দক্ষিণ ইউক্রেনের রুশ অধিকৃত অবরুদ্ধ শহর ওলেশকি থেকে শুক্রবার বিরল এক যৌথ ত্রাণ অভিযানে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। চার বছর আট মাস ধরে চলা যুদ্ধে এই ধরনের উদ্যোগ এই প্রথম।
খেরসনের বিপরীতে, নিপ্রো নদীর রুশ অধিকৃত তীরে অবস্থিত এই শহরে কয়েক মাস ধরেই খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রীর তীব্র সংকট। সেখানে এখনও থেকে যাওয়া কয়েক হাজার মানুষ অনাহারের মুখে পড়তে পারেন বলে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৫০টি শিশু।
বাস ও অ্যাম্বুল্যান্স মিলিয়ে ২৫টি গাড়ির একটি মানবিক সহায়তা কনভয় শহরটিতে পৌঁছয়। উদ্দেশ্য, খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহের পাশাপাশি যাঁরা রাশিয়া বা ইউক্রেনে চলে যেতে চান, তাঁদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া।
ইউক্রেনের দক্ষিণের খেরসন অঞ্চলে স্থানীয় ভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় ওলেশকি থেকে বেরোনোর রাস্তাগুলির মাইন সরানো সম্ভব হয়। তাতেই বাসিন্দাদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ খুলে যায়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ‘সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল’ দলের সাংসদ দাভিদ আরাখামিয়া ওলেশকিতে যাওয়া প্রতিনিধিদলের সদস্য ছিলেন। তিনি জানান, সেখান থেকে কয়েকজনকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁরা দক্ষিণ রাশিয়ার আনাপা শহরের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, “সেখান থেকে তাঁরা বিমানে বেলারুশ যাবেন। তার পরে বাসে করে নিজেদের বাড়িতে ফিরবেন।”
ওলেশকি থেকে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডের দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। কিন্তু সরিয়ে নিয়ে যাওয়া বাসিন্দাদের সরাসরি সেখানে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রথমে আনাপা, তার পরে বেলারুশ হয়ে সড়কপথে সীমান্ত পেরিয়ে ইউক্রেনের চেরনিহিভ অঞ্চলে পৌঁছতে হবে তাঁদের।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের দপ্তরের প্রধান কিরিলো বুদানভ অনলাইনে একটি পোস্টে লেখেন, “এই মুহূর্তে ওলেশকিতে মানবিক সহায়তা অভিযান চলছে।” তবে ওলেশকিতে যাওয়া প্রতিনিধিদলে তিনি ছিলেন না।
এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পাঁচশোর বেশি মানুষ ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডে যেতে চান। তবে কনভয়ের সঙ্গে ঠিক কতজন রওনা হয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়।
বাসিন্দাদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুক্রবার বেলা বাড়ার দিকে কিয়েভের প্রতিনিধিদল শহরে পৌঁছয়। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, অঝোর বৃষ্টির মধ্যে মূল উদ্ধারকারী কনভয়ের অপেক্ষায় জড়ো হয়েছেন বাসিন্দারা। চোখের জলে প্রতিনিধিদলের সদস্যদের জড়িয়ে ধরছেন তাঁরা। কয়েকশো মানুষ অবশ্য শহরেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই প্রবীণ।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদলের এক সদস্য এক মহিলাকে জিজ্ঞাসা করছেন, তাঁর মালপত্র গোছানো হয়েছে কি না, তিনি রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত কি না। আন্না নামে নিজের পরিচয় দেওয়া ওই মহিলা বলেন, “হ্যাঁ, আমরা ২০ নম্বর বাসে। আমার ছেলে ১৭ নম্বর বাসে। ইউক্রেনে যাচ্ছি।”
কর্তৃপক্ষ ও স্বেচ্ছাসেবীদের হিসাব অনুযায়ী, ওলেশকিতে এখনও প্রায় দু’হাজার মানুষ রয়ে গিয়েছেন। খাবার ও পানীয় জল জোগাড় করতে মাইন পাতা রাস্তা ধরে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হয় তাঁদের।
কেউ কেউ জানিয়েছেন, দিনে এক কাপ চাল বা বাকহুইট খেয়েই তাঁদের দিন কাটাতে হয়েছে। কখনও তার সঙ্গে জুটেছে একটি টম্যাটো, শসা কিংবা বুনো শাকপাতা।
ইউক্রেনীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত দৃশ্যে এক মহিলাকে বলতে শোনা যায়, “এই পাঁচ বছরে এখানে আমাদের কত কিছুর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে।”
শহর ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে আর এক প্রবীণা বলেন, “শরীরটা ভালো থাকলে হয়তো আরও কিছু দিন থেকে যেতাম। কিন্তু আর পারছি না। আমরা শুধু আমাদের ছেলেমেয়েদের কাছে থাকতে চাই।”
একসময় ওলেশকিতে থাকতেন স্বেচ্ছাসেবী ক্সেনিয়া আরখিপোভা। এখনও সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। তাঁর দাবি, শহরে বিপুল সংখ্যায় রুশ সেনা মোতায়েন রয়েছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে তিনি বলেন, “ওরা এখন ফাঁকা বাড়িগুলি তল্লাশি করছে। কিছু ক্ষেত্রে সেখানে উঠেও পড়ছে।”
তাঁর আরও অভিযোগ, “স্থানীয় বাসিন্দাদের ইউক্রেনে যাওয়ার বদলে রাশিয়ায় চলে যাওয়ার জন্যও চাপ দিচ্ছে ওরা।”
এই এলাকায় যুদ্ধবিরতির সুযোগেই ত্রাণ কনভয়টি পৌঁছয়। যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার মধ্যস্থতায় ভূমিকা নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন আমেরিকার ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। যুদ্ধরত দুই পক্ষের মধ্যে এমন সহযোগিতা বিরল ঘটনা।
তবে শুক্রবার ক্রেমলিন এই উদ্যোগকে একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে নেওয়া পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেছে। বৃহত্তর শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে এই ঘটনা থেকে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন বলেও জানিয়েছে তারা।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার রুশ আক্রমণ শুরুর প্রথম দিকেই ওলেশকি দখল করে রুশ সেনা।
যুদ্ধে শহরটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ২০২৩ সালের জুনে নদীর উজানে অবস্থিত বিশাল কাখোভকা বাঁধ ধ্বংস হওয়ার পর ভয়াবহ বন্যার কবলেও পড়ে ওলেশকি।
ইউক্রেনের মানবাধিকার বিষয়ক ওম্বাডসম্যান দিমিত্রো লুবিনেৎসকে এক মহিলা বলেন, “সমস্যা হল, অনেক মানুষ থেকে যাচ্ছেন।”
রুশ মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনার ইয়ানা লানত্রাতোভার সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনার জন্য লুবিনেৎস ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
মহিলার কথার উত্তরে তিনি বলেন, “আমাকে বলা হয়েছে, এটা তাঁদের নিজেদের সিদ্ধান্ত। অন্তত কোনও ভাবে যাতে মানবিক সহায়তা পৌঁছয়, সে জন্য আমাদের সাধ্যের মধ্যে যা আছে, তা আমরা করব।”
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।