসব পালন করেন। খোলা জায়গায় বসে মেলা, পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে জমায়েত—সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজ থাকে তুঙ্গে।
কিন্তু এ বছর সেই আনন্দের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে বাড়তি সতর্কতা। কুমার বলেন, “মানুষ এখন অনেক বেশি সতর্ক। কোথাও কোনও গোলমালের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কি না, সে দিকে নজর রাখছেন। চোখ-কান খোলা রাখছেন।”
আশা রাও জানিয়েছেন, নিরাপত্তার আশঙ্কায় কেউ কেউ বাড়ি থেকে বেরিয়ে উৎসবে যোগ দিতেও দ্বিধা করছেন। তবে আতঙ্কের পাশাপাশি এই ঘটনা সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদও তৈরি করেছে। ভয়কে উপেক্ষা করে নিজেদের উৎসব ও ঐতিহ্য উদ্যাপনে অনড় তাঁরা।
রাওয়ের আশা, এই পরিস্থিতি দক্ষিণ এশীয়দের নিজেদের সম্প্রদায়ের শক্তি এবং বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের কথা নতুন করে মনে করিয়ে দেবে। তাঁর কথায়, “আমরা কতটা পথ এগিয়েছি, আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে কত ভাল কাজ হচ্ছে, আমাদের চারপাশে কত বন্ধু, কত মানুষ রয়েছেন—সেটা উপলব্ধি করা জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, “এ রকম সময়ে একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে একসঙ্গে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি গড়ে তোলার অর্থ এটাই।”
এ দিকে, দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত স্থানীয় নেতা এবং মার্কিন কংগ্রেসের জনপ্রতিনিধিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলির কাছে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, হামলার পরিকল্পনার পিছনে জাতিগত বা ধর্মীয় বিদ্বেষ কাজ করেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধের প্রমাণ মিললে পাপোরাকিসের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অভিযোগ আনার দাবিও উঠেছে।
কৌঁসুলিদের দাবি, পাপোরাকিস নিজেকে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী এবং নব্য নাৎসি বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। ভারতীয়-সহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিশানা করে তিনি অবমাননাকর ও বিদ্বেষপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করতেন।
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য রাজা কৃষ্ণমূর্তির নির্বাচনী এলাকার মধ্যেই রয়েছে ওই মন্দির। এর আগে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে তিনি বলেছিলেন, “আমি এফবিআইয়ের কাছে দাবি জানাচ্ছি, এই ঘটনাকে বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধ হিসেবে তদন্ত করা হোক এবং সেই অনুযায়ী মামলা চালানো হোক।”
এই হামলার ছক দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষের পুরনো ক্ষতও নতুন করে উসকে দিয়েছে। এশীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের মানুষদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধের অভিযোগ নথিবদ্ধ করে ‘স্টপ এএপিআই হেট’। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অনলাইনে দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে অবমাননাকর শব্দের ব্যবহার বেড়েছে ১০৯ শতাংশ। গত বছর দক্ষিণ এশীয় প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় অর্ধেক জানিয়েছেন, বর্ণ, জাতিগত পরিচয় অথবা জাতীয়তার কারণে তাঁরা বিদ্বেষমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন।
‘সাউথ এশিয়ান আমেরিকান পলিসি অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর হিসাব অনুযায়ী, ইলিনয়ে দক্ষিণ এশীয় জনসংখ্যা ২০১০ সালের ২ লক্ষ ৪২ হাজারের কিছু বেশি থেকে বেড়ে ২০২০ সালে ৩ লক্ষ ৩৭ হাজার ছাড়িয়েছে। রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় আড়াই শতাংশ দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত। তাঁদের অনেকের অভিজ্ঞতায়, বর্ণপরিচয় ঘিরে হেনস্থা ও হয়রানি যেন দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ।
পাপোরাকিসকে গ্রেফতারের পর তাঁর বাড়ি থেকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, দক্ষিণ এশীয়দের উদ্দেশে অবমাননাকর শব্দ লেখা একটি গ্যাসের পাত্র এবং নাৎসি প্রতীকযুক্ত একাধিক সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কর্মকর্তাদের দাবি, পাপোরাকিস একটি দীর্ঘ নোটও লিখেছিলেন। তাতে গণহত্যার কল্পনা করার পাশাপাশি যত বেশি সম্ভব অশ্বেতাঙ্গ মানুষকে হত্যা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
‘হিন্দুজ ফর হিউম্যান রাইটস’-এর শিকাগো শাখার নেতৃত্বে থাকা ঋষভ চ্যাট্টির মতে, হিন্দু ও দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের চরিত্র ক্রমশ বদলাচ্ছে। তাঁর কথায়, আগে এই ঘৃণাকে মূলত “অনলাইন চ্যাটরুম আর স্কুলের খাবার ঘরেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করা হত”। কিন্তু সম্প্রতি তা “ক্রমশ আরও হিংস্র হয়ে উঠছে”।
এই পরিস্থিতি প্রবাসী দক্ষিণ এশীয়দের মনে নিজেদের পরিচয় ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর প্রশ্নও তুলে দিচ্ছে। চ্যাট্টি বলেন, “আমার সম্প্রদায়ের অনেকেই এখন গভীরভাবে ভাবছেন—যে দেশে তাঁদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও হিংসা চালানো হয়, সেই দেশের আপনজন হয়ে থাকার অর্থ আসলে কী?”
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।