গাজা ও পশ্চিম তীরে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ তদন্ত কমিশনের; অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে প্রতিবেদনকে ‘ইতিহাসের নামে কল্পকাহিনি’ বলল ইজরায়েল
গাজায় যুদ্ধবিরতি হয়েছে, কিন্তু থামেনি রক্তপাত। যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, এমনকি গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধও যুদ্ধবিরতির পর চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠল ইজরায়েলের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গাজা ও পশ্চিম তীরে প্যালেস্টাইনিদের বিরুদ্ধে ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও বাহিনীর অভিযান কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এর পিছনে রয়েছে ভূখণ্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো, ইজরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং প্যালেস্টাইনিদের উৎখাত করার বৃহত্তর পরিকল্পনা।
রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদে পেশ করা ওই প্রতিবেদনে অধিকৃত প্যালেস্টাইনি ভূখণ্ড সংক্রান্ত স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, পশ্চিম তীরে ইজরায়েলি সামরিক অভিযান এবং বসতি স্থাপনকারীদের হিংসা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। কমিশনের মতে, এই আক্রমণের উদ্দেশ্য প্যালেস্টাইনি ভূখণ্ডকে ইজরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করা, বসতিগুলির অবস্থান আরও মজবুত করা এবং সেখানকার প্যালেস্টাইনি বাসিন্দাদের নিজেদের ঘরছাড়া করা।
কমিশনের দেওয়া পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে। তাদের দাবি, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে অধিকৃত প্যালেস্টাইনি ভূখণ্ডে ৭৫ হাজারেরও বেশি প্যালেস্টাইনি নিহত হয়েছেন। মৃতদের মধ্যে অন্তত ২১ হাজার ৫০০ শিশু এবং ১১ হাজার নারী রয়েছেন। ওই দিন হামাসের হামলায় ইজরায়েলে প্রায় ১,২০০ জন নিহত হয়েছিলেন। কমিশনের বক্তব্য, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরেও গাজায় মৃত্যুমিছিল থামেনি।
গত ২৬ অক্টোবর রাষ্ট্রপুঞ্জে দেওয়া বিবৃতিতে কমিশনের প্রধান বিচারপতি শ্রীনিবাসন মুরলীধর বলেন, যুদ্ধবিরতির পরেও মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর কথায়, এই পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়া বিশেষভাবে নিন্দনীয়।
হলুদ রেখার ওপারেও মৃত্যু
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় ইজরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণের পরিধি ক্রমশ বাড়ছে বলে অভিযোগ কমিশনের। বিচারপতি মুরলীধর জানিয়েছেন, ইজরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার কাছে গেলেই প্যালেস্টাইনি অসামরিক মানুষজনের প্রাণহানি ঘটছে। এমনকি শিশুদেরও রেহাই মিলছে না।
গাজায় ইজরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা এবং প্যালেস্টাইনিদের নিয়ন্ত্রণাধীন অংশের মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছে ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখা। কমিশনের বক্তব্য, এই রেখার কাছে যাওয়া কিংবা তা অতিক্রম করার অভিযোগে প্যালেস্টাইনি নাগরিকদের হত্যা ও আহত করার ঘটনা ঘটছে। ফলে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি।
কমিশনের এই মূল্যায়নের সঙ্গে ‘বোর্ড অব পিস’-এর আগের বক্তব্যের স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। মে মাসে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে পেশ করা এক প্রতিবেদনে ওই সংস্থা দাবি করেছিল, যুদ্ধবিরতি মোটের উপর বজায় রয়েছে এবং তা অসামরিক মানুষের জীবনে উল্লেখযোগ্য স্বস্তি এনে দিয়েছে। কিন্তু তদন্ত কমিশনের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ সেই দাবির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
পশ্চিম তীরেও অপরাধের অভিযোগ
কমিশনের প্রতিবেদনে শুধু গাজা নয়, পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিও উঠে এসেছে। বিচারপতি মুরলীধরের বক্তব্য, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে সেখানে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। কমিশনের সিদ্ধান্ত, পশ্চিম তীরে ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ডের মধ্যে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের একাধিক উপাদান রয়েছে।
অভিযোগের তালিকায় রয়েছে ব্যাপক প্রাণসংহার, নির্যাতন, ধর্ষণ ও অন্যান্য ধরনের যৌন হিংসা। পাশাপাশি, প্যালেস্টাইনিদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য এমন বৈষম্যমূলক বলপ্রয়োগের বিধি চালু রেখে তাঁদের উপর নিপীড়ন চালানোর অভিযোগও তুলেছে কমিশন।
প্রতিবেদনে ইজরায়েলি নীতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়েছে। কমিশনের মতে, ১৯৪৭–৪৮ সালের যুদ্ধের সময় থেকে অনুসৃত বিভিন্ন নীতির ধারাবাহিকতায় ভূখণ্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, প্যালেস্টাইনিদের বাস্তুচ্যুত করা এবং প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ওই অঞ্চলে প্যালেস্টাইনি জনসংখ্যা কমিয়ে আনার প্রবণতা দেখা গিয়েছে।
পশ্চিম তীরে সামরিক অভিযানের বিস্তারও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিমানহানা থেকে শুরু করে শরণার্থী শিবির ধ্বংস—বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশনের দাবি, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানের ফলে পশ্চিম তীরে ১৯৬৭ সালের পর সবচেয়ে বড় আকারে প্যালেস্টাইনিদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৩৪ হাজার ১৭৬ জন মানুষ ঘরছাড়া অবস্থায় ছিলেন।
প্যালেস্টাইনি বাহিনীকেও কাঠগড়ায়
ইজরায়েলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলার পাশাপাশি প্যালেস্টাইনি নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তদন্ত কমিশন। ভিডিয়ো-যোগে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিচারপতি মুরলীধর বলেন, পশ্চিম তীরে প্যালেস্টাইনিদের বিরুদ্ধে অপ্রয়োজনীয় বা মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কমিশনের বক্তব্য, হত্যাকাণ্ডের কার্যকর ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ প্রতিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে প্যালেস্টাইনি কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। অর্থাৎ, অধিকৃত ভূখণ্ডে সাধারণ মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে শুধু ইজরায়েলি বাহিনী নয়, প্যালেস্টাইনি কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় এসেছে।
আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের দাবি
প্রতিবেদনে ইজরায়েলকে দখলদারির অবসান ঘটানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতের ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পরামর্শমূলক মতামত মেনে চলার উপর জোর দিয়েছেন বিচারপতি মুরলীধর।
রাষ্ট্রপুঞ্জের সদস্যরাষ্ট্রগুলির প্রতি তাঁর আবেদন, ইজরায়েলের দখলদারি ও বসতি সম্প্রসারণ টিকিয়ে রাখতে পারে, এমন সহায়তা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি, গণহত্যা প্রতিরোধ ও অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রগুলিকে তাদের হাতে থাকা সমস্ত উপায় কাজে লাগাতে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে সমর্থন করতে বলেছেন তিনি।
তবে এই প্রতিবেদন পেশ করার প্রক্রিয়াতেও বাধার অভিযোগ উঠেছে। বিচারপতি মুরলীধর জানিয়েছেন, ভিসার প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের চেষ্টা করা সত্ত্বেও তিনি আমেরিকার ভিসা পাননি। ফলে রাষ্ট্রপুঞ্জের সামনে সশরীরে হাজির না হয়ে ভিডিয়ো-বিবৃতির মাধ্যমে তাঁকে বক্তব্য রাখতে হয়েছে।
‘ইতিহাসের নামে কল্পকাহিনি’, পাল্টা ইজরায়েল
তদন্ত কমিশনের অভিযোগ অবশ্য সরাসরি খারিজ করেছে ইজরায়েল। রাষ্ট্রপুঞ্জে দেশটির স্থায়ী প্রতিনিধি ড্যানি ড্যানন প্রতিবেদনটিকে ‘ইতিহাসের নামে কল্পকাহিনি’ বলে আক্রমণ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, কমিশন ইজরায়েলের বৈধতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলতে চাইছে। তাঁর আরও দাবি, সন্ত্রাসবাদীদের প্রচার থেকে বক্তব্য নিয়ে সেগুলিকে রাষ্ট্রপুঞ্জের সরকারি নথিতে পরিণত করা হয়েছে।
অন্য দিকে, কমিশনের কাজের পক্ষে সওয়াল করে বিচারপতি মুরলীধর জানিয়েছেন, অত্যন্ত যত্ন ও পরিশ্রমের সঙ্গে সংগৃহীত প্রমাণের ভিত্তিতেই তাঁদের সিদ্ধান্ত। তাঁর বক্তব্য, কমিশনের প্রমাণ সংগ্রহের পদ্ধতি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। প্রমাণ সম্পর্কে সন্তুষ্ট হওয়ার পরেই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে কমিশন।
তিনি আরও জানান, অভিযোগগুলির তদন্ত করতে আগ্রহী যে কোনও বিচারিক সংস্থার সঙ্গে নিজেদের সংগৃহীত প্রমাণ ভাগ করে নিতে প্রস্তুত কমিশন। তবে তাঁর অভিযোগ, ইজরায়েল তদন্তে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করেছে এবং কমিশনকে অধিকৃত প্যালেস্টাইনি ভূখণ্ডে প্রবেশের অনুমতিও দেয়নি।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতির পরেও গাজা ও পশ্চিম তীরে হিংসা, প্রাণহানি এবং বাস্তুচ্যুতির অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে চাপ বাড়াচ্ছে। এক দিকে তদন্ত কমিশনের গুরুতর অভিযোগ, অন্য দিকে ইজরায়েলের কড়া প্রত্যাখ্যান—এই সংঘাতের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যুদ্ধবিরতি কি সত্যিই প্যালেস্টাইনি অসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে? নাকি যুদ্ধের রূপ বদলালেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ থেকে যাচ্ছে সেই একই জায়গায়?
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।