বুধবারের ভয়াবহ ট্রেন সংঘর্ষে অন্তত ৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। এই ঘটনার পর স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেস স্বীকার করেছেন, ‘‘দ্রুতগতির রেলের প্রতি মানুষের আস্থা ভেঙে পড়েছে।’’ বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে দেশের রেল নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।

সানচেস জানিয়েছেন, হতাহতদের পরিবারের কাছে যত দ্রুত সম্ভব তথ্য পৌঁছে দিতে সরকার ‘‘অক্লান্তভাবে কাজ করে চলেছে’’। হতাহতদের মধ্যে অন্তত ২৩টি দেশের নাগরিক রয়েছেন। চলতি বছরে স্পেনে দ্বিতীয় প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বার করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

বুধবার রাষ্ট্রায়ত্ত রেল সংস্থা রেনফে এবং বেসরকারি সংস্থা ইরিয়োর দু’টি ট্রেন মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের দিকে যাচ্ছিল। সকাল ৯টার কিছু আগে সংঘর্ষটি ঘটে। ইরিয়োর ট্রেনটি থেমে যাওয়ার পর পিছন থেকে সেটিকে সজোরে ধাক্কা মারে অন্য ট্রেনটি। মধ্য স্পেনের কাস্তিয়া-লা মানচা অঞ্চলের উরদার কাছে বেশ কয়েকটি কামরা লাইনচ্যুত হয়।

এর মাত্র ন’মাস আগেই আন্দালুসিয়ার আদামুস শহরের কাছে একই রেলপথে দু’টি ট্রেনের সংঘর্ষে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আহত হয়েছিলেন আরও অনেকে। সে বারও ট্রেন দু’টির একটি ছিল রেনফের, অন্যটি ইরিয়োর।

শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘স্পেনের মতো একটি দেশে—যার এত শক্তিশালী দ্রুতগতির রেলব্যবস্থা রয়েছে—একই বছরের মধ্যে এই ধরনের এবং এত বড় দু’টি দুর্ঘটনা ঘটা মেনে নেওয়া যায় না।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘তাই আমাদের কাজ শুধু কী ঘটেছিল, তার কারণ তদন্ত করা নয়। দেশের দ্রুতগতির রেলব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার সমাধানও দিতে হবে। এই ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা ভেঙে পড়েছে। সরকারের দায়িত্ব শুধু কারণ চিহ্নিত করেই শেষ হয় না—এই মাপের বিপর্যয় যাতে আর না ঘটে, সেই পথও দেখাতে হবে।’’

সানচেসের বক্তব্যের কিছু পরেই সাংবাদিক বৈঠক করেন স্পেনের পরিবহণমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে। তাঁর পদত্যাগের দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। তবে সেই দাবি খারিজ করে তিনি জানান, মানুষের আস্থা ফেরাতে ‘‘স্পেনের মানুষের সামনে সমাধান তুলে ধরার’’ কাজেই মন দিতে চান।

পুয়েন্তে বলেন, ‘‘আমি পদে থাকব কি থাকব না, তা নিয়ে আলোচনা করা এখন আমার কর্তব্য নয়। আমার কর্তব্য সমস্যার সমাধান করা, কী ঘটেছিল তা স্পষ্ট করা এবং পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া।’’

তাঁর কথায়, ‘‘নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে সমাধান তুলে ধরাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তে যদি সাংগঠনিক ব্যবস্থা বা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ধরা পড়ে, আমরা সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। আর কোনও ব্যক্তি দায়ী বলে প্রমাণিত হলে, তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

বুধবারের দুর্ঘটনার দায় রাষ্ট্রায়ত্ত রেল পরিকাঠামো পরিচালনাকারী সংস্থা আদিফের মাদ্রিদ নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের উপরেই বর্তাচ্ছে বলে ফের ইঙ্গিত দেন পুয়েন্তে। তাঁর দাবি, দুর্ঘটনার আগে এলজেডবি (LZB) সিগন্যাল ব্যবস্থা বিকল হয়ে গিয়েছিল। সামনের রেলপথে অন্য ট্রেন থাকলে এই ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় ভাবে ট্রেন থামিয়ে দেয়। তবে এই ধরনের গোলযোগ অস্বাভাবিক নয় বলেও জানান তিনি।

মন্ত্রীর ব্যাখ্যা, ওই ব্যবস্থা বিকল হয়ে গেলে নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আবার মানুষের হাতে চলে আসে। পরিবহণের অন্য ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটে।

পুয়েন্তে আরও জানান, আদিফের এক অপারেটর রেনফের ট্রেনটিকে ‘‘স্বাভাবিক’’ গতিতে এগোনোর নির্দেশ দেওয়ার পরেই দুর্ঘটনাটি ঘটে। অথচ নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪০ কিলোমিটার বা ২৫ মাইল গতিতে ট্রেন চালানোর কথা। তাতে চালক সামনের কোনও বিপদ যথেষ্ট আগে দেখতে পারেন।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরিয়োর ট্রেনটিকে ধাক্কা মারার সময়ে রেনফের ট্রেনটির গতি ছিল ঘণ্টায় ১৬০ থেকে ২০০ কিলোমিটারের মধ্যে।

রিপোর্টের উপসংহারে বলা হয়েছে, ‘‘প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক সুরক্ষাব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে একের পর এক ত্রুটি, নির্দেশ এবং পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষ ডেকে আনে।’’

পুয়েন্তে জানান, সংশ্লিষ্ট অপারেটর ৪৮ বছরের এক ব্যক্তি। তাঁর প্রয়োজনীয় সমস্ত প্রশিক্ষণ হালনাগাদ ছিল। নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে কাজ করার দু’বছরের অভিজ্ঞতাও ছিল তাঁর। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এই নির্দিষ্ট এলাকার দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন তিনি। মন্ত্রীর কথায়, ‘‘অর্থাৎ, ওই এলাকা তাঁর ভালই চেনা ছিল।’’

তবে পরিবহণ শ্রমিক সংগঠনগুলি সরকারের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেছে। তাদের দাবি, বর্তমানে কাজের চাপ এতটাই বেশি যে নিরাপদে দায়িত্ব সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। কর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর দাবিও তুলেছে তারা।

স্পেনের রেল ট্র্যাফিক কন্ট্রোলারদের সংগঠন এসসিএফের মুখপাত্র রাকেল আয়িয়ন সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, ‘‘আমাদের মনে হচ্ছে, ক্রমশ খারাপ হতে থাকা কাজের পরিবেশে দায়িত্ব পালন করা একজন সাধারণ কর্মীর ঘাড়ে দায় চাপাচ্ছেন মন্ত্রী।’’

তাঁর কথায়, ‘‘মানুষের ভুল হওয়াটা দুর্বোধ্য নয়। দুর্বোধ্য হল, নিরাপত্তাব্যবস্থা কেন নিয়মিত বিকল হচ্ছে।’’

স্পেনের রক্ষণশীল পিপলস পার্টি বা পিপি বারবার পুয়েন্তের পদত্যাগ দাবি করেছে। আগামী মাসের আগাম সাধারণ নির্বাচনে দলটি সানচেসের সমাজতন্ত্রীদের নেতৃত্বাধীন সংখ্যালঘু জোট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।

পিপি নেতা আলবের্তো নুনিয়েস ফেইহো জানিয়েছেন, দু’টি রেল দুর্ঘটনার জন্যই তাঁর দল পুয়েন্তে ও সানচেসকে ‘‘রাজনৈতিকভাবে দায়ী’’ করছে।

তিনি বলেন, ‘‘পরিবহণ মন্ত্রক ঠিকমতো চালানোর দায়িত্ব পালনে যিনি ব্যর্থ হয়েছেন, তাঁকে তার পরিণাম বহন করতে হবে। আর যিনি তাঁকে নিয়োগ করেছেন এবং পদে রেখে দিয়েছেন, তাঁর দায় আরও বেশি। তাঁরা পদত্যাগ না করলে আমরা ভোটের মাধ্যমে তাঁদের সরিয়ে দেব।’’

বার্সেলোনার প্রাক্তন মেয়র আদা কোলাউও পুয়েন্তের পদত্যাগ দাবি করেছেন। বর্তমানে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বামপন্থী ফ্রেন্তে আমপ্লিও জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

কোলাউ বলেন, ‘‘ওই পদত্যাগ আজ হবে, কাল হবে, না পরশু হবে—এমন তুচ্ছ বিতর্কে আমরা যাব না। যত দ্রুত সম্ভব তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে।’’

সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা নির্বাচনে কী প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পুয়েন্তে জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি ‘‘একেবারেই ভাবেননি’’।

সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘‘এমন একটা সময়ে আমি নির্বাচনী প্রচারের কথা ভাবব—কেউ আমার কাছে তা প্রত্যাশা করবেন বলে মনে করি না।’’