নির্বাচনী পূর্বাভাস অনুযায়ী, মঙ্গলবার সেনেটের নিয়ন্ত্রণ দখল করেছে ডেমোক্র্যাটরা। এর ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মোকাবিলায় তাদের হাতে এল এক শক্তিশালী মঞ্চ। রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকে থাকা রাজ্যগুলির ভোটাররাও এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর মিত্রদের কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আইওয়ায় জয়ের মধ্য দিয়ে সেনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে ডেমোক্র্যাটরা। পাশাপাশি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিধি পরিষদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আসনগুলিও তাদের দখলে আসছিল। ফলের সেই প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছিল, কংগ্রেসের ওই কক্ষে তারা বড় ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে চলেছে।
এই ফল ওয়াশিংটনে ক্ষমতা ভাগাভাগির এক নতুন পর্বের সূচনা করতে চলেছে। কংগ্রেসও নতুন করে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে। গত দু’বছরে রিপাবলিকানরা সাধারণভাবে ট্রাম্পের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিলেন; আইনসভার ভূমিকা নেমে এসেছিল নিছক দর্শকের পর্যায়ে।
এর মধ্য দিয়েই শেষ হল তীব্র ওঠাপড়ায় ভরা এক নির্বাচনী মরসুম। অথচ গোড়ায় সেনেট দখল করা তো দূরের কথা, রিপাবলিকানদের ৫৩–৪৭ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বড়সড় ধাক্কা দেওয়ার সম্ভাবনাও ডেমোক্র্যাটদের প্রায় ছিল না।
কিন্তু গত এক বছরে ট্রাম্পের প্রতি ভোটারদের মনোভাব বিরূপ হয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং তার পরিণতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে রিপাবলিকানঘেঁষা রাজ্যগুলিতেও অনায়াসে জিতেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। এমনকি দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল ঘাঁটিতেও তাঁদের সমর্থন বেড়েছে। জ্বালানির দাম যখন হু হু করে বাড়ছে এবং শুল্কের বোঝা আগে থেকেই চড়া জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলছে, তখন ডেমোক্র্যাটরা ভোটারদের সামনে এই যুক্তি তুলে ধরেছেন: সাধারণ আমেরিকানরা হিমশিম খাচ্ছেন, অথচ ওয়াশিংটনের রিপাবলিকানরা নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন।
মঙ্গলবার গভীর রাতে ওয়াশিংটনে এক সাংবাদিক বৈঠকে নিউ ইয়র্কের সেনেটর এবং ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেন, “আমরা আমেরিকার মানুষের কথা শুনেছি, তাঁরা কী চান তা শুনেছি। আমরা শুনেছি, ওরা শোনেনি। আর আমেরিকার মানুষ লাল ইটের প্রাচীরটাকে ভেঙে এক স্তূপ ইটে পরিণত করেছেন।”
ফলত, যে রাজনৈতিক মানচিত্র ডেমোক্র্যাটদের প্রতিকূলে ছিল, সেটিই বদলে দিতে পেরেছে দল। রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতে ঢুকে তারা ক্যানসাস, টেক্সাস, ওহায়ো এবং নর্থ ও সাউথ ক্যারোলাইনার আসন ছিনিয়ে নিয়েছে।
একই সঙ্গে নিউ হ্যাম্পশায়ার ও জর্জিয়ার দু’টি আসনও ধরে রেখেছে ডেমোক্র্যাটরা। অন্যত্র সম্ভাব্য ক্ষতি পুষিয়ে নিতে একসময় এই আসন দু’টি জেতার আশা করেছিল রিপাবলিকানরা। কিন্তু ট্রাম্পের নীতি নিয়ে অসন্তোষ যত বেড়েছে, সেই সম্ভাবনা ততই তাদের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে।
৩ জানুয়ারি থেকে সেনেটের নিয়ন্ত্রণ হাতে আসায় ট্রাম্পের মনোনীত বিচারপতি ও প্রশাসনিক পদপ্রার্থীদের অনুমোদন আটকে দেওয়ার ক্ষমতা পাবে ডেমোক্র্যাটরা। সেনেটের কমিটিগুলির নেতৃত্বও তাদের হাতে যাবে। নির্বাচনে জিতলে যে সব তদন্ত চালানোর প্রতিশ্রুতি ডেমোক্র্যাটরা দিয়েছিল, সেগুলি এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রশাসনের আধিকারিক এবং অন্যদের বাধ্যতামূলক হাজিরার সমন পাঠানোর ক্ষমতা থাকবে ওই কমিটিগুলির।
সেনেটের অধিবেশনে কোন বিষয় উঠবে এবং আইন প্রণয়নের কর্মসূচি কী হবে, তার নিয়ন্ত্রণও পাবে ডেমোক্র্যাটরা। এর ফলে সরকারি ব্যয়, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং ওয়াশিংটনজুড়ে প্রেসিডেন্টের হাতে নেওয়া নানা বিশেষ প্রকল্প নিয়ে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হবে। এই পরাজয়ের ধাক্কায় রিপাবলিকানরা আগামী কয়েক সপ্তাহে নিজেদের কিছু অগ্রাধিকার একসঙ্গে জুড়ে একটি সর্বসমন্বিত বিল পাস করানোর চেষ্টা করতে পারেন। সোমবার থেকে শুরু হতে চলা বিদায়ী কংগ্রেসের অধিবেশনে সেই উদ্যোগ দেখা যেতে পারে।
সেনেটের রিপাবলিকানদের কাছে এই ফল এক বিরাট বিপর্যয়। মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি তাঁরা শুরু করেছিলেন যথেষ্ট সুবিধাজনক অবস্থান থেকে। কিন্তু প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ড এবং তাঁর বিরোধিতা করতে তাঁদের অনীহা সেই সুবিধা ক্রমশ ক্ষয় করে দিয়েছে।
এক বছর আগেও ডেমোক্র্যাটরা সেনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা জয়ের জায়গায় পৌঁছে যাবে, এমন সম্ভাবনা প্রায় অকল্পনীয় ছিল। নির্বাচনী সমীকরণ স্পষ্টতই ছিল সেনেটের রিপাবলিকানদের অনুকূলে: তাঁদের ধরে রাখার আসনগুলি ছিল মূলত রিপাবলিকানঘেঁষা রাজ্যে। অন্যদিকে, নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ৪৭টি আসন ধরে রাখাই ছিল ডেমোক্র্যাটদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু অর্থনীতির অবস্থা এবং ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে ব্যয়বহুল সংঘাতে জড়ানোর প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত ডেমোক্র্যাটদের সামনে সুযোগ খুলে দেয়।
আইন প্রণয়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য যখন বিশেষ মিলছিল না, তখন রিপাবলিকানরা নির্বাচনী লাভের আশা করেছিলেন তাঁদের “বিগ বিউটিফুল বিল” থেকে। বিশেষ এক সংসদীয় প্রক্রিয়ায় দলীয় বিভাজন মেনেই বিলটি পাস হয়। সমান ভোটের অচলাবস্থা কাটাতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে নির্ণায়ক ভোট দিতে হয়েছিল। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ট্রাম্প সেটিতে সই করে আইনে পরিণত করেন।
এই আইনে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে রিপাবলিকানদের চালু করা আয়কর ছাড়ের মেয়াদ বাড়ানো হয়। পাশাপাশি কিছু নতুন ছাড়ও দেওয়া হয়—যেমন টিপস বা বকশিশ থেকে আয়ের উপর করের বোঝা কমানো এবং করযোগ্য আয় হিসাবের সময় রাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনকে দেওয়া কর বাবদ ছাড়ের সীমা বাড়ানো।
কিন্তু বিরোধীরা ওই আইনে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে কাটছাঁটের তীব্র সমালোচনা করেন। অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের আওতায় কিছু ভর্তুকির মেয়াদ বাড়াতে রিপাবলিকানদের অস্বীকৃতিকেও আক্রমণ করেন তাঁরা। ডেমোক্র্যাটরা ক্রমশ এই বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন যে, রিপাবলিকানদের নীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাপনকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে, অথচ ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা বিপুল আর্থিক সুবিধা ভোগ করছেন।
প্রেসিডেন্টের আরোপ করা শুল্ক সেই যুক্তিকে আরও জোরালো করে। কানাডার সঙ্গে তাঁর বাণিজ্যযুদ্ধের ধাক্কা বিশেষভাবে লাগে মিশিগান ও মেইনে। অন্যত্র সম্ভাব্য ডেমোক্র্যাট জয়ের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এই দুই রাজ্যে জয়ের আশা করছিল রিপাবলিকানরা। শুল্কের জেরে কৃষিকাজে ব্যবহৃত সারের দামও বেড়ে যায়, কৃষিপণ্য বিক্রির বাজার সংকুচিত হয়। এর ধাক্কা লাগে কৃষিপ্রধান রাজ্যগুলির রক্ষণশীল ভোটারদের উপরেও।
এর পরে ইরান যুদ্ধ জ্বালানির সরবরাহে প্রবল বাধা সৃষ্টি করে। সাধারণ পেট্রল ও ডিজেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে হতাশ হন সেই ভোটাররাও, যাঁরা বিদেশের যুদ্ধে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলেন।
নিজের দলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্টের আক্রমণও ডেমোক্র্যাটদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়। নর্থ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সেনেটর থম টিলিস ২০২৫ সালের জুনে “বিগ বিউটিফুল বিল” এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার পরে ট্রাম্প তাঁকে তীব্র আক্রমণ করেন। জবাবে টিলিস ঘোষণা করেন, তিনি আর পুনর্নির্বাচনে লড়বেন না। এর ফলে ওই রাজ্যের সেনেট আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন সুযোগ তৈরি হয়। মঙ্গলবার আসনটি জিতেছেন প্রাক্তন গভর্নর রয় কুপার।
টেক্সাসে দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প বর্তমান রিপাবলিকান সেনেটর জন কর্নিনের বদলে কেন প্যাক্সটনকে সমর্থন করেন। সেই সমর্থন প্যাক্সটনের জয়ে সহায়ক হয়েছিল বলেই মনে করা হচ্ছে। প্যাক্সটন প্রার্থী হওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা জেমস ট্যালারিকোর পিছনে ঐক্যবদ্ধ হন। যে টেক্সাসে ১৯৮৮ সালের পর থেকে কোনও ডেমোক্র্যাট সেনেটে নির্বাচিত হননি, সেই রাজ্যই হয়ে ওঠে দেশের অন্যতম তীব্র নির্বাচনী লড়াইয়ের ময়দান। সেখানে কোটি কোটি ডলার ঢালতে বাধ্য হয় রিপাবলিকানরা।
নির্বাচনের আগে বহু বিশ্লেষক বলেছিলেন, প্যাক্সটনের বদলে কর্নিন প্রার্থী হলে মূল নির্বাচনে ট্যালারিকোকে হারিয়ে আসনটি ধরে রাখা তাঁর পক্ষে তুলনামূলকভাবে সহজ হত। কিন্তু কর্নিনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের পুরনো ক্ষোভ ছিল। সাধারণভাবে প্রেসিডেন্টকে সমর্থন করার রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও ২০২৩ সালে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য লড়াই নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন কর্নিন। সেই ক্ষোভ থেকেই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ঝুঁকি সত্ত্বেও প্যাক্সটনকে সমর্থন করেন ট্রাম্প।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।