বাংলাস্ফিয়ার: দশ দিনের মধ্যে চার মহাদেশে চারটি নির্বাচন বিশ্বরাজনীতির গতিপথ গভীরভাবে বদলে দিতে পারে। ফলাফল বিশ্বকে তার বর্তমান কর্তৃত্ববাদী পথে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, অথবা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির সীমিত প্রত্যাবর্তনের সূচনা করতে পারে।

এমন এক সময়ে এই চারটি নির্বাচনেই গণতন্ত্রের মৌলিক রীতিনীতি বাজি রয়েছে, যখন গোটা বিশ্বে উদ্বেগজনক হারে স্বৈরতন্ত্রের প্রসার ঘটছে। সুইডেনভিত্তিক ভি-ডেম ইনস্টিটিউট একাধিক মানদণ্ডের সাহায্যে গণতন্ত্রের অবস্থা পরিমাপ করে। তাদের হিসাবে, বিশ্বের একজন গড় নাগরিক বর্তমানে যে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ভোগ করেন, তা নেমে এসেছে ১৯৭৮ সালের স্তরে—বার্লিন প্রাচীরের পতন এবং ইউরোপে কমিউনিস্ট শাসনের অবসানের অনেক আগের অবস্থায়।

পরপর এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন সেই প্রবণতাকে থামাতে পারে, আবার আরও জোরদারও করতে পারে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই গণতন্ত্রপন্থী দলগুলির সঙ্গে ক্ষমতাসীন অথবা ক্ষমতাপ্রত্যাশী স্বৈরতন্ত্রীদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। প্রতিটি নির্বাচনের ফল সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে আরও দূরে প্রভাব ফেলতে পারে।

রবিবার ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোট হবে। সেখানে এগিয়ে রয়েছেন উগ্র দক্ষিণপন্থী প্রার্থী। জিতলে ফ্লাভিও বলসোনারো ‘সংবিধান বদলানোর’, অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে দণ্ডিত তাঁর বাবাকে ক্ষমা করার এবং পরিবেশরক্ষার বিধিনিষেধ শিথিল করার হুমকি দিচ্ছেন। শেষের বিষয়টি আমাজনের অরণ্যের ভবিষ্যতের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ওই একই দিনে সার্বিয়ায় আলেকসান্দার ভুচিচের গত ১২ বছরের আধা-স্বৈরতান্ত্রিক শাসন তার সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। সেই চ্যালেঞ্জ এসেছে ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন এক অভিনব প্রতিবাদী আন্দোলন থেকে। অল্পপরিচিত শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞ প্রশাসকদের প্রার্থী করে তারা ভোটে নেমেছে একটি সরল স্লোগান সামনে রেখে: ‘সার্বিয়া, না মাফিয়া?’

মঙ্গলবার ভোটের লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মুখোমুখি হবেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। গত ৩০ বছরের মধ্যে ১৯ বছর ইজরায়েলের নেতৃত্বে থাকা এই শাসকের আমলে দীর্ঘ সময় ধরে গণতন্ত্রের অবক্ষয় ঘটেছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ক্রমশ বেড়েছে। গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাঁকে গ্রেফতার করতে চায়। নির্বাচনে হারলে দেশে চলতে থাকা দুর্নীতির মামলাতেও তাঁর আইনি বিপদ বাড়তে পারে। তাঁর উগ্র দক্ষিণপন্থী জোট বর্তমানে একটি বিরোধী জোটের পিছনে রয়েছে।

সম্ভাব্য ঐতিহাসিক এই দশ দিনের শেষ দিকে, ৩ নভেম্বর, আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের তিরস্কারের মুখে পড়তে পারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্রাটসুলভ প্রেসিডেন্টশাসন। কংগ্রেসের অন্তত একটি কক্ষ, সম্ভবত দু’টিই, ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে যেতে পারে। কিন্তু তার পরেও ট্রাম্পের বাড়াবাড়িতে রাশ টানা তাদের পক্ষে কঠিন হবে। তাঁর শাসনেই ভি-ডেম ইনস্টিটিউটের উদার গণতন্ত্র সূচকে আমেরিকার অবস্থানের তীব্র পতন ঘটেছে।

মঙ্গলবার আমেরিকায় ভোট গোনা হতে হতে বিশ্বের চেহারা অনেকটাই বদলে যেতে পারে। আসন্ন চারটি নির্বাচন শুধু কাছাকাছি সময়ে হচ্ছে না; তারা পরস্পরের সঙ্গেও জড়িত। ট্রাম্পের ‘মাগা’ আন্দোলন নেতানিয়াহু, ভুচিচ এবং বলসোনারোকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে। সার্বিয়ার ছাত্র ও গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকারীদের ফোনে ইজরায়েলে তৈরি পেগাসাস গুপ্তচর সফটওয়্যার পাওয়া গিয়েছে। বলসোনারো প্রবলভাবে ইজরায়েলপন্থী। তিনি আমেরিকার পথ অনুসরণ করে ব্রাজিলের দূতাবাস জেরুসালেমে সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। নেতানিয়াহুর যুদ্ধগুলিতে ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদের বড় অংশই আমেরিকার দেওয়া। সার্বিয়া ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনতে ২০০ কোটি ডলার ব্যয়ের অঙ্গীকার করেছে। সেপ্টেম্বরে দুই দেশ নজরদারি ও আক্রমণের কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম তৈরির একটি যৌথ কারখানা চালু করেছে।

এক দেশে কর্তৃত্ববাদী দক্ষিণপন্থীদের জয় অন্য দেশের সমমনস্ক শক্তিগুলিকে আরও শক্তিশালী করবে। বিপরীতে, প্রতিটি নির্বাচনে গণতন্ত্রপন্থীদের জয় বিশ্বজুড়ে তাঁদের মিত্রদের আশা ও উৎসাহ জোগাবে।

চারটি নির্বাচন ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হলেও প্রতিটি দেশে কর্তৃত্ববাদ ও গণতন্ত্রের লড়াইয়ের চেহারা একেবারেই আলাদা। জয়ের সম্ভাবনা আলাদা, কী কী বিপন্ন হতে পারে তা-ও আলাদা। কিন্তু চারটি ক্ষেত্রেই লড়াই অত্যন্ত কাছাকাছি।

ব্রাজিল: গণতন্ত্র সূচকে অবস্থান ২৮

২০২৩ সালের প্রথম দিনে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ব্রাজিলে গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন ঘটেছে। তার আগের অক্টোবরে হওয়া নির্বাচনের ফল উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তাঁর পূর্বসূরি, উগ্র দক্ষিণপন্থী জনমোহিনী নেতা। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ভি-ডেমের মাপকাঠিতে ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক মান এখন ব্রিটেনের চেয়ে উন্নত এবং আমেরিকার চেয়ে অনেক উন্নত।

চার বছর আগের সেই নির্বাচনে পরাজিত জাইর বলসোনারো একজন প্রাক্তন সেনাসদস্য। ব্রাজিলের ২১ বছরের সামরিক একনায়কতন্ত্রের আমলে তিনি সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন এবং এখনও সেই শাসনের প্রশংসা করেন। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টার দায়ে তাঁর ২৭ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। এখন তাঁর ছেলে ফ্লাভিও বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চাইছেন। রবিবারের দ্বিতীয় দফার ভোটে তিনি লুলার চেয়ে সামান্য হলেও তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে লড়তে নামছেন।

বলসোনারো-পুত্র শুধু বাবাকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতিই দেননি; তাঁর বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়ায় যুক্ত বিচারব্যবস্থার সদস্যদের শাস্তি দেওয়ার অঙ্গীকারও করেছেন। জিতলে কংগ্রেসে তিনি সহযোগী হিসেবে পাবেন দক্ষিণপন্থী সংখ্যাগরিষ্ঠতা। তিনি সংবিধান বদলানোর এবং দেশকে ‘পুনরায় গণতান্ত্রিক’ করার শপথ নিয়েছেন। এই শব্দবন্ধ ১৯৮৫ সালে সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের কথা মনে করিয়ে দেয়। অথচ সামরিক জান্তার বিশিষ্ট সদস্যদের এক ঘোষিত অনুরাগীর মুখে সেই কথাই ব্রাজিলের বামপন্থীদের কাছে অরওয়েলীয় ভাষাবিকৃতির মতো শোনায়—যা আতঙ্ক জাগায়।

দীর্ঘদিনের উচ্চ অপরাধপ্রবণতার মোকাবিলায় কঠোর আইনশৃঙ্খলা নীতিকে সামনে রেখে বলসোনারো প্রচার করেছেন। তিনি ফৌজদারি দায় বহনের বয়স ১৮ বছরের নীচে নামানোর পক্ষে, যার ফলে আরও বেশি কিশোর-কিশোরীকে কারাগারে পাঠানো যাবে। বিচারব্যবস্থার সংস্কারের দাবিও তুলছেন তিনি। সমালোচকদের আশঙ্কা, এই সংস্কারের আড়ালে আদালতের স্বাধীনতার উপর আঘাত হানতে চান বলসোনারো।

সার্বিয়া: গণতন্ত্র সূচকে অবস্থান ১১২

প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর ১২ বছরের শাসনকালে আলেকসান্দার ভুচিচ ধীরে ধীরে সার্বিয়ার গণতন্ত্রের স্তম্ভগুলিকে ক্ষয় করেছেন। তিনি ও তাঁর সহযোগীরা দেশের প্রায় সমস্ত সম্প্রচারমাধ্যম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। ফলে বর্তমান নির্বাচনী প্রচারপর্বে দেশের টেলিভিশনের পর্দাজুড়ে কার্যত তিনিই বিরাজ করছেন। শেষ দু’টি স্বাধীন সংবাদ চ্যানেলের ভবিষ্যৎও এখন অনিশ্চিত। নির্বাচনী প্রচারের মধ্যেই সেগুলি কিনে নিয়েছেন এক পর্তুগিজ বিনিয়োগকারী, যাঁর সঙ্গে হাঙ্গেরির ক্ষমতাচ্যুত ভিক্টর অরবানের শাসকগোষ্ঠীর যোগাযোগ রয়েছে।

ক্ষমতাসীন সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি বা এসএনএস মন্ত্রক ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছে যে, সেন্টার ফর রিসার্চ, ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটির কর্মসূচি অধিকর্তা রাশা নেদেলকভের কথায়, ‘রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিভাজনরেখা প্রায় মুছে গিয়েছে।’

এত দিন ভুচিচের ক্ষমতায় রাশ টানতে চাওয়া বিরোধী দলগুলি ছিল দুর্বল ও বিভক্ত। কিন্তু দু’বছর আগে নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনে মানুষের ভিড়ের উপর কংক্রিটের ছাউনি ভেঙে পড়ে ১৬ জনের মৃত্যু সার্বিয়ার রাজনীতিকে বদলে দেয়। সেই বিপর্যয় দেশজুড়ে জমে থাকা গভীর মোহভঙ্গকে একটি নির্দিষ্ট অভিব্যক্তি দেয়। জন্ম নেয় ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলন। রাষ্ট্রের ভয় দেখানো ও দমনপীড়ন সহ্য করেও আন্দোলনটি টিকে থেকেছে। এখন তারা এসএনএসের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ প্রার্থিতালিকা নিয়ে ভোটে নেমেছে।

যে ছাত্ররা এই প্রার্থীদের মনোনীত করেছেন, তাঁদের মতো প্রার্থীরাও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্নে নিজেদের মধ্যে একমত নন। কিন্তু প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের প্রতি তাঁদের নিষ্ঠা আপসহীন। বৃহৎ সাধারণ সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কাউকেই আন্দোলনের একক, পরিচিত নেতা হয়ে উঠতে দেওয়া হয়নি।

রবিবার জিততে হলে ছাত্রদের সার্বিয়ার চিরাচরিত রাজনৈতিক ছক ভাঙতে হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের অনুগত সমর্থকভিত্তির উপর ভুচিচের নিয়ন্ত্রণ ভাঙা জরুরি। তাঁরা জয়ের কাছাকাছি পৌঁছলে অশান্তি ও হিংসার ঝুঁকি রয়েছে। বিরোধীদের সভা ভাঙতে টাকা দিয়ে গুণ্ডাবাহিনী নামানোর নজির আছে এসএনএসের। ভুচিচ ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা করলে সেই বাহিনী ভোটকেন্দ্রেও হাজির হতে পারে। অন্যদিকে ছাত্ররাও জানিয়েছেন, রবিবার যে জয় তাঁরা আশা করছেন, তা রক্ষা করতে রাস্তায় নামবেন।

ইজরায়েল: গণতন্ত্র সূচকে অবস্থান ৪৮

ইজরায়েলের গণতন্ত্র বরাবরই আংশিক। দখলীকৃত ভূখণ্ডের প্যালেস্টাইনিদের ভোটাধিকার নেই, নেই আরও বহু অধিকার। অথচ পাশেই বসবাসকারী ইজরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা পূর্ণ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর উগ্র দক্ষিণপন্থী জোট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থনভিত্তি। মঙ্গলবারের সংসদীয় নির্বাচনে অবশ্য সেই সরকারকেই নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই লড়তে হবে।

ইজরায়েলি নাগরিকত্ব থাকা প্যালেস্টাইনিরা দেশের জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। কিন্তু নেসেটে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব বরাবরই সেই অনুপাতে কম। ইজরায়েলি ইহুদিদের তুলনায় তাঁদের ভোটদানের হার কম। অনেকে মনে করেন, যে ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে তাঁদের বাদ দেয়, সেখানে অংশ নেওয়া অর্থহীন। নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধী জোট আরব দলগুলির সঙ্গে জোট গড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে। নেসেটের আসন বণ্টনের পরে এই সিদ্ধান্তই স্পষ্ট জয় এবং অনিশ্চিত অচলাবস্থার মধ্যে ফারাক গড়ে দিতে পারে—তবু তাদের অবস্থান বদলাচ্ছে না।

গত তিন দশকের অধিকাংশ সময়, মাঝে বিরতি দিয়ে, ইজরায়েলের নেতৃত্বে থেকেছেন নেতানিয়াহু। কিন্তু বর্তমান মেয়াদের প্রায় চার বছরে চরমপন্থী বসতিস্থাপনকারীদের সমর্থনপুষ্ট দলগুলির সঙ্গে জোট বেঁধে তিনি ইজরায়েলের গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়েছেন। ‘সংস্কার’-এর নামে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা করেছেন, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের উপর চাপ বাড়িয়েছেন এবং পুলিশ, সেনাবাহিনী ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতকে দলীয় রাজনীতির প্রভাবে এনেছেন।

প্রাক্তন জেনারেল গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট প্যালেস্টাইন প্রশ্নে নেতানিয়াহুর বহু অবস্থানেরই শরিক। তারা মোটের উপর গাজার যুদ্ধকে সমর্থন করে এবং দুই রাষ্ট্রের সমাধান বিবেচনা করতেও রাজি নয়। কিন্তু নেতানিয়াহু সরকারের দুর্নীতি ও স্বৈরতান্ত্রিক বাড়াবাড়ি দূর করতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মঙ্গলবারের নির্বাচনে সরকারি জোটের চেয়ে বিরোধী জোট বেশি আসন পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে তারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার থেকে পিছিয়ে থাকতে পারে। সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হলে ইজরায়েলের দীর্ঘদিনের উপেক্ষিত প্যালেস্টাইনি সংখ্যালঘুদের সঙ্গে তাদের বোঝাপড়া করতে হতে পারে।

আমেরিকা: গণতন্ত্র সূচকে অবস্থান ৫১

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের দু’বছরেরও কম সময়ে আমেরিকা যে দ্রুততায় নিজেকে গণতন্ত্র থেকে সরিয়ে এনেছে, আধুনিক যুগে অন্য কোনও পশ্চিমা দেশে তেমন ঘটেনি। অনুগত রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণাধীন কংগ্রেস এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সায় দিয়ে চলা সুপ্রিম কোর্টকে পাশে পেয়ে তিনি সম্রাটসুলভ প্রেসিডেন্টশাসন গড়ে তুলেছেন। প্রায়ই নির্বাহী আদেশের ফরমান জারি করে দেশ চালাচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করছেন। এর মধ্যে রয়েছে বিচার বিভাগ এবং এফবিআইয়ের মতো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রতিষ্ঠানও। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, স্বাধীনভাবে কাজ করা সরকারি কৌঁসুলি এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সেগুলিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

দেশের ভিতরে ও বাইরে প্রশাসনের নীতিকে ব্যবহার করা হয়েছে ট্রাম্পের পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়ানোর সুযোগ তৈরির জন্য।

ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই-র ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটানো হয়েছে। নিয়োগ করা হয়েছে স্বল্প প্রশিক্ষিত কিন্তু ভারী অস্ত্রসজ্জিত কর্মীদের। তাঁদের সারা দেশে মোতায়েন করা হয়েছে। বৈধ নথি ছাড়া অভিবাসী বলে সন্দেহ হলেই যে কারও নাগরিক অধিকার পদদলিত করা হচ্ছে; প্রধানত লাতিন আমেরিকান বংশোদ্ভূত মানুষেরাই এর শিকার।

প্রেসিডেন্টের কাজের প্রতি জনসমর্থন রেকর্ড নিম্নস্তরে নেমে যাওয়ায় প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সেনেটেও তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারেন, যদিও সেই সম্ভাবনা তুলনায় কম।

তবে দু’টি কক্ষই তাঁদের নিয়ন্ত্রণে এলেও ট্রাম্পের প্রেসিডেন্টশাসনের কর্তৃত্ববাদী বাড়াবাড়িতে কতটা রাশ টানা সম্ভব হবে, তার সীমা রয়েছে। ট্রাম্প যথেচ্ছভাবে ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করবেন বলেই ধরে নেওয়া যায়। সেই ভেটো অতিক্রম করার জন্য প্রয়োজনীয় ভোট ডেমোক্র্যাটদের থাকবে না। সেনেটে রিপাবলিকানরা দীর্ঘ বিতর্কের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত আটকে দেওয়ার যে কৌশল, অর্থাৎ ফিলিবাস্টার, নিতে পারেন, তা ভাঙার মতো ভোটও থাকবে না।

তত্ত্বগতভাবে সরকারি অর্থব্যয়ের নিয়ন্ত্রণ কংগ্রেসের হাতে। সরকারি বিভাগ ও সংস্থাগুলিকে অর্থ দেওয়ার শর্ত হিসেবে সংস্কারের দাবি চাপানোর চেষ্টা তারা করতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে দুর্নীতি ও অন্যান্য অনিয়মের একাধিক তদন্তও শুরু করবেন। সরকারি কর্তাদের সাক্ষ্য দিতে বা নথি জমা দিতে বাধ্য করার জন্য সমন জারি করতে পারবেন।

কিন্তু দু’টি ক্ষেত্রেই ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসকে স্রেফ অগ্রাহ্য করতে এবং সহযোগিতা করতে অস্বীকার করতে পারে। ফলে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক পরিণতি সম্ভবত গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পুনরুদ্ধার হবে না। সেই পুনরুদ্ধারের আগে দেশকে দীর্ঘস্থায়ী সাংবিধানিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।