ইজরায়েলে নতুন সরকার গড়ার প্রথম সুযোগ পাচ্ছেন প্রাক্তন সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। শনিবার, ৭ নভেম্বর, প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকটকে বেছে নেন প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জোগ। ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে কোনও শিবিরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। সরকার গড়ার স্পষ্ট পথও আপাতত কারও সামনে খোলা নেই।
ইজরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকা নেতানিয়াহু এখন ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াইয়ে। তাঁর ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী দলগুলির জোট এ বারের ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও সংসদে এখনও বৃহত্তম জোট।
আরব দলগুলির সমর্থন পেলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে আইজেনকটের। তবে তিনি তাদের সঙ্গে জোট বাঁধতে রাজি হননি। তা সত্ত্বেও আরব নেতারা চেয়েছেন, সরকার গড়ার প্রথম সুযোগ তাঁকেই দেওয়া হোক। নেতানিয়াহু ও তাঁর অতি-দক্ষিণপন্থী শরিকদের যে নীতিকে তাঁরা বর্ণবাদী বলে মনে করেন, তা নিয়ে তাঁরা ক্ষুব্ধ। আরব দলগুলি তাঁর নাম সুপারিশ করায় আইজেনকটই সবচেয়ে বেশি সাংসদের সমর্থন পেয়েছেন।
প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র শনিবার বলেন, “প্রেসিডেন্ট হার্জোগ গাদি আইজেনকটকে প্রেসিডেন্টের বাসভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আগামীকাল সেখানে তাঁকে সরকার গড়ার দায়িত্ব দেওয়া হবে।” ইজরায়েলে প্রেসিডেন্টের ভূমিকা মূলত আনুষ্ঠানিক। তবে নির্বাচনের পরে জোট সরকার গড়ার জন্য কাকে ডাকবেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁর।
দায়িত্ব পাওয়ার পর আইজেনকটের হাতে থাকবে ২৮ দিন। প্রয়োজনে সেই মেয়াদ আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে। ফলে জোট নিয়ে দরকষাকষি কয়েক সপ্তাহ ধরে চলার সম্ভাবনা। তাঁর সামনে তিনটি পথ খোলা। আরব দলগুলির বাইরের সমর্থন নিয়ে তিনি সংখ্যালঘু সরকার গড়তে পারেন। অতি-রক্ষণশীল ইহুদি ধর্মীয় দলগুলির সঙ্গেও জোট বাঁধতে পারেন, যদিও অতীতে তিনি ও তাঁর মিত্ররা ওই দলগুলিকে এড়িয়ে চলেছেন। তৃতীয় পথ, নেতানিয়াহুর সঙ্গে হাত মিলিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গড়া।
বিশ্লেষকদের মতে, তিনটিরই সম্ভাবনা কম। আইজেনকট ব্যর্থ হলে অন্য এক জন সরকার গড়ার সুযোগ পেতে পারেন। সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হলে সংসদ আরও এক জনের নাম প্রস্তাব করতে পারে। গোটা প্রক্রিয়ার জন্য সময় রয়েছে প্রায় ১০০ দিন। তার মধ্যে কেউ সরকার গড়তে না পারলে ফের ভোট হবে।
ইজরায়েলের ১২০ আসনের সংসদ নেসেটে নেতানিয়াহুর লিকুদ ২৭টি আসন জিতে একক বৃহত্তম দল হয়েছে। তবে শরিকদের মিলিয়ে তাঁর জোটের আসন ৫৩। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার ৬১টি। আইজেনকটের ইয়াশার ২১টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে। মধ্য-বাম থেকে দক্ষিণপন্থী, ইহুদি নেতৃত্বাধীন চারটি দল নিয়ে তাঁর জোটের মোট আসন ৪৮। দেশের আরব সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকারী দুই দল মিলে জিতেছে ১৯টি আসন, যা এর আগে কখনও ঘটেনি।
৬৬ বছরের আইজেনকটের বাবা-মা মরক্কো থেকে ইজরায়েলে এসেছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে ইজরায়েলের ইতিহাসে প্রথম বার মিজরাহি সম্প্রদায়ের কেউ ওই পদে বসবেন। পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকায় যাঁদের পারিবারিক শিকড়, সেই ইহুদিরা মিজরাহি নামে পরিচিত।
মিতভাষী আইজেনকট সংবাদমাধ্যমের প্রচার এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করেন। রাজনীতিতে এসেছেন মাত্র ২০২২ সালে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েলে হামাসের হামলার পর অল্প সময়ের জন্য তিনি নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় ছিলেন। পরে বিরোধী শিবিরে ফিরে গাজায় সামরিক অভিযান পরিচালনা-সহ নানা প্রশ্নে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রকাশ্য সমালোচনা করেন। নেতানিয়াহুর সঙ্গে একই সরকারে আর থাকবেন না বলেও তিনি অঙ্গীকার করেছেন।
ইজরায়েলিদের চোখে আইজেনকটের ভাবমূর্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর পরিবারের ব্যক্তিগত শোকও। ২০২৩ সাল থেকে গাজায় লড়াই করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তাঁর এক ছেলে এবং তাঁর ভাইপো-ভাগনেদের মধ্যে দু’জন।
নির্বাচনী প্রচারে দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে নিজের সামরিক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছিলেন আইজেনকট। উল্লেখ করেছিলেন তাঁর ‘দাহিয়ে নীতি’র কথাও। এই নীতি অনুযায়ী, কোনও হামলার জবাবে সেই হামলার মাত্রার তুলনায় অনেক বেশি শক্তি প্রয়োগ করা হয়। ২০০৬ সালে লেবাননে ইরানের মদতপুষ্ট হিজবুল্লার বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় কমান্ডার হিসেবে তিনি এই নীতি প্রয়োগ করেছিলেন।
প্যালেস্তিনীয়দের উপর ইজরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হিংসার সমালোচনা করেছেন আইজেনকট। ২০২৩ সাল থেকে এই হিংসা বেড়ে যাওয়ায় পশ্চিমি দেশগুলির সঙ্গে ইজরায়েলের সম্পর্কেও টানাপড়েন বেড়েছে। নেতানিয়াহুর দুই অতি-দক্ষিণপন্থী জোটসঙ্গী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচেরও বিরোধী তিনি। প্যালেস্তিনীয়দের বিরুদ্ধে হিংসায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে কয়েকটি পশ্চিমি দেশ ওই দুই নেতার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।