সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতেই নির্বাচনে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তুললেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তাঁর দাবি, বিদেশি মদতে আরব ইজরায়েলিদের রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে। যদিও প্রধানমন্ত্রীর এই অভিযোগকে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার কৌশল হিসাবেই দেখছে বিরোধীরা। তাদের পাল্টা দাবি, নির্বাচনের ফলকে প্রশ্নের মুখে ফেলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করতে চাইছেন নেতানিয়াহু।

প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতকে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন নেতানিয়াহু ও তাঁর সহযোগীরা। তাঁদের দাবি, বিদেশ থেকে আসা অর্থ ব্যবহার করে ইজরায়েলের প্যালেস্তিনীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভোট কেনা হয়েছে এবং অন্যান্য অনিয়ম ঘটানো হয়েছে।

প্রধান বিরোধী জোটের নেতা গাদি আইজেনকট পাল্টা অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনের ফল বানচাল করতে পরিকল্পিত প্রচারে নেমেছেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দল লিকুদ।

একটি ভিডিয়ো বার্তায় আইজেনকট বলেন, “ইতিমধ্যেই স্পষ্ট, নির্বাচনের ফলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে লিকুদ ও নেতানিয়াহু সমন্বিত, সংগঠিত প্রচারে নেমেছেন।”

নেতানিয়াহুর অভিযোগ থেকে দ্রুত দূরত্ব তৈরি করেছেন পুলিশের আধিকারিক এবং নির্বাচন কমিটির সদস্য-সহ একাধিক সরকারি কর্তা। এমনকি, একটি গোটা জনগোষ্ঠীকে কলঙ্কিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে তিরস্কার করেছেন প্রেসিডেন্টও।

বুধবার রাতে সমাজমাধ্যমে লিকুদের একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন নেতানিয়াহু। সেখানে কথিত অনিয়মকে আখ্যা দেওয়া হয়, “গণতন্ত্রের উপর আক্রমণ, যার উদ্দেশ্য নেসেটকে বিদেশিদের দখলে তুলে দেওয়া, ইজরায়েলের ইসলামিকরণ এবং দক্ষিণপন্থী শাসনের পতন ঘটানো।”

মঙ্গলবারের নির্বাচনে চার বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহুর অতি দক্ষিণপন্থী জোট সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। তবে প্রধান ইহুদি বিরোধী জোটও একক ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে সরকার গঠন এবং সংসদে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দুই আরব ইজরায়েলি দল—জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম।

শুক্রবার ভোরে প্রকাশিত চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, ১২০ আসনের নেসেটে নেতানিয়াহুপন্থী শিবির পেয়েছে ৫৩টি আসন। আইজেনকটের জোটের ঝুলিতে ৪৮টি। বাকি ১৯টি আসন জিতেছে জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম। ইজরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব জনগোষ্ঠীর কাছে আসনসংখ্যার নিরিখে এই ফল ঐতিহাসিক সাফল্য।

প্রধানমন্ত্রীর আক্রমণের পিছনে রাজনৈতিক অঙ্কও স্পষ্ট বলে মনে করছেন বিরোধীরা। তাঁদের বক্তব্য, নতুন নেসেটে ইহুদি ও আরব বিরোধীরা যাতে একজোট হয়ে বর্তমান স্পিকার আমির ওহানাকে সরাতে এবং নিজেদের আইন প্রণয়নের উদ্যোগ এগিয়ে নিয়ে যেতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতেই এই প্রচার। উল্লেখ্য, লিকুদ নেতা ওহানা আগে শিন বেতের আধিকারিক ছিলেন।

সমাজমাধ্যম এক্স-এ প্রকাশিত লিকুদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এটা স্পষ্ট যে কোনও জায়নবাদী দলেরই রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে সহযোগিতা করা উচিত নয়। নগদ টাকায় কেনা ভোটের সাহায্যে নেসেটের স্পিকার বদলানো এবং ইজরায়েলের পক্ষে বিপজ্জনক সরকার গঠন করাও উচিত নয়।”

গত ৩০ বছরের মধ্যে ১৯ বছর ইজরায়েল শাসন করেছেন ৭৭ বছরের নেতানিয়াহু। তাঁর এই অভিযোগের তীব্র সমালোচনা করেছেন বিরোধী নেতারা।

জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে উসকানির অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর কথায়, “ব্যালটের লড়াইয়ে নেতানিয়াহু পরাজিত হয়েছেন।” তিনি আরও বলেন, “আরব জনগণ ভোট দিয়েছেন এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন—এই সত্য তিনি মেনে নিতে অস্বীকার করছেন।”

আইজেনকট জানিয়েছেন, তদন্ত হলে তা করতে হবে “ভয় বা পক্ষপাত ছাড়া” এবং “সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে”। তবে তদন্তের অজুহাতে নবনির্বাচিত নেসেটের অধিবেশন পিছিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন তিনি। নির্বাচনের ১৪ দিনের মধ্যে নতুন সংসদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার কথা।

কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডিন লিভনে জানিয়েছেন, অভিযোগগুলির কোনও ভিত্তি আছে বলে মনে হচ্ছে না। ইজরায়েলের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উদ্ধৃত পুলিশ আধিকারিকেরাও অভিযোগগুলিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ভোটগ্রহণ মোটের উপর নির্বিঘ্নেই হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগও রাজনৈতিক নেতাদের সংযত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর কথায়, “যে গোটা জনগোষ্ঠী নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে এবং গণতন্ত্রে সক্রিয় অংশ নিতে চেয়েছে, তাদের গায়ে কালিমা লেপন থেকে বিরত থাকুন।”

লিকুদের বিবৃতিতে কোনও দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোট কেনা এবং ভোটারদের সংগঠিত করার জন্য অর্থ জোগানোর অভিযোগ উঠেছে কাতারের বিরুদ্ধে। যদিও কাতারের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাজেদ আল-আনসারি জানিয়েছেন, ইজরায়েলের নির্বাচনে কোনও রকম সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তাঁর সরকার “দ্ব্যর্থহীনভাবে” অস্বীকার করছে।

আরব ইজরায়েলি—অর্থাৎ ইজরায়েলের নাগরিকত্বধারী প্যালেস্তিনীয়দের—এ বারের নির্বাচনে রেকর্ড হারে ভোটদানের পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ। পাশাপাশি, আরও উগ্র দক্ষিণপন্থী সরকার ক্ষমতায় ফিরলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, এমন আশঙ্কাও কাজ করেছে তাঁদের মধ্যে। বিশেষত জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের মতো কট্টরপন্থী ও প্রকাশ্যে বর্ণবাদী মনোভাবাপন্ন নেতারা ফের ক্ষমতায় ফিরলে বৈষম্য আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।

বৃহস্পতিবার বেন-গভির আরব দলগুলির নেতাদের গ্রেফতারের দাবি তুলেছেন। স্মোত্রিচের দাবি, তাঁদের শিন বেতের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা হোক।

ইজরায়েলের বৃহত্তম প্যালেস্তিনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ শহর নাজারেথে মঙ্গলবার জোরকদমে ভোটগ্রহণ হয়েছে। সেখানে বড় ধরনের অনিয়মের স্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি। তবে আরবদের ভোটদানের প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে সরকার ও শাসক জোটের শরিক দলগুলির তরফে কিছু কৌশল প্রয়োগের চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

নাজারেথের কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে পাঠানো ব্যালটের কিছু প্যাকেটে হিব্রু ও আরবি—দুই ভাষার বদলে শুধু হিব্রু ভাষা ছিল। ভোটকর্মীদের অভিযোগ, অতি দক্ষিণপন্থী দলগুলির পাঠানো পর্যবেক্ষকেরা প্রক্রিয়াগত নানা আপত্তি তুলে ভোটগ্রহণের গতি কমানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের সেই চেষ্টা সফল হয়নি।

জয়েন্ট লিস্ট এবং জায়নবাদী ‘চেঞ্জ’ বা ‘পরিবর্তন’ জোটের নেতারা আনুষ্ঠানিক জোট গড়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তবে নেসেটের স্পিকার ওহানাকে সরানো এবং কয়েকটি সর্বসম্মত বিষয়ে আইন পাশ করানোর জন্য কৌশলগত ভাবে একসঙ্গে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বিলগুলির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হল, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েলে হামাসের হামলার পথ তৈরি করা নিরাপত্তাগত ব্যর্থতাগুলি খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিশন গঠন। গত দু’বছর ধরে এই উদ্যোগ আটকে রেখেছেন নেতানিয়াহু।

জয়েন্ট লিস্টের অন্যতম নেতা আহমদ তিবির অভিযোগ, আইজেনকটের জোট ও আরব ইজরায়েলি দলগুলির মধ্যে যৌথ অবস্থান গড়ে ওঠার সম্ভাবনা নষ্ট করতেই নির্বাচনের ফল নিয়ে বিতর্ক উসকে দিচ্ছেন নেতানিয়াহু।

রয়টার্সকে তিবি বলেন, “এই গোটা প্রচারটাই আইজেনকটকে লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে। উদ্দেশ্য হল তাঁকে বাধা দেওয়া, ভয় দেখানো এবং এমন সরকার গড়া থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য করা, যে সরকার জয়েন্ট লিস্ট বা রা’আমের বাইরের সমর্থনের উপর নির্ভর করবে।”

‘পরিবর্তন’ জোটের শরিক তথা ইজরায়েলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও নেতানিয়াহুর কাতার-বিরোধী অভিযোগের স্ববিরোধিতা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগে কাতারকে আক্রমণ করছেন নেতানিয়াহু। অথচ তাঁর নিজের রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধেই ওই উপসাগরীয় দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এক্স-এ বেনেট লিখেছেন, “আজ সকালে হঠাৎ, যখন নিজের স্বার্থে কাজে লাগছে, তখন নেতানিয়াহুর কাতারের কথা মনে পড়ে গেল। এখন সেই কাতারকেই ব্যবহার করে তিনি বিশৃঙ্খলা ছড়াচ্ছেন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপর মানুষের আস্থা নষ্ট করছেন।”