দোহার সময় শুক্রবার সকালে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিকে ফোন করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আলোচনার বিষয় ছিল, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ আর ছড়িয়ে পড়ার আগে কী ভাবে ওয়াশিংটন ও তেহরানকে সমঝোতায় আনা যায়। সে দিনই সন্ধ্যায় ফ্লরিডায় নেমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের জানান, ইরানের একটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নতুন করে আঘাত হেনেছে আমেরিকা। এর কিছু আগেই ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম হরমুজ প্রণালীর কেশম দ্বীপের সুজা এলাকায় পরপর দু’টি বিস্ফোরণের খবর দিয়েছিল।
ট্রাম্পের বর্ণনায় অভিযান ছিল সীমিত। তাঁর দাবি, ইরান সম্প্রতি বিমান হামলা ঠেকাতে একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। সেটি অকেজো করতে মার্কিন বাহিনীর লেগেছে পাঁচ থেকে পনেরো মিনিট। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত হিসাব তিনি দেননি। ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরে ইরানে এটিই প্রথম মার্কিন হামলা। ভোটের আগের দিনও কেশম ও সংলগ্ন এলাকায় বিস্ফোরণ শোনা গিয়েছিল। সে বারের অভিযানকে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেছিল। এই নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে রিপাবলিকান পার্টি। যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকা এবং জ্বালানির চড়া দাম নিয়ে ভোটারদের একাংশের ক্ষোভ ছিল।
কাতারের আমিরের দপ্তর জানিয়েছে, শুক্রবারের ফোনালাপে শেখ তামিম দু’টি বিষয়ে জোর দেন। তিনি চান, বাণিজ্যিক জাহাজ অবাধে চলাচল করুক এবং জ্বালানির সরবরাহ নিরাপদ থাকুক। উপসাগর থেকে তেল নিয়ে বেরোনোর অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ। এই যুদ্ধের গোড়ায় ইরানের পাল্টা হামলার মুখে পড়েছিল কাতার-সহ আমেরিকার একাধিক আরব মিত্র। ফলে দু’পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করতে গিয়ে দোহাকে নিজের নিরাপত্তার কথাও ভাবতে হচ্ছে।
আলোচনা এগোতে কাতার যে প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে প্রথম দু’দিনে কে কী করবে, তারও রূপরেখা রয়েছে। প্রস্তাব সম্পর্কে অবহিত আঞ্চলিক আধিকারিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম দিনে আমেরিকা ইরানের বন্দরগুলির উপর থেকে নৌ-অবরোধ তুলে নেবে এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি অর্থের একাংশ ছেড়ে দেবে। বিনিময়ে মার্কিন ও ইজরায়েলি বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত পরমাণু কেন্দ্রগুলিতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের ঢুকতে দেবে তেহরান। দ্বিতীয় দিনে ইরান হরমুজ প্রণালী ফের খুলে দেবে। কোন পথ দিয়ে জাহাজ চলবে, তা নিয়ে ওমানের সঙ্গে ইরানের যে বোঝাপড়া হয়েছে, সেটিই আপাতত কার্যকর করার কথা। ওয়াশিংটন এখনও সেই ব্যবস্থায় সম্মতি দেয়নি।
আট মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে। ট্রাম্প চান, যুদ্ধ শেষ করার চুক্তিতেই তার নিষ্পত্তি হোক। তেহরানের অবস্থান, যুদ্ধবিরতির কয়েকটি শর্ত আমেরিকা আগে মানলে তবেই পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দরকষাকষি শুরু হতে পারে। কাতারের প্রস্তাব কার্যকর হলে পরের দফায় আলোচনায় উঠবে ইরানের হাতে মজুত উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রশ্ন। দুই আঞ্চলিক আধিকারিক অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, ইরান প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখছে। হোয়াইট হাউস এর শর্তগুলি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেনি।
শনিবারও সমুদ্রে নৌ-অবরোধ বলবৎ রেখেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের একটি বন্দর ছেড়ে আসা এক বাণিজ্যিক জাহাজকে একাধিক বার সতর্ক করা হয়েছিল। জাহাজটি নির্দেশ অমান্য করায় ওমান উপসাগরে মার্কিন সামরিক বিমান তার পিছনের অংশে গুলি চালিয়ে সেটি অচল করে দেয়। সে দিন সন্ধ্যায় কেশম ও ইরানের জাস্ক বন্দরেও ফের বিস্ফোরণ শোনা যায়। ওই বিস্ফোরণগুলির কারণ তখনও স্পষ্ট হয়নি।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মহম্মদ বিন আবদুলরহমান আল থানি অবশ্য জানিয়েছেন, মার্কিন নির্বাচনের পরেও মধ্যস্থতা চলছে। অক্সফোর্ডে এক আলোচনায় তাঁর বক্তব্য, নিখুঁত চুক্তির অপেক্ষায় বসে থাকার অবকাশ নেই। আপাতত এমন একটি সমঝোতা দরকার, যা দুই পক্ষই কার্যকর করতে পারবে। হরমুজ দিয়ে আবার কোন শর্তে তেলবাহী জাহাজ চলবে আর ইরানের বন্দর থেকে কবে মার্কিন অবরোধ উঠবে, সেই দুই প্রশ্নেই এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের জবাবের অপেক্ষায় দোহা।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।