আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে এক বিশ্বব্যাপি বার্তা পৌঁছে দিয়ে নয়াদিল্লিতে সফলভাবে সম্পন্ন হলো ব্রিকস (BRICS) সংসদীয় ফোরামের বহুল প্রতীক্ষিত সম্মেলন। এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনের সমাপনী দিনে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হলো ঐতিহাসিক ‘নয়াদিল্লি যৌথ ঘোষণা’ (New Delhi Joint Declaration)। সদস্য দেশগুলির সংসদীয় প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এই ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে মূলত জাতিসংঘ (UN) ও তার নিরাপত্তা পরিষদের অবিলম্বে জরুরি রাজনৈতিক সংস্কার, বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কের (Multilateralism) গুরুত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একজোটে জিরো-টলারেন্স নীতি নিয়ে কমপ্রিহেনসিভ বা সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।

সম্মেলনে গৃহীত যৌথ ঘোষণাপত্রে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিঘ্নিতকারী নানাবিধ সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিশ্বমঞ্চে গ্লোবাল সাউথের (Global South) দেশগুলির সঠিক প্রতিনিধিত্ব ও কণ্ঠস্বর সুনিশ্চিত করতে জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির পুনর্গঠন অপরিহার্য বলে মত প্রকাশ করেন ব্রিকস সদস্য রাষ্ট্রগুলির প্রতিনিধিরা। উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বহুমুখী ও গণতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে।

এই ঐতিহাসিক ঘোষণার অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল স্তম্ভ হলো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ দমনে একটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর যৌথ কৌশল গ্রহণ। যেকোনো রূপ বা চেহারার সন্ত্রাসবাদকেই আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য চরম হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিন্দা জানানো হয়েছে। নয়াদিল্লি ঘোষণায় স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, কোনো রাজনৈতিক, আদর্শগত বা সামাজিক অজুহাতে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন বা অজুহাত দেওয়া যাবে না। সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন বন্ধ করা, সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ধ্বংস করা এবং আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলি পুরোপুরি নির্মূল করতে জাতিসংঘের আওতায় সকল রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এছাড়াও, ব্রিকস দেশগুলির মধ্যে বাণিজ্য, ডিজিটাল প্রযুক্তি, শক্তি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান জোরদার করার ক্ষেত্রে সংসদীয় কূটনীতির ভূমিকা আরও বাড়ানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে এই সম্মেলনে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যেকোনো আঞ্চলিক সংঘাত বা বিবাদ সামরিক শক্তি প্রয়োগের বদলে শান্তিপূর্ণ আলোচনা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে সমাধানের বার্তা দিয়েছে এই ফোরাম। ভারতকে আয়োজক হিসেবে ধন্যবাদ জানিয়ে গৃহীত এই নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতিতে ব্রিকসের সম্মিলিত অবস্থান ও প্রভাবকে আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে বিশ্ব রাজনীতি বিশ্লেষকদের ধারণা।