দীপাবলিতে ভারতের আকাশে যখন আতশবাজি ফোটে, তখনই ফিরে আসে এক পুরনো বিতর্ক। উৎসবের ঐতিহ্য রক্ষা করতে গিয়ে বায়ুদূষণের কতটা মূল্য দিতে হয়? একই প্রশ্ন উঠেছে চিনেও। সেখানকার যে শহরকে আতশবাজির জন্মস্থান বলা হয়, সেই লিউইয়াং আজও এই শিল্পের প্রাণকেন্দ্র।
দক্ষিণ চিনের হুনান প্রদেশের শহর লিউইয়াং। কথিত আছে, আতশবাজির সঙ্গে এই শহরের যোগ তাং রাজবংশের আমল থেকে। ৬১৮ থেকে ৯০৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে, সেই রাজবংশের শাসনকালেই নাকি আতশবাজির উদ্ভব। চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আজ দেশের আতশবাজির বাজারের প্রায় ৬০ শতাংশ লিউইয়াংয়ের দখলে। চিন যত আতশবাজি রপ্তানি করে, তারও প্রায় ৭০ শতাংশ আসে এই শহর থেকে। আর গোটা পৃথিবীতে যত আতশবাজি তৈরি হয়, তার ৯০ শতাংশই তৈরি করে চিন।
কী করে এমন আধিপত্য গড়ে উঠল? তার উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরতে হয় আতশবাজির গোড়ার কথায়। সেই সঙ্গে দেখতে হয়, যে অনুকূল পরিবেশ চিনের আরও বহু শিল্পকে বিশ্ববাজারে জায়গা করে দিয়েছে, তা কী ভাবে কাজে এসেছিল লিউইয়াংয়ে। এই ইতিহাসে নিরাপত্তা ও দূষণ নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগেরও ভূমিকা আছে।
বাঁশের নলে বারুদ থেকে বিশ্ববাজার
আতশবাজির জন্ম নিয়ে চিনে নানা কিংবদন্তি চালু আছে। কোনও গল্পে মানুষ খুঁজছিল অমরত্বের উপায়, কোনও গল্পে অশুভ আত্মা তাড়ানোর।
একটি কাহিনি অনুযায়ী, প্রাচীন চিনের রসসাধকেরা নানা পদার্থের গুঁড়ো মিশিয়ে পরীক্ষা করছিলেন। তার মধ্যে ছিল সোরা ও গন্ধক। সোরা জোগায় দহনের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন, আর গন্ধক জ্বালানির কাজ করে। সেই পরীক্ষা থেকেই নাকি আচমকা তৈরি হয়েছিল আদিযুগের আতশবাজি। গোড়ায় বাঁশের নলে গুঁড়ো ভরা হত। আজকের আতশবাজির আলোর বাহার তখন কোথায়! তবে শব্দ হত, স্ফুলিঙ্গও ছিটকে বেরোত। আতশবাজির মূল উপাদান বারুদও চিনের আবিষ্কার। সোরা, গন্ধক ও কাঠকয়লা দিয়ে তৈরি হয় এই বারুদ।
আবিষ্কারের এই সব গল্প ঘুরেফিরে এসে পৌঁছয় লিউইয়াংয়ে। চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “শতাব্দীর পর শতাব্দী লিউইয়াংয়ে বাজি তৈরি ছিল এক ঝুঁকিপূর্ণ কুটিরশিল্প। পরিবারের লোকেরা হাতে বারুদ মেশাতেন, হাতে করেই তা বাজির খোলে ভরতেন। এ কাজে যেমন কারিগরি নৈপুণ্য ছিল, তেমনই ছিল গুরুতর দুর্ঘটনার ঝুঁকি আর ব্যাপক দূষণ।”
এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৪৯ সালে চিনে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরে নতুন শাসকেরা এই দীর্ঘ ঐতিহ্যের সুফল গোড়াতেই পাননি। একের পর এক যুদ্ধের ধাক্কা ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মতো নীতির প্রভাবে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মোড় ঘোরে ১৯৭২ সালে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের চিন সফরের পর। ওয়াশিংটন ও বেজিংয়ের মধ্যে তখনও আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। সিএনএনের ভাষায়, ওই সফরের পরেই “চিনের আতশবাজি শিল্পে বড় মাপের পুনরুজ্জীবন ঘটে। পশ্চিমে এত দিনে যে কারিগরি জ্ঞান সঞ্চিত হয়েছিল, তা ফিরে আসে চিনে।”
গোড়ায় অবশ্য রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল গুয়াংডং প্রদেশের দংগুয়ান শহর। পার্ল নদী এবং বাণিজ্যকেন্দ্র হংকং কাছে থাকায় সুবিধা পেয়েছিল দংগুয়ান। নব্বইয়ের দশকে নগরায়ণের চাপ আর পরপর কয়েকটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার জেরে বাজি তৈরির কাজ আবার তার আদি কেন্দ্র লিউইয়াংয়ে ফিরতে শুরু করে।
এ শিল্পে প্রচুর শ্রমিক লাগে। লিউইয়াংয়ে সহজেই শ্রমিক পাওয়া যেত বলে মজুরি বাবদ খরচ কম পড়ত। সিএনএনের মতে, আরও দু’টি বিষয় সম্ভবত শহরটিকে এগিয়ে দিয়েছিল। পশ্চিমের বাজি উৎপাদনকেন্দ্রগুলির তুলনায় এখানে এই বিপজ্জনক কাজের বিধিনিষেধ ছিল শিথিল। তা ছাড়া, বাজি তৈরিতে দামি বা জটিল যন্ত্রপাতিরও প্রয়োজন হত না।
দেশের চাহিদাও লিউইয়াংয়ের শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে। চিনা চান্দ্র নববর্ষ থেকে জাতীয় দিবস, নানা উৎসবেই এখন বিরাট আকারে আতশবাজির প্রদর্শনী হয়। ফলে বছরে কয়েক দফায় বাজির বিক্রি বাড়ে।
চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে এই সমৃদ্ধিকে দেশের ‘আবেগনির্ভর অর্থনীতি’র অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ বিনোদন, কোনও বিশেষ অভিজ্ঞতার স্বাদ কিংবা আবেগের টানে মানুষ যে খরচ করে, সেই বাজার। গবেষণা সংস্থা আইআইমিডিয়া রিসার্চের হিসাবে, ২০২৫ সালে চিনে এই গোটা বাজারের আকার দাঁড়িয়েছিল ২ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি ইউয়ান বা ৩৮ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। ২০২৯ সালের মধ্যে তা সাড়ে ৪ লক্ষ কোটি ইউয়ান ছাড়িয়ে যাবে বলে পূর্বাভাস।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, “এক সময় আতশবাজির কদর ছিল শুধু উৎসবের দিনগুলিতে। এখন তা সারা বছরের সাংস্কৃতিক আকর্ষণ। শহরের স্কাই থিয়েটারকে ঘিরে লিউইয়াংয়ে সপ্তাহান্তের আতশবাজি দেখতে নিয়মিত ভিড় করছেন পর্যটকেরা। ২০২৩ সাল থেকে শহরে ১৪২টি বড় প্রদর্শনী হয়েছে। দর্শক এসেছেন ৭০ লক্ষেরও বেশি।”
দুর্ঘটনা, দূষণ আর উৎসবের টান
গত কয়েক দশকে চিনের বাজি কারখানাগুলিতে একাধিক দুর্ঘটনার পর নতুন বিধিনিষেধ চালু হয়েছে। কখনও সাময়িক নিষেধাজ্ঞাও জারি হয়েছে। এ বছরের মে মাসেই লিউইয়াংয়ের একটি বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে ২৬ জনের মৃত্যু হয়। অথচ তার কয়েক মাস আগেই, খবর অনুযায়ী, চান্দ্র নববর্ষ উদ্যাপনের জন্য বিভিন্ন এলাকায় বাজি ফোটানোর বিধিনিষেধ শিথিল করছিল স্থানীয় প্রশাসন।
খবরে লেখা হয়েছে, “বেশ কয়েক বছর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকার পর ২০০৬ সালে আতশবাজির নিরাপত্তা নিয়ে জাতীয় স্তরে একগুচ্ছ নিয়ম চালু হয়। সেই নিয়মে স্থানীয় প্রশাসনকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তারা সময়, স্থান ও বাজির ধরন অনুযায়ী তার ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমিত করতে পারে। … তবে চিনে স্থানীয় প্রশাসন কেন্দ্রীয় নীতির ব্যাখ্যায় সাধারণত সাবধানী, আর নিয়ম প্রয়োগের সময় কড়াকড়ির দিকেই ঝোঁকে।”
চিন সরকারের বক্তব্য, বাজি শিল্পের আধুনিকীকরণ ও শ্রমিকদের কাজের পরিবেশের উন্নতিতে বেশ কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ক্যামেরা থেকে তথ্য যাচ্ছে কেন্দ্রীয় সতর্কীকরণ ব্যবস্থায়, যাতে বিপদের আগাম আভাস মেলে। বিপজ্জনক রাসায়নিক নিয়ে কাজের কিছু ধাপও এমন ভাবে বদলানো হয়েছে যাতে শ্রমিকদের আর সরাসরি সেগুলি হাতে নিয়ে কাজ করতে না হয়।
ভারতের মতো চিনেও বায়ুদূষণ নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে এসে পড়েছে আতশবাজি। চিনা কমিউনিস্ট পার্টির ট্যাবলয়েড গ্লোবাল টাইমস ২০১৫ সালে লিখেছিল, “চান্দ্র নববর্ষে বাজি ফোটানো চিনের বহু প্রাচীন প্রথা। এক সময় বিশ্বাস ছিল, বাজির আলো আর শব্দে অশুভ আত্মারা ভয় পেয়ে পালায়। … কিন্তু দেশের ধোঁয়াশা বাড়ার জন্য ক্রমেই আতশবাজিকেও দায়ী করা হচ্ছে। ফলে স্থানীয় প্রশাসন বাজির প্রদর্শনী নিষিদ্ধ করছে, কোথাও বা তার পরিধি বেঁধে দিচ্ছে।”
দূষণ কমাতে বাজি তৈরির নতুন মিশ্রণ চালু হয়েছে। তবে বিধিনিষেধ নিয়ে সমালোচনা ও প্রতিরোধও আছে। ২০১৮ সালে বেজিংয়ে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা জারির পর উৎসবের দিনে আতশবাজির অভাব নিয়ে শহরবাসীর আক্ষেপের কথা তুলে ধরেছিল সরকারি সংবাদমাধ্যম। সেই প্রতিবেদনে লেখক ফেং জিছাই বলেছিলেন, “গোড়ায় বাজি ফোটানো হত ‘নিয়ান’কে ভয় দেখাতে। লোককথার এই জন্তু বছর বদলের সময়ে মানুষ আর গবাদি পশুর ওপর চড়াও হত, অথচ জোরে শব্দ হলেই ভয় পেত। … শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চিনের মানুষ বাজির শব্দে নতুন বছরকে বরণ করে এসেছেন।”
মধ্য চিনের হেনান প্রদেশে বায়ুদূষণের সমস্যা ছিল অত্যন্ত গুরুতর। সেখানেও ২০১৭ সালে বাজির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল। সরকারি সংবাদমাধ্যমের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, “গ্রামবাসীদের প্রবল বিরোধিতায়” নিষেধাজ্ঞা জারির মাত্র দু’দিনের মাথায় তা তুলে নিতে হয়েছিল।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।