জয়পুরের ব্যবসায়ীদের কাছে ফোন আসত বিদেশি নম্বর থেকে। কখনও হোয়াটসঅ্যাপে, কখনও সিগন্যালে। দাবি একটাই, টাকা দিতে হবে। রাজস্থান পুলিশের অভিযোগ, সেই সব ফোনের পিছনে ছিলেন হরিচাঁদ জাট ওরফে হ্যারি বক্সার। জেলবন্দি গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইয়ের এই ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ক্যালিফোর্নিয়ায় আটক করেছে আমেরিকার অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিই। শনিবার রাজস্থান পুলিশ জানায়, ভারতীয় তদন্তকারীদের কাছ থেকে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে খবর পেয়েছিলেন মার্কিন আধিকারিকেরা। এর কয়েক দিন আগেই আমেরিকায় আটক হন হিমাংশু ভাউও। ভারতের একাধিক মামলায় তাঁকেও খুঁজছিল পুলিশ।

চল্লিশ বছরের হরিচাঁদের বাড়ি রাজস্থানের কোটপুতলি-বেহরোর জেলার ছতরপুরা গ্রামে। চাষি পরিবারের ছেলে এক সময় পুলিশ বা সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে জয়পুরে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে বক্সিং শেখাতেন। সেই সূত্রেই ‘বক্সার’ নামটি জুড়ে যায় তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে। তদন্তকারীদের বক্তব্য, স্থানীয় মারামারি থেকে ডাকাতি ও তোলাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন হরিচাঁদ। পরে বিষ্ণোইয়ের দলে তাঁর গুরুত্ব বাড়ে। গোল্ডি ব্রার ও রোহিত গোদারার সঙ্গে লরেন্সের সম্পর্ক ভেঙে গেলে ভারতে দলের কাজকর্ম দেখার ভার পান হ্যারি।

রাজস্থান পুলিশের অ্যান্টি-গ্যাংস্টার টাস্ক ফোর্সের দাবি, বিদেশ থেকে হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি ভারতে দলের লোকজনকে অস্ত্র জোগানোর ব্যবস্থাও করতেন হ্যারি। ফোনের উৎস আড়াল করতে ব্যবহার করতেন ভিপিএন। ব্যবসায়ীরা টাকা দিতে অস্বীকার করলে তাঁদের বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালাত চক্রের লোকেরা, এমনই অভিযোগ পুলিশের। খুনের চেষ্টা, তোলাবাজি, বেআইনি অস্ত্র রাখা ও সংগঠিত অপরাধ মিলিয়ে শুধু রাজস্থানেই কুড়িটির বেশি মামলায় তাঁকে খুঁজছিল পুলিশ। দিল্লি, হরিয়ানা, পঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রেও তাঁর কাজকর্মের হদিস পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তদন্তকারীরা।

এ বছর ফেব্রুয়ারিতে মুম্বইয়ে পরিচালক রোহিত শেট্টির বাড়ির বাইরে গুলি চলার পরে সমাজমাধ্যমে সেই ঘটনার দায় স্বীকার করেন হ্যারি, জানিয়েছে পুলিশ। তার এক সপ্তাহ পরে অভিনেতা রণবীর সিংহের ম্যানেজারের কাছে তিনটি অডিয়ো বার্তা আসে। একটিতে দাবি করা হয় ২০ কোটি টাকা। বার্তাগুলি হ্যারির পাঠানো বলে সন্দেহ তদন্তকারীদের। রণবীরকে হুমকির ঘটনায় মুম্বই পুলিশের অপরাধ দমন শাখা তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর করেছে।

আরও দু’টি অডিয়ো ক্লিপ পেয়েছেন তদন্তকারীরা। একটির সঙ্গে যোগ রয়েছে পশ্চিম দিল্লির পশ্চিম বিহারে গায়ক গুরু রানধাওয়ার জিমে গুলি চালানোর ঘটনার। অন্যটি হরিয়ানার হাঁসিতে নিজের জিমের বাইরে প্রশিক্ষক কপিল রেঢ়ুর খুনের সঙ্গে সম্পর্কিত। পুলিশের বক্তব্য, দু’টি হামলারই দায় স্বীকার করেছিলেন হ্যারি। এর আগে, ২০২৫ সালের অগস্টে, কানাডায় কৌতুকশিল্পী কপিল শর্মার ক্যাফেতে গুলি চলার পরেও হ্যারির বলে প্রচারিত একটি অডিয়ো ক্লিপ প্রকাশ্যে আসে। তাতে সলমন খানের সঙ্গে কাজ করলে বলিউডের প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতাদের পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়।

পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৫ এপ্রিল দিল্লি বিমানবন্দর দিয়ে দেশ ছাড়েন হরিচাঁদ। ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে রেড কর্নার নোটিস জারি করে ইন্টারপোল। দক্ষিণ আমেরিকার গায়ানায় তাঁর খোঁজ পেয়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে সাময়িক ভাবে গ্রেপ্তারের অনুরোধ পাঠায় ভারত। রাজস্থান পুলিশের দাবি, সেই সময়েই গায়ানা ছেড়ে মেক্সিকো হয়ে বেআইনি পথে আমেরিকায় ঢোকেন তিনি।

হ্যারির গতিবিধির খোঁজ পেতে সিবিআইয়ের মাধ্যমে পাঁচটি দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রাজস্থান পুলিশ। তাঁর অবস্থান জানতে এবং তাঁকে হেফাজতে নিতে সাহায্য চেয়ে বিভিন্ন দেশের কাছে ইন্টারপোলের মাধ্যমে চোদ্দো বার বার্তা পাঠানো হয়। ক্যালিফোর্নিয়ায় তাঁর অবস্থান চিহ্নিত করার পরে শুধু মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছেই ন’বার বার্তা পাঠায় রাজস্থানের টাস্ক ফোর্স। চলতি বছরের অগস্টে পাঠানো হয় হালনাগাদ নথি, অক্টোবরে আঙুলের ছাপ। হ্যারি আপাতত মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হেফাজতে। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে রাজস্থান পুলিশ।