বাংলাস্ফিয়ার: পাঁচ বছরেরও বেশি সময় পরে প্রথম বার মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে কিম আরিসের মনে হয়েছে, মায়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকারের প্রাক্তন নেত্রী অং সান সু চি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভালই আছেন। তবে ৮১ বছরের সু চি প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর ছেলে।

আরিস বলেন, “কথা শুনে মনে হয়েছে, মা এখনও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সজাগ। শারীরিকভাবেও তাঁকে শক্তসমর্থ বলেই মনে হয়েছে। আমার মনে হয় না, সেনাবাহিনী বা পুলিশের লোকজন ছাড়া তাঁর আশপাশে আর কেউ আছেন। ফলে আমি যতটা বুঝতে পারছি, কার্যত তাঁকে নির্জন কারাবাসেই রাখা হয়েছে।”

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী সু চি-কে রাজধানীর একটি অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আরিস বলেন, “মা ঠিক কোথায় আছেন, এখনও আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই। আমার ধারণা, নেপিডোর কোনও একটি বাড়িতে রয়েছেন। জায়গাটি বেড়া দিয়ে ঘেরা, চারপাশে ঝোপঝাড়ে ঢাকা কিছু জমি রয়েছে।”

জীবনের অধিকাংশ সময় ব্রিটেনে কাটিয়েছেন আরিস। তাঁর প্রয়াত বাবা ছিলেন ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ। বৃহস্পতিবার লন্ডনে মায়ানমারের দূতাবাস থেকে তাঁকে মায়ের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেওয়া হয়। এই সুযোগ পাওয়ায় তিনি খুশি হলেও তাঁর বক্তব্য, আমন্ত্রণটি ছিল দেশের সামরিক নেতাদের “জনসংযোগ” প্রচারের অংশ।

প্রাক্তন সামরিক জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। ব্যাপকভাবে প্রহসন বলে নিন্দিত নির্বাচনের পরে এপ্রিলে তিনি সামরিক পোশাক ছেড়ে অসামরিক পোশাক পরেছেন।

অং সান সু চি এবং আরও বহু রাজনৈতিক বন্দি বেঁচে আছেন কি না, তার প্রমাণ প্রকাশের দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন মানবাধিকারকর্মীরা। শেষ পর্যন্ত অগস্টে রেড ক্রসের প্রতিনিধিদের সফরের সময় তাঁর ছবি তোলা হয়। গত সপ্তাহে সরকারের এক মুখপাত্র আরও কয়েকটি ছবি প্রকাশ করেন। সেখানে দেখা যায়, কাঠের প্যানেলে মোড়া একটি ঘরে হাসিমুখে বসে রয়েছেন সু চি। ব্রিটেনের রাজা চার্লসের উপহার দেওয়া বাগান পরিচর্যার দু’টি বই তাঁর হাতে তুলে দিচ্ছেন আধিকারিকেরা। পিছনের দেওয়ালে টাঙানো কাগজের ক্যালেন্ডারে তারিখ দেখা যাচ্ছিল।

আরিসের মতে, ছবি তোলার জন্য সাজানো এই ধরনের আয়োজন শাসকদের পুরনো কৌশল। জাতীয় জীবনের প্রতীক হয়ে ওঠা তাঁর মায়ের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করা হচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি করতে আগেও এই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। আততায়ীর হাতে নিহত স্বাধীনতাসংগ্রামের নায়ক জেনারেল অং সানের মেয়ে সু চি। গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে আশির দশকের শেষভাগ থেকে জীবনের দীর্ঘ সময় তাঁকে বারবার গৃহবন্দি থাকতে হয়েছে।

আরিস বলেন, “বাকি পৃথিবী থেকে মা এখনও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। আমার মনে হয়, যেখানে তাঁকে রাখা হয়েছে, তার বাইরে কী ঘটছে তিনি জানেন না। কারণ তাঁকে কোনও খবরের কাগজ, রেডিয়ো বা টেলিভিশন দেওয়া হয় না। সাজানো, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে পাঁচ বছর ধরে তাঁকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। তাঁর মুক্তি পাওয়া উচিত।”

কয়েক দশক ধরে সেনাশাসনে থাকা এবং পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত মায়ানমার সামান্য সময়ের জন্য গণতন্ত্রের স্বাদ পেয়েছিল। ২০১৫ সালের নির্বাচনে সু চি-কে অংশ নিতে দেওয়া হয় এবং তাঁর দল বিপুল জয় পায়। অসামরিক নেতৃত্ব ও সেনাবাহিনীর মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থায় তিনি ‘স্টেট কাউন্সেলর’ বা রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন।

কিন্তু ২০১৬-১৭ সালে রোহিঙ্গা মুসলিমদের গণহত্যা ও ব্যাপক উচ্ছেদের পরে তাঁর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি দ্রুত কলঙ্কিত হয়। সু চি দ্য হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে যান। সেখানে তিনি স্বীকার করেন, সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট হয়তো “মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ” করেছে। তবে গণহত্যার অভিযোগের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষেই সওয়াল করেন।

আরিসের বক্তব্য, রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে তাঁর মা কখনও “নীরব” ছিলেন না। এ বিষয়ে তিনি যা বলেছেন, তা দিয়ে “বহু খণ্ড বই ভরে ফেলা যায়”। তাঁর নেতৃত্বে মায়ানমার দেশের ভিতরে তদন্ত শুরু করেছিল এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপুঞ্জ মহাসচিব কোফি আন্নানকে একটি কমিশনের প্রধান নিযুক্ত করেছিল।

আরিস আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা হিসাবে সু চি-কে “সব সময় টানটান দড়ির উপর দিয়ে হাঁটতে হয়েছে”। তিনি জানতেন, যে কোনও মুহূর্তে সেনাবাহিনী তাঁর দুর্বল ক্ষমতার ভিতটুকুও কেড়ে নিতে পারে।

তাঁর কথায়, “বহু কষ্টে অর্জিত যে সদ্যোজাত গণতন্ত্রকে মা নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তার অস্তিত্ব ঝুলছিল একটিমাত্র সুতোয়। সেনাবাহিনী যে কোনও সময় ক্ষমতা দখল করতে পারত। মায়ের পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলতে এবং তাঁর অবস্থান দুর্বল করতে তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করছিল। আর আমার মনে হয়, সে কাজে তারা যথেষ্ট সফলও হয়েছিল।”

২০২১ সালে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের জেরে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলির হিসাবে, সেই যুদ্ধে এক লক্ষেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

আরিস জানান, রোহিঙ্গা সঙ্কটের পর থেকে বিশ্বজুড়ে তাঁর মায়ের প্রতি জনসমর্থন “অবিশ্বাস্যভাবে কমে গিয়েছে”। আন্তর্জাতিক মনোযোগের অভাবে এখন গোটা দেশই ভুগছে। বহু সরকার সু চি-র মুক্তির দাবি জানিয়েছে ঠিকই, কিন্তু একসময় আন্তর্জাতিক মহলে তিনি যে বিপুল শ্রদ্ধা ও ভালবাসা পেতেন, এখন আর তা পান না।

দেশের পুরনো নাম ব্যবহার করে আরিস বলেন, “আমার মায়ের কথা ছেড়েই দিন। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যা করা হচ্ছিল, তার জন্য মানুষ বার্মায় এখন কী ঘটছে, তা উপেক্ষা করবে কেন? অথচ কখনও কখনও মনে হয়, সেটাই হচ্ছে। মানুষ বলছে, ‘রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হয়েছিল দেখেছেন তো! তা হলে বার্মায় এখন যা হচ্ছে, তা নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলে।’”