বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন সংস্থা বিনান্সে সাইবার হামলা চালিয়ে ৬৩০ কোটি ডলার মূল্যের সম্পদ লুট করা হয়েছে। ঘটনাটিকে ইতিহাসের বৃহত্তম চুরি বলে বর্ণনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের সন্দেহ, এই হামলার পিছনে রয়েছে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট হ্যাকাররা।

বিনান্স জানিয়েছে, গ্রাহকদের সমস্ত ক্ষতির দায় তারা নেবে। ইতিমধ্যেই হামলার কবলে পড়া সম্পদের মধ্যে ৩০০ কোটি ডলার মূল্যের সম্পদ চিহ্নিত করে তার লেনদেন আটকে দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিনান্সের উপর এই হামলা ছিল নজিরবিহীন। কয়েকশো কোটি ডলারের সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার পর তা পাচার করতে হ্যাকাররা এমন কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, যা আগে দেখা যায়নি।

গবেষকদের দাবি, এখনও পর্যন্ত এটিই বিশ্বের বৃহত্তম চুরির ঘটনা। গত বছর ১৫০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো লুট কিংবা ২০০৩ সালে ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সাদ্দাম হুসেনের সরিয়ে নেওয়া ১০০ কোটি ডলার—সবই এর তুলনায় অনেক ছোট। ক্রিপ্টো-বিষয়ক পরামর্শদাতা সংস্থা এলিপটিকের প্রধান বিজ্ঞানী টম রবিনসন বলেন, “প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, যে কোনও ধরনের চুরির মধ্যে এটিই ইতিহাসে সবচেয়ে বড়।”

বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এই হামলা হয়। বিশেষজ্ঞদের সন্দেহ, এর পিছনে রয়েছে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট হ্যাকাররা। ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে দেশটির। এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দুবাইয়ের একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরির পিছনেও ছিল উত্তর কোরিয়া। এত দিন সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো লুটের ঘটনা।

ক্রিপ্টো লেনদেন বিশ্লেষণকারী সংস্থা টিআরএম জানিয়েছে, “উচ্চ মাত্রার নিশ্চয়তা” নিয়েই তারা এই হামলার জন্য উত্তর কোরিয়ার বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন হ্যাকিং ইউনিট ‘ট্রেডারট্রেইটর’-কে দায়ী করছে। এলিপটিক এবং আর এক গবেষণা সংস্থা চেইনঅ্যানালিসিসও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।

বিনান্সের দাবি, প্রাথমিক তদন্তে ইঙ্গিত মিলেছে, সংস্থার এক ইঞ্জিনিয়ারের ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মধ্য দিয়ে হামলার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। সেই সুযোগে হামলাকারীরা সংস্থার একটি সিস্টেমে ঢুকে অনুমতি ছাড়াই সম্পদ তুলে নেয়। পরে সংস্থা জানায়, অত্যন্ত কৌশলী এই হামলায় নিরাপত্তাব্যবস্থা ভাঙার “আরও কয়েকটি প্রবেশপথ” ছিল।

বিনান্সের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা ডিজিটাল সম্পদ কেনা, বেচা এবং লেনদেন করতে পারেন। বিশ্বজুড়ে সংস্থাটির নথিভুক্ত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৩ কোটি ৫০ লক্ষ। ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংস্থার হেফাজতে ছিল প্রায় ১৬ হাজার ২৮০ কোটি ডলার মূল্যের সম্পদ।

বিনান্সের অন্যতম যৌথ প্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং বলেন, “সোজা কথা—আপনাদের অর্থ নিরাপদ। প্রতিটি ক্ষতির দায় আমরা নিচ্ছি।” তাঁর দাবি, চুরি যাওয়া সম্পদের ক্ষতিপূরণ দিতে বিনান্স ৬৩৪ কোটি ডলার আলাদা করে রেখেছে।

সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা চিনে জন্মগ্রহণকারী উদ্যোগপতি চাংপেং ঝাও। বর্তমানে তিনি কানাডা এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির নাগরিক। অর্থপাচার-সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের দায় স্বীকার করার পর ২০২৪ সালে তাঁর চার মাসের কারাদণ্ড হয়েছিল। ২০২৫ সালে তাঁকে ক্ষমা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বিনান্স এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সমস্ত জমা ও উত্তোলন সাময়িক ভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। আমাদের নিরাপত্তা দলগুলি পরীক্ষা চালাচ্ছে, ডিজিটাল ওয়ালেটের পরিকাঠামো সুরক্ষিত করছে এবং হামলার কবলে পড়া সম্পদের গতিপথ খুঁজে বের করছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং এই শিল্পের সহযোগীরা ঘনিষ্ঠ ভাবে আমাদের সহায়তা করছে।”

শুক্রবার এশিয়ার বাজারে লেনদেনের শুরুতেই এই ঘটনার প্রভাব পড়ে। হ্যাকের খবর প্রকাশের আগের দামের তুলনায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিটকয়েনের দাম ৫ শতাংশ পড়ে যায়। সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ক্রিপ্টোকারেন্সির দাম নেমে আসে ৭৭ হাজার ৩৮০ ডলারে, যা গত ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন।

বৃহস্পতিবার এক্সে ঝাও লেখেন, “ব্যবহারকারীদের অর্থ নিরাপদ!” তবে ঘটনাটি “হ্যাক বলেই মনে হচ্ছে” বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ঝাও আরও জানান, এখন তিনি আর বিনান্স পরিচালনা করেন না। তবে “একজন শেয়ারহোল্ডার হিসেবে আমি আশা করি, ব্যবহারকারীদের সমস্ত অর্থের ক্ষতি পুরোপুরি পূরণ করা হবে।”

এক্সে আর একটি পোস্টে বিনান্স জানায়, তারা “আরও অর্থের গতিপথ শনাক্ত করতে, তা জব্দ করতে এবং উদ্ধার করতে” কাজ করছে। পোস্টের শেষে সংস্থার বার্তা, “আমরা এই ঝড় সামলে উঠব। পাশে থাকার জন্য ধন্যবাদ।”

বিশ্লেষকদের মতে, সম্পদ হারানোর সম্ভাব্য ক্ষতির বাইরেও এই নিরাপত্তাভঙ্গের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে গোটা ক্রিপ্টো বাজারে। আমেরিকায় উঁচু সুদের হার এবং এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড বা ইটিএফের ক্রেতাদের চাহিদা কমে যাওয়ায় বাজার আগে থেকেই চাপে ছিল।

হংকংভিত্তিক হ্যাশকি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ গবেষক টিম সান বলেন, “এই ঘটনা ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ আরও কমিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় ভাবে পরিচালিত এক্সচেঞ্জগুলিতে রাখা সম্পদ কতটা নিরাপদ, তা নতুন করে বিচার করতে পারেন বিনিয়োগকারীরা।”

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত এবং অর্থসংকটে ভোগা উত্তর কোরিয়া ক্রিপ্টো চুরির ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিপুল পরিমাণ সম্পদ একসঙ্গে হাতিয়ে নেওয়া এবং পরে তা পাচার করার সুযোগ থাকায় এই ধরনের সম্পদ তাদের অন্যতম লক্ষ্য। এলিপটিকের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে উত্তর কোরিয়ার শাসকগোষ্ঠী ৬৫০ কোটি ডলারেরও বেশি ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি করেছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৬ সালেই এখনও পর্যন্ত চুরি হয়েছে ১০০ কোটি ডলারের বেশি।

হামলার পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে বিনান্স বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে। তাদের মধ্যে রয়েছে মার্কিন এফবিআই এবং ইউএস সিক্রেট সার্ভিসও।