সেপ্টেম্বরে আমেরিকা থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি শূন্যে, রাশিয়া থেকেও কেনা কমেছে ১৮ শতাংশ; আমিরশাহির ভাগ বেড়ে রেকর্ড ২৬.৫ শতাংশ
নয়াদিল্লি: তেল কেনার মানচিত্রে ফের বদল আনছে ভারত। আমেরিকা থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি একেবারে বন্ধ, রাশিয়া থেকেও কেনাকাটায় বড়সড় কাটছাঁট। ঘাটতি মেটাতে পাল্লা দিয়ে আমদানি বাড়ানো হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে এই ছবি। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, ওই মাসেই আমেরিকায় কার্যকর হয়েছে রাশিয়া-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা আইন। ফলে ভারতের তেল আমদানির এই বদলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের চাপের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
তবে এক দেশের উপর নির্ভরতা কমাতে গিয়ে ভারত যে পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত হয়েছে, তা নয়। বরং রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি—এই দুই দেশের উপরই ভারতের তেল আমদানির বড় অংশ নির্ভর করছে। পরিসংখ্যান বলছে, দুই দেশ মিলিয়ে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ সরবরাহ করছে। অর্থাৎ, সরবরাহের উৎস বদলালেও আমদানির ক্ষেত্রে নির্ভরতার প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর আমেরিকার কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে পাশ হয় ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট, ২০২৬’। দু’দিন পরে, ১৮ সেপ্টেম্বর, তাতে সই করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই আইনে ভারত ও চিনের মতো রুশ তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলির উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে আমেরিকাকে।
যদিও আপাতত সেই শুল্ক কার্যকর করা হয়নি। গত ১৬ অক্টোবর একটি নির্বাহী আদেশে সই করে সাময়িক শুল্কছাড় দেন ট্রাম্প। মার্কিন কংগ্রেসে জমা দেওয়া প্রত্যয়নপত্রে তাঁর বক্তব্য, এই স্থগিতাদেশ আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের অনুকূল। এ দিকে অক্টোবর মাসে ভারতের তেল আমদানির সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হওয়ার কথা আগামী মাসে। ফলে সেপ্টেম্বরে দেখা দেওয়া এই পরিবর্তন পরের মাসেও বজায় ছিল কি না, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে।
আমদানি বাড়লেও বাড়ছে খরচ
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভারত মোট ২০৯.৪ লক্ষ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। আগস্টের তুলনায় এই পরিমাণ ৯.৫ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় আমদানি বেড়েছে ৪.১ শতাংশ।
কিন্তু আমদানির পরিমাণ বাড়ার চেয়েও দ্রুত গতিতে বাড়ছে তেলের পিছনে খরচ। গত কয়েক মাস ধরেই এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই মাসে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ভারতের খরচ হয়েছে প্রায় ১,৪৩০ কোটি ডলার। আগস্টের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ১৬.৪ শতাংশ। আর গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় বৃদ্ধি ৩৩ শতাংশ।
অর্থাৎ, বেশি তেল কেনার পাশাপাশি চড়া দামের চাপও সামলাতে হচ্ছে ভারতকে। দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে আমদানির পরিমাণ বাড়লেও তার জন্য বিদেশি মুদ্রার খরচও ক্রমশ বাড়ছে।
রুশ তেলে ভাটা
ভারতের তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ গত কয়েক মাসে নাটকীয় ভাবে ওঠানামা করেছে। এর সঙ্গে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কনীতি ঘিরে পরিবর্তনের যোগ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৫১ শতাংশ এসেছিল রাশিয়া থেকে। এটিই ছিল সর্বকালীন সর্বোচ্চ। ফেব্রুয়ারিতে রুশ তেল কেনার কারণে ভারতের উপর চাপানো অতিরিক্ত শাস্তিমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করে আমেরিকা। তার পর থেকেই ভারতের তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ ক্রমশ বাড়ছিল। একই সময়ে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওই পথ দিয়ে তেল সরবরাহও বাধার মুখে পড়ে।
কিন্তু জুলাইয়ের পর থেকে ছবিটা বদলাতে শুরু করে। আগস্টে ভারতের মোট তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ নেমে আসে ৪৪ শতাংশে। সেপ্টেম্বরে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৩৩ শতাংশে। অর্থাৎ, মাত্র দু’মাসে রাশিয়ার অংশ কমেছে ১৮ শতাংশীয় পয়েন্ট।
পরিমাণের হিসাবেও কাটছাঁট স্পষ্ট। সেপ্টেম্বরে ভারত সামগ্রিক ভাবে বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানি করলেও রাশিয়া থেকে কেনা তেলের পরিমাণ আগস্টের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ কমিয়েছে।
‘দ্য হিন্দু’র আগের একটি বিশ্লেষণেও দেখা গিয়েছিল, ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকার শাস্তিমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের আগে মার্কিন চাপের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমাচ্ছিল। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সেই চাপের প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
আমেরিকা থেকে আমদানি শূন্য
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আমেরিকার ক্ষেত্রে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভারত আমেরিকা থেকে এক ফোঁটা অপরিশোধিত তেলও আমদানি করেনি। অথচ তার আগের ১২ মাসে ভারতের মোট তেল আমদানিতে মার্কিন তেলের অংশ ছিল গড়ে ৫ শতাংশের কিছু বেশি।
এই পরিবর্তনের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। যে মাসে রাশিয়া-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা আইন কার্যকর হয়েছে, সেই মাসেই আমেরিকা থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি শূন্যে নেমে এসেছে। তবে একই সময়ে দুটি ঘটনা ঘটেছে বলেই একটিকে অন্যটির সরাসরি কারণ বলে ধরে নেওয়া যায় না। এর পিছনে বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত, দাম এবং সরবরাহের পরিস্থিতির মতো অন্যান্য বিষয়ও ভূমিকা নিয়ে থাকতে পারে।
আমিরশাহিতে রেকর্ড আমদানি
রাশিয়া ও আমেরিকা থেকে কেনাকাটা কমিয়ে ভারত যে বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকেছে, তার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। সেপ্টেম্বরে দেশটি থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি আগস্টের তুলনায় ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় এই বৃদ্ধি ১০৯ শতাংশ।
ফলে ভারতের মোট তেল আমদানিতে আমিরশাহির অংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬.৫ শতাংশে। এখনও পর্যন্ত এটাই সর্বোচ্চ। অর্থাৎ, ভারতের তেল আমদানির মানচিত্রে আমিরশাহির গুরুত্ব এক ধাক্কায় অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে।
তবে এই পরিবর্তনের মধ্যেও রয়েছে একটি বড় প্রশ্ন। রাশিয়ার উপর নির্ভরতা কমিয়ে আমিরশাহির দিকে ঝুঁকলেও ভারতের মোট আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ এখনও মাত্র দু’টি দেশের উপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, নিষেধাজ্ঞা কিংবা সরবরাহপথে নতুন কোনও সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তায় পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, সেপ্টেম্বরে ভারতের তেল আমদানির ছবিতে তিনটি বিষয় স্পষ্ট—আমেরিকা থেকে আমদানি শূন্য, রাশিয়া থেকে কেনাকাটায় বড়সড় পতন এবং আমিরশাহি থেকে আমদানিতে রেকর্ড বৃদ্ধি। এই বদল কতটা সাময়িক আর কতটা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ, তা বোঝা যাবে আগামী মাসগুলির পরিসংখ্যানে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, আন্তর্জাতিক চাপ ও বাজারের অস্থিরতার মধ্যে দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বিকল্প উৎসের সন্ধান ভারতের কাছে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।