ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবরের সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৭৭.৭ শতাংশ—১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ। ভোটদানের এই বিপুল হার বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ দেশের আরব নাগরিকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ।

ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের মধ্যে ঠিক কত শতাংশ ভোট দিয়েছেন, কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি এখনও তার সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। তবে চ্যানেল ১২-এর বুথফেরত সমীক্ষার অনুমান, আরব ভোটারদের প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। এই হিসাব সঠিক হলে, অন্তত এক দশকের মধ্যে এটাই হবে ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের সর্বোচ্চ ভোটদানের হার।

ইসরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ আরব। কিন্তু তাঁদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলি কখনও ১২০ সদস্যের সংসদ নেসেটে ১৫টির বেশি আসন পায়নি। নির্বাচনে তাঁদের অংশগ্রহণও তুলনামূলকভাবে কম থেকেছে। গত দুই দশকের অধিকাংশ নেসেট নির্বাচনে ভোটদানের যোগ্য আরব প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৪০ শতাংশই ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।

জেরুসালেমের ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের আরিক রুডনিৎস্কি বলেন, “আমার মনে হয়, আগের নির্বাচনগুলিতে ভোটদানের হার কম হওয়ার প্রধান কারণ ছিল আরব দলগুলির প্রতিই হতাশা। আমরা জানি, আরব নাগরিকদের প্রায় ১০ শতাংশ আদর্শগত কারণে নেসেট নির্বাচন বয়কট করেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নিজেদের দলগুলির আচরণের কারণে এই রাজনৈতিক খেলায় অংশ নিতে অনিচ্ছুক থাকেন।”

এ বারের নির্বাচনে অবশ্য সেই প্রবণতা বদলে গিয়েছে। রুডনিৎস্কি বলেন, “আমার বিশ্বাস, বিশেষ করে এই নির্বাচনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিল ভয়। নেতানিয়াহু সরকার বা কোনও দক্ষিণপন্থী সরকার ফের ক্ষমতায় আসার ভয়। কারণ, গত চার বছরে আরব নাগরিকেরা যথেষ্ট সহ্য করেছেন।”

আরবদের ভোটদানের এই উল্লম্ফনকেই আবার দক্ষিণপন্থী ভোটারদের বুথমুখী করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর জোট। এক্সে নেতানিয়াহু তাঁর সমর্থকদের লিকুদকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পরিস্থিতিকে “জীবন-মরণের প্রশ্ন” বলে বর্ণনা করেন।

বিভিন্ন পোস্টে তিনি পরিস্থিতিকে “ঘরের ভিতরে যুদ্ধ” বলে তুলে ধরে ভোটারদের সক্রিয় করার চেষ্টা করেন। আরব দলগুলি এই প্রচারের সমালোচনা করে বলেছে, এটি বর্ণবিদ্বেষী এবং ঘৃণায় উসকানি দেওয়ার চেষ্টা।

সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, ইহুদি ইসরায়েলিরা কোন দলকে সমর্থন করবেন, তা নির্ধারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে বিদেশনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দলের অবস্থান। তার পরেই রয়েছে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার চড়া খরচ।

অন্য দিকে, সমীক্ষায় অংশ নেওয়া আরবদের অর্ধেকেরও বেশি জানিয়েছেন, আরব সমাজে অপরাধের সমস্যা নিয়ে কোনও দলের অবস্থান তাঁদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান নির্ধারক।

আরব নাগরিকদের বিপুল ভোটদান আরব দলগুলির পক্ষে সুবিধাজনক হবে বলেই প্রত্যাশা। এর ফলে নেসেটের বিভিন্ন কমিটিতে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব বাড়তে পারে এবং তাঁদের স্বার্থে আরও কার্যকর নীতি বা সহায়তা আদায়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বুথফেরত সমীক্ষা ও সর্বশেষ গণনার হিসাবেও তার ইঙ্গিত মিলেছে: আরব দলগুলি অন্তত ১৭টি আসনে এগিয়ে রয়েছে।

তবে সব আরব নাগরিক যে আরব দলগুলিকেই সমর্থন করেন, তা নয়। রুডনিৎস্কি বলেন, “সাধারণ ভাবে আরব নাগরিকদের প্রায় ১৫ শতাংশ অনারব, অর্থাৎ ইহুদি দলগুলিকে সমর্থন করেন। তাঁদের অধিকাংশই মধ্যপন্থী দলগুলির সমর্থক। ইয়ার গোলানের নেতৃত্বাধীন ‘দ্য ডেমোক্র্যাটস’ দলটিরও আরব সমাজে তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে।”

সর্বশেষ হিসাব বলছে, নেতানিয়াহুর শিবির কিংবা বিরোধী জোট—কোনও পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার অবস্থায় নেই। ফলে এ বার কে সরকার গড়বে, তার চাবিকাঠি থাকতে পারে আরব দলগুলির হাতেই।