ফিফা সভাপতি নির্বাচনে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একজন প্রার্থী চিহ্নিত করার প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে উয়েফা এবং তার সহযোগীরা। আগামী সপ্তাহেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়ে যেতে পারে।
মার্চের নির্বাচনে ইনফান্তিনোকে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রস্তুতিতে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। যাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান, তাঁদের ১৮ নভেম্বরের মধ্যে প্রার্থিতা নিশ্চিত করতে হবে। তবে বিকল্প প্রার্থী খোঁজার চেষ্টা সফল হতে চলেছে—এমন আস্থা ক্রমশ বাড়ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ধাক্কা সত্ত্বেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা গতি পেয়েছে। ওই ধাক্কাগুলির অন্যতম ছিল এশীয় ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল-খলিফার অবস্থান বদল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে চতুর্থ মেয়াদে সভাপতি হওয়ার জন্য ইনফান্তিনোর উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছেন তিনি।
প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম চূড়ান্ত হলে তা উয়েফার কার্যনির্বাহী কমিটির সামনে পেশ করা হবে। ইউরোপীয় কনফেডারেশনের সদস্য দেশগুলির ফুটবল সংস্থার প্রধানদের একটি অনলাইন বৈঠকেও নামটি তুলে ধরা হবে। ঘোষণা যতটা সম্ভব মনোনয়নের শেষ দিনের কাছাকাছি করার পক্ষেই এখনও মত রয়েছে। মূল উদ্দেশ্য, প্রস্তাবিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফিফার তরফে সম্ভাব্য ‘নোংরা কৌশলের’ প্রচারাভিযানের সুযোগ কমিয়ে দেওয়া। তবে কয়েকটি সূত্রের ধারণা, প্রয়োজনীয় বৈঠকগুলি আগামী সাত দিনের মধ্যেই ডাকা হতে পারে।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে যেসব পরিচিত নাম নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তাঁদের একজন আর্সেন ওয়েঙ্গার। ইউরোপীয় ফুটবলের কোনও কোনও মহলে তাঁকে সবাইকে একজোট করতে সক্ষম প্রার্থী হিসেবে বিশেষ পছন্দও করা হচ্ছে। কিন্তু আর্সেনালের প্রাক্তন ম্যানেজারকে বাস্তবে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে না। বর্তমানে ফিফার বিশ্ব ফুটবল উন্নয়ন বিভাগের প্রধান ওয়েঙ্গারকে এই সপ্তাহেও আজারবাইজানে ফিফার অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপে দেখা গিয়েছে। সেখানে নিজের নিয়োগকর্তার নতুন প্রতিযোগিতার গুণগান করছিলেন তিনি।
যিনিই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করুন না কেন, ইনফান্তিনোকে হারানোর সম্ভাবনা নিয়ে গভীর সংশয়ের মুখোমুখি হতে হবে তাঁকে। ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ বা এফএফই কেলেঙ্কারিতে প্রবল ধাক্কা খাওয়ার পরে গত কয়েক সপ্তাহে নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধারের জন্য আন্তর্জাতিক তৎপরতা শুরু করেছেন ইনফান্তিনো। তাঁকে হারাতে প্রয়োজনীয় ১০৬ ভোট পেতে হলে ইউরোপের ভোটের সঙ্গে এশিয়া, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল কনফেডারেশন কনকাকাফ ও আফ্রিকা থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট যোগ করতে হবে প্রতিদ্বন্দ্বীকে। এমনকি গোপন ব্যালটে ইউরোপের সব ভোটও তাঁর ঝুলিতে পড়বে, তা ধরে নেওয়া যায় না।
নির্বাচনের মাধ্যমে ইনফান্তিনোকে সরানো আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে কোনও কোনও মহলে সংশয় আরও বেড়েছে। একটি যুক্তি হল, রাবাতের নির্বাচনে ব্যাপক বয়কট অথবা ভোটদানে বিরত থাকাই বেশি কার্যকর কৌশল হতে পারে। এই মতের প্রবক্তাদের ধারণা, তাতে ইনফান্তিনো একঘরে হয়ে পড়বেন। ফিফার বিপুল আয়ের জন্য ইউরোপের উপর নির্ভরশীলতার কথা তিনি কখনও গোপন করেননি।
এখন তাঁর সংস্থা এক ধরনের প্রশাসনিক অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে। ২০২৯ সালের পুরুষদের ক্লাব বিশ্বকাপ তার একটি উদাহরণ। প্রতিযোগিতাটির আয়োজক দেশ এখনও ঠিক হয়নি। কোন কাঠামোয়, কোথায় সেটি হবে—সেসব বিষয়েও বিশেষ অগ্রগতি নেই; আয়োজনের কাজ কার্যত জমে রয়েছে।
তা সত্ত্বেও মার্চে ইনফান্তিনোর মুখোমুখি হওয়ার সংকল্প অটুট রয়েছে। প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়ার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন মনে করিয়ে দিচ্ছেন, তত দিনে পরিস্থিতি ফিফা সভাপতির আরও প্রতিকূলে চলে যেতে পারে। ব্যর্থ এফএফই প্রকল্পের নথি প্রকাশের দাবিতে আমেরিকার চারটি আদালতে উয়েফা আবেদন করেছে। ওই নথির ভিত্তিতে আর্থিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে সুইৎজারল্যান্ডে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করতে চায় তারা। এই আইনি উদ্যোগের ছায়া ঝুলছে ইনফান্তিনোর উপর। ফিফা অবশ্য উয়েফার বিরুদ্ধে ‘হয়রানি’ এবং ‘ভুল তথ্য ছড়ানো’র অভিযোগ এনেছে। ইনফান্তিনো কোনও অন্যায় করেছেন বলেও মানতে নারাজ তারা।
আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি প্রাথমিক রায় আসতে পারে। তবে প্রতিকূল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফিফা আপিল করলে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত হতে পারে। মামলায় উয়েফা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পারলে নির্বাচন বা প্রার্থী বাছাইয়ের গোটা প্রক্রিয়াই তখন গুরুত্ব হারাতে পারে।
ফিফার পরিচালনব্যবস্থা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে ৪২টি প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য সোমবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে উয়েফা। প্রশ্নগুলির মধ্যে রয়েছে এফএফই, ফিফার শান্তি পুরস্কার এবং বিশ্বকাপের সময় ফোলারিন বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত। গার্ডিয়ানের কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উয়েফা এখনও কোনও জবাব পায়নি। ইনফান্তিনো গত সপ্তাহে বলেছিলেন, ফিফা ‘প্রক্রিয়া যতটা অনুমতি দেয় এবং আমাদের সামর্থ্যে যতটা কুলায়, সেই অনুযায়ী উত্থাপিত সব প্রশ্নের উত্তর দেবে’।
মঙ্গলবারের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনও ইনফান্তিনোর বিরোধীদের নতুন আশার কারণ হতে পারে। জুলাই মাসে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের বিচারবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য জেমি রাসকিন ইনফান্তিনো, ফিফা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে তদন্ত শুরু করেন। প্রাসঙ্গিক নথিপত্র জমা দিতে এবং এমন একটি সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে ইনফান্তিনোকে বলেছিলেন তিনি, যার বক্তব্য লিখিতভাবে নথিভুক্ত করা হবে। সেই সাক্ষাৎকার এখনও হয়নি। বর্তমানে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে রাসকিনের তদন্ত নতুন গতি পেতে পারে।
অন্য পরিস্থিতি যাই হোক, ১৮ নভেম্বরের আগের সময়টুকু উয়েফা এবং তার সভাপতি আলেকসান্দার চেফেরিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্লোভেনিয়ার এই ফুটবল প্রশাসক ফিফা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি। গত মাসে কোপেনহেগেনে ইউরোপীয় ফুটবল ক্লাবগুলির সাধারণ সভায় ইনফান্তিনোকে আক্রমণ করতে গিয়ে ‘রাজার নতুন পোশাক’-এর উপমা টেনে সেই অবস্থানই আবার স্পষ্ট করেছিলেন তিনি। বাস্তবে লড়াই দিতে পারেন, এমন একজন প্রার্থী দাঁড় করাতে পারলে উয়েফার এই অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই বাড়বে।
অনূর্ধ্ব-২০ মহিলা বিশ্বকাপের আগে উয়েফা যে ভাবে পিছু হটেছিল, তার পুনরাবৃত্তি হলে ক্ষতি হবে। সেই সময়ে প্রতিযোগিতা বয়কটের হুমকি দিয়েও শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল উয়েফা।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।