বুধবার সকালে ইজরায়েলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাঁড়াল। স্পষ্ট হয়ে গেল, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সরকার গড়ার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক ভাগ্য এখন নির্ভর করছে বিরোধী ইহুদি দলগুলি প্যালেস্টিনীয় দলগুলির সঙ্গে অভিন্ন মঞ্চ গড়তে রাজি হয় কি না, তার উপরে। মঙ্গলবারের নির্বাচনে প্যালেস্টিনীয় দলগুলির প্রতি সমর্থন উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে।

কিন্তু ইহুদি দলগুলির বিরোধী জোটের নেতা, অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল গাদি আইজেনকট, রাতেই সময়ের আগে বিজয় ঘোষণা করতে গিয়ে কার্যত এমন বৃহত্তর জোটের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, নির্বাচনে জয়ী হয়েছে ‘জায়নবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠতা’।

বুধবার ভোটগণনা যত এগিয়েছে, ততই সংশয় বেড়েছে প্রাথমিক বুথফেরত সমীক্ষার পূর্বাভাস নিয়ে। সেই সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, নেতানিয়াহুর জোটের চেয়ে সামান্য এগিয়ে থাকবে আইজেনকটের শিবির। কিন্তু গণনায় প্রধানমন্ত্রীর জোট অল্প ব্যবধানে এগিয়ে যেতে শুরু করে। তখনও ডিউটিতে মোতায়েন সেনাসদস্য এবং নিজেদের নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রের বাইরে ভোটদানকারীদের অন্যান্য ব্যালট গণনা বাকি।

৭০ শতাংশ ভোট গণনার পরে প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়, সরকার গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি নেসেট আসন পাবে না ইহুদি দলগুলির কোনও শিবিরই। ফলে আইজেনকট ও তাঁর সহযোগীদের সামনে দু’টি পথ: হয় ইজরায়েলের আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলির সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছতে হবে, যারা রেকর্ড ১৬ থেকে ১৯টি আসন পাওয়ার পথে; অথবা ফের নির্বাচন কিংবা ঐক্যের সরকার গঠনের সুযোগ দিয়ে নেতানিয়াহুকে রাজনৈতিক ভাবে টিকে থাকার অবলম্বন জোগাতে হবে।

এ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর প্রত্যাশার চেয়ে ভাল ফলের কৃতিত্ব দাবি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য, ভোটের আগে নেতানিয়াহুকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানানোটাই ফলাফলে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। ট্রাম্প বলেন, “সমর্থনের ঘোষণা প্রকাশ্যে আসার পরে ওঁর অনেক সুবিধা হয়েছে।” তাঁর মতে, ফলাফল হয় অচলাবস্থার দিকে যাচ্ছে, নয়তো নেতানিয়াহুর জয়ের দিকে।

আইজেনকটের ‘চেঞ্জ’ জোটের ছোট শরিক, মধ্য-বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়াইর গোলান অবশ্য দুই প্যালেস্টিনীয় দল—জয়েন্ট লিস্ট এবং রা’আম বা ইউনাইটেড আরব লিস্টের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন।

এক্স-এ একটি পোস্টে গোলান লিখেছেন, “আমরা যদি ভয় পাওয়া বন্ধ না করি, যদি বর্ণবিদ্বেষের অবসান না ঘটাই, তা হলে এখানে আমাদের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। ইহুদি ও আরব ভোটের মধ্যে নেতানিয়াহু যে বর্ণবিদ্বেষী বিভাজন করেন, তা আমরা আর মেনে নিতে পারি না।”

তিনি আরও বলেন, “যাঁরা আরব নাগরিকদের ভোট মুছে দিতে চান, তাঁরা আসলে নেতানিয়াহুর কাছে আত্মসমর্পণ করছেন এবং ইজরায়েলের ভবিষ্যতের আশা ছেড়ে দিচ্ছেন।” গোলান মনে করিয়ে দেন, নেতানিয়াহু নিজেই এমন অতি-রক্ষণশীল ইহুদি দলগুলির উপরে নির্ভর করেন, যারা জায়নবাদী নয় এবং নিজেদের সম্প্রদায়ের মানুষের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরোধী।

হারেৎজ পত্রিকায় ভাষ্যকার নোয়া লান্দাউ লিখেছেন, সরকার গড়ার শর্ত হিসেবে জায়নবাদকে সামনে রেখে সম্ভাব্য শরিকদের বাদ দিয়েছেন আইজেনকট। অথচ প্রধানমন্ত্রী নিজের জন্য এমন শর্ত রাখেননি। এ ভাবে আইজেনকট “গোটা নির্বাচনী প্রচারপর্ব জুড়ে নেতানিয়াহু তাঁর জন্য যে ফাঁদ পেতেছিলেন, তাতেই পা দিয়েছেন”।

জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসুফ জাবারিন বলেছেন, তাঁদের দলের জোরালো ফলের অর্থ হল, “কোনও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেই আমাদের উপেক্ষা করা যাবে না।” তাঁর অভিযোগ, নেতানিয়াহুর সরকার, বিশেষ করে সরকারের চরমপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির, “প্রত্যেক আরব নাগরিকের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছেন”।

জাবারিন বলেন, “নেতানিয়াহু, বেন-গভির ও স্মোট্রিচের সরকারকে উৎখাত করে তাঁদের বাড়ি পাঠানোর পথ তৈরি করতে আমরা প্রস্তুত থাকব।” জয়েন্ট লিস্টের আর এক নেতা বলেছেন, ইহুদি বিরোধী দলগুলিকে এখন বেছে নিতে হবে—“আধিপত্যবাদ, না গণতন্ত্র নির্মাণ”।

সব ভোট গণনা শেষ হতে আরও কয়েক দিন লাগতে পারে। নিজেদের নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থেকে ভোট দিতে পারেননি যাঁরা, তাঁদের ব্যালট গোনা হবে সবার শেষে। এর অধিকাংশই ডিউটিতে মোতায়েন সেনাসদস্যদের ভোট। সাধারণত সেনাবাহিনীর ভোটে ডানপন্থীদের পাল্লা ভারী থাকে। তবে এ বার সেই পরিচিত ছবিতে কিছুটা বদল আসতে পারে। কারণ, তুলনায় বয়স্ক ও মধ্যপন্থী বহু রিজার্ভ সেনাসদস্য এখন সক্রিয় দায়িত্বে রয়েছেন।

সব ভোটের হিসাব হয়ে গেলে ইজরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ কোনও এক দলনেতাকে সরকার গড়ার জন্য ছয় সপ্তাহ সময় দেবেন। প্রথম যাঁকে সুযোগ দেওয়া হবে, তিনি ব্যর্থ হলে দায়িত্ব যাবে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে। এর পরে কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজনৈতিক দর-কষাকষি চলতে পারে। সেই সময়ে নেতানিয়াহু ও আইজেনকট, দু’জনেই পরস্পরের শিবির থেকে দলত্যাগী টানার চেষ্টা করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা গড়ে না ওঠা পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থাকবেন নেতানিয়াহু। অচলাবস্থার জেরে ফের নির্বাচন হলে তাঁর লাভ হতে পারে বলেও তিনি আশা করতে পারেন। যেমন, মঙ্গলবার ভোট দিতে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছিলেন কয়েক দশ হাজার প্রবাসী ইজরায়েলি। তাঁদের অধিকাংশই শাসক জোটের বিরোধী। আবার ভোট হলে তাঁরা সকলে হয়তো আর ফিরবেন না।

এমন সময়ে মঙ্গলবারের নির্বাচন হয়েছে, যখন গাজায় গণহত্যা এবং ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে প্যালেস্টিনীয়দের জাতিগত নির্মূলের অভিযোগের মুখে ইজরায়েল। পৃথক ভাবে, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানাও রয়েছে।

এই নির্বাচনকে ব্যাপক ভাবে দেখা হচ্ছিল ৭৭ বছর বয়সি নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের উপরে গণভোট হিসেবে। ভোট পড়েছে ৭৭.৭ শতাংশ, যা ১৯৯৯ সালের পরে সর্বোচ্চ। কর্মরত সেনাসদস্যদের ভোটদানের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে।

রাজনৈতিক অচলাবস্থার জেরে অতীতেও ইজরায়েলে বারবার নির্বাচন হয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশটিতে পাঁচ বার ভোট হয়।

ইজরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রধানমন্ত্রিত্ব করেছেন নেতানিয়াহু। গত ৩০ বছরের মধ্যে ১৯ বছরই তিনি সরকার চালিয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার লড়াইয়ে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতির মামলায় জড়িয়ে থাকা নেতানিয়াহু এবং তাঁর অতি-দক্ষিণপন্থী জোট নির্বাচনী প্রচারে ভিনজাতির প্রতি বিদ্বেষ ও আতঙ্ক উসকে দিয়েছে। বোঝাতে চেয়েছে, তিনি ক্ষমতায় না থাকলে ইজরায়েল পরমাণু হামলার সামনে অসহায় হয়ে পড়বে।

ইজরায়েলের মাপকাঠিতেও এ বারের নির্বাচনী প্রচার ছিল অস্বাভাবিক উত্তেজনায় ভরা। ভোটগ্রহণ শুরুর আগের দিন নেতানিয়াহু এমন একটি ছবি পোস্ট করেন, যাতে দেখা যাচ্ছে, পরমাণু বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তেল আভিভ।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলের জনপদগুলিতে হামাসের প্রাণঘাতী হামলার পর থেকে ইজরায়েল গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে এবং ৭৪ হাজারেরও বেশি প্যালেস্টিনীয়কে হত্যা করেছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, সিরিয়ায় নতুন ভূখণ্ড দখল করেছে এবং আমেরিকার সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে।