বাংলাস্ফিয়ার: ইজরায়েল যখন ভোটে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন গাজার প্যালেস্টিনীয়রা শঙ্কিত মনে অপেক্ষা করছেন এমন এক ফলাফলের জন্য, যা তাঁদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে। তাঁরা জানেন, তাঁদের ভাগ্য সেই দেশের হাতে, যে দেশ এই ভূখণ্ডের বিস্তীর্ণ অংশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে এবং প্রায় ৭৫ হাজার মানুষের প্রাণ নিয়েছে।
গাজায় প্রায় ১০ লক্ষ বাস্তুচ্যুত প্যালেস্টিনীয় ভয়াবহ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, জলসংকট এবং ইজরায়েলি হামলার নিরন্তর আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অথচ নির্বাচনী প্রচারে গাজা প্রায় অনুপস্থিত।
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কট্টর দক্ষিণপন্থী জোট এবং গাদি আইজেনকোটের বিরোধী ইয়াশার পার্টি—উভয়েই জোর দিয়েছে ৭ অক্টোবরের হামলা এবং ইজরায়েলি সমাজে তার গভীর মানসিক অভিঘাতের পর হামাসকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে। সীমান্তের ঠিক ওপারে যে মানবিক বিপর্যয় ঘটে চলেছে, তা সামান্যই মনোযোগ পেয়েছে, অথবা আদৌ পায়নি।
রাফার বাসিন্দা, ৪৭ বছরের সামি আবু রুমি এখন ঘরছাড়া হয়ে খান ইউনিসের আল-মাওয়াসিতে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা আশা করি, এমন একটি সরকার ক্ষমতায় আসবে, যারা হত্যা, উচ্ছেদ এবং আমাদের নিশ্চিহ্ন করার দিকে কিছুটা কম ঝুঁকবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা দেখি, ইজরায়েলের সরকারগুলির চিন্তাভাবনা মোটের ওপর একই রকম।”
নেতানিয়াহু বা আইজেনকোট—কেউই গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরেননি। দু’জনেই হামাসের শাসন শেষ করার অঙ্গীকার করেছেন। দু’জনেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত শান্তি-পরিকল্পনাকে সমর্থন করেন।
প্রাক্তন সেনাপ্রধান আইজেনকোটের দল জনমত সমীক্ষায় নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। তিন বছরের যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইজরায়েলের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। কিন্তু তাঁকে শান্তিপন্থী বলা চলে না।
২০০৬ সালে হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইজরায়েলের যুদ্ধের সময় আইজেনকোট ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কমান্ডার। গাজায় লড়াই করতে গিয়ে তাঁর ছেলে এবং দুই ভাইপো নিহত হয়েছেন। ২০০৬ সালের যুদ্ধের পরে তিনি ‘দাহিয়া নীতি’র প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। এই নীতিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি সক্রিয় রয়েছে এমন অসামরিক এলাকায় বিপুল সামরিক শক্তি প্রয়োগের পক্ষে সওয়াল করা হয়। সমালোচকদের বক্তব্য, পরবর্তী সময়ে গাজায়ও এই কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। তার ফলে যে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে, তাঁদের মতে তা যুদ্ধাপরাধের শামিল।
আবু রুমি বলেন, “আইজেনকোট হামাসকে পরাজিত করার কথা বলেন, আর নেতানিয়াহু সামরিক অভিযান এবং প্যালেস্টিনীয়দের হত্যা নিয়ে বড়াই করেন। গাজার দুর্দশাই এখন নির্বাচনী প্রচারের উপকরণ। এদিকে এখানকার পরিবারগুলি সন্তানদের খাওয়াতে, তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হিমশিম খাচ্ছে। বাড়িঘর ও পরিকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরে শুধু বেঁচে থাকাটাই এখন প্রতিদিনের লড়াই।”
এই সপ্তাহের গোড়ায় ইজরায়েলের আরব নেতৃত্বাধীন জোট ‘জয়েন্ট লিস্ট’ ৪৮ সেকেন্ডের একটি নির্বাচনী প্রচারচিত্র প্রকাশ করেছে। তাতে ড্রোনে তোলা গাজার ধ্বংসস্তূপের ছবি দেখানো হয়েছে। নেপথ্য কণ্ঠ বলছে, “আমরা এমন আচরণ করি, যেন এখানে যা কিছু ঘটেছে, সবই একেবারে স্বাভাবিক। যেন এখানে কয়েক দশ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়নি… যেন গোটা গোটা শহর ধ্বংস করে বিরানভূমিতে পরিণত করা হয়নি।”
জোটটির অঙ্গীকার, তারা “নীরব থাকবে না”। প্রচারচিত্রে আরও বলা হয়েছে, “অন্য দলগুলি আরও ধ্বংস চায়। আমরা জীবনের পক্ষে।”
আইজেনকোটের নেতৃত্বে কোনও জোট সরকার গঠিত হলে তাতে আরব দলগুলির যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ, প্রায় নেই বললেই চলে। তবে তারা সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন করতে পারে। কিন্তু গাজার প্যালেস্টিনীয়দের মধ্যে হতাশা গভীর। যিনিই জিতুন, বিশেষ কিছু বদলাবে বলে তাঁদের মনে হয় না।
বেইত লাহিয়ার বাসিন্দা, ৪৫ বছরের হানিন হামদুনাও ঘরছাড়া হয়ে আল-মাওয়াসিতে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি না, কেউ সত্যিই গাজাকে নিয়ে ভাবে, কিংবা এখানকার মানুষের স্বার্থের কথা মনে রাখে। নেতানিয়াহু হোন, আইজেনকোট হোন বা অন্য কেউ—গাজায় হামলা চালানো যেন ইজরায়েলের নির্বাচনী প্রচারেরই অঙ্গ হয়ে উঠেছে।”
তাঁর কথায়, “বছরের পর বছর আমরা বলে এসেছি, পরের সরকার হয়তো আগের সরকারের চেয়ে ভাল হবে। কিন্তু পরে যখন দেখি, তারা আরও খারাপ, তখন ধাক্কা খাই। হয়তো গাজায় ১০০টির বদলে ২০০টি ট্রাক ঢুকতে দেওয়া হবে। কিন্তু তাতে আমাদের জীবনে কোনও প্রকৃত পরিবর্তন আসবে না।”
গাজায় অধিকাংশ মানুষ খাবার ও জল জোগাড়ের লড়াইয়ে এতটাই ব্যস্ত যে নির্বাচনী প্রচারের খবর রাখার অবকাশ তাঁদের নেই। বাজারে টাটকা শাকসবজি, ফলমূল এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় নতুন করে অনাহারের আশঙ্কা বাড়ছে।
বাসিন্দারা বলছেন, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে দাম বাড়ছে। ময়দার দাম এখন আগের তিন গুণেরও বেশি। অন্যদিকে মানবিক সাহায্য কমে যাওয়ায় পরিবারগুলি আর একটি খাদ্যসংকটের মুখে ক্রমশ আরও অসহায় হয়ে পড়ছে।
তবু গাজার কিছু মানুষ ইজরায়েলের নির্বাচনের দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন। পরিবর্তনের আশার চেয়ে তাঁদের বেশি তাড়িত করছে এই ভয়—ফলাফল তাঁদের ভবিষ্যতের জন্য কী বয়ে আনবে।
তাঁদের আশঙ্কা, প্যালেস্টিনীয়দের দুর্দশা ইজরায়েলের নির্বাচনী প্রচারের এক নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। উন্নত ভবিষ্যতের কোনও সম্ভাবনা তুলে ধরার বদলে প্রার্থীরা প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, গাজার বিরুদ্ধে কে কত কঠোর অবস্থান নিতে পারেন।
৪৩ বছরের করিম মারিশ বলেন, “আমার এক বন্ধুর আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ছেলের বিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে ঠিক করেছে, ইজরায়েলের নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে পিছিয়ে দেবে। তার ভয়, কট্টর দক্ষিণপন্থী সরকার আবার ক্ষমতায় এলে যুদ্ধ নতুন করে শুরু হতে পারে। তখন তাকে ফের পালাতে হবে। নিজের তাঁবুটা তো হারাতেই পারে, সেই সঙ্গে অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে বিয়ের জন্য যে জিনিসপত্র কিনেছে, সেগুলিও হারাতে পারে।”
গাজায় আশার সন্ধান পাওয়া কঠিন। তিন বছরের যুদ্ধ গোটা গোটা জনপদকে ভাঙা কংক্রিট আর বোমার গর্তে ভরা বিরানভূমিতে পরিণত করেছে। খাদ্য ও মানবিক সাহায্যের ওপর ইজরায়েলি বিধিনিষেধ যখন ক্ষুধাকেই যুদ্ধের অস্ত্রে পরিণত করেছে, তখন ভবিষ্যৎ কল্পনা করা আরও কঠিন। আর ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে যখন ২০ হাজারেরও বেশি প্যালেস্টিনীয় শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, তখন এই অন্ধকারের শেষে আলোর রেখা দেখতে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
গাজা সিটির বাসিন্দা, ২০ বছরের নুর আলমোঘান্নি বলেন, “আমার মনে হয়, আমাদের দুর্দশার সুরাহা নিয়ে যা কিছু বলা হয়, তা আসলে আমাদের যন্ত্রণা একটু প্রশমিত করার চেষ্টা ছাড়া কিছু নয়। অথবা নিছক কিছু কথা ও প্রতিশ্রুতি, যেগুলিতে আমরা আর বিশ্বাস করি না।”
তাঁর কথায়, “নেতানিয়াহু জিতুন বা হারুন, এখানকার বাস্তবতা বদলাবে না। আমার চোখে, ওঁদের লক্ষ্য গাজাকে ধ্বংস করা, এখানে জীবনধারণের ভিতটাই গুঁড়িয়ে দেওয়া।”