৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে একাধিক রাজ্যের বিরুদ্ধে মামলা, নির্বাচনী নথি তলব ও ভোটকর্মীদের ফৌজদারি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি; বাতিল জনসভাও ফিরিয়ে আনলেন প্রেসিডেন্ট
ওয়াশিংটন: ভোটের লড়াই এখনও শেষ হয়নি, অথচ আইনি সংঘাত শুরু হয়ে গিয়েছে পুরোদমে। আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের বিরুদ্ধে তৎপরতা বাড়িয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। অনাগরিকদের বেআইনি ভোটদানের অভিযোগে মামলা, নির্বাচনী নথি চেয়ে সমন, এমনকি ভোটকর্মীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি—সব মিলিয়ে ভোটের মুখে প্রশাসন ও বিরোধীদের সংঘাত তীব্রতর হচ্ছে। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। তার আগে নির্বাচনী স্বচ্ছতা রক্ষার দাবি এবং ভোটাধিকার খর্ব হওয়ার আশঙ্কা মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়া। বিচার দফতরের দাবি, রাজ্যের ভোটার তালিকায় ২০ হাজারেরও বেশি এমন ব্যক্তির নাম রয়েছে, যাঁরা সম্ভবত আমেরিকার নাগরিক নন। ভোটার তালিকার সঙ্গে কেন্দ্রীয় অভিবাসন সংক্রান্ত তথ্য মিলিয়ে এই সন্দেহের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর দায়ের করা মামলায় সংশ্লিষ্ট ভোটারদের ব্যালট আলাদা করে রাখা এবং তাঁদের ভোটদানের যোগ্যতা যাচাইয়ের আবেদন জানিয়েছে প্রশাসন।
তবে তালিকায় নাম থাকলেই কেউ অনাগরিক, কিংবা বেআইনিভাবে ভোট দিয়েছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। প্রশাসনের অভিযোগেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্ভাব্য অনাগরিক হিসাবেই চিহ্নিত করা হয়েছে। আমেরিকায় অনাগরিকদের ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়া বেআইনি। কিন্তু সন্দেহ, তদন্ত এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়—এই পার্থক্যই এখন বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
এর মধ্যেই লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির নির্বাচনী দফতরে পৌঁছেছে ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরির সমন। অনাগরিকদের ভোট শনাক্ত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাঁদের ভোট গণনা আটকাতে কী পদক্ষেপ করা হচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের আগের চিঠির জবাবে কী যোগাযোগ হয়েছে—সেই সংক্রান্ত নথি চাওয়া হয়েছে। এর আগে বিচার দফতর নির্বাচনী আধিকারিকদের সতর্ক করে জানিয়েছিল, নাগরিকত্ব যাচাইয়ে ব্যর্থ হলে তাঁদের ফৌজদারি ব্যবস্থার মুখে পড়তে হতে পারে। প্রশাসনের যুক্তি, নির্বাচনের বৈধতা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ।
কিন্তু কেন্দ্রের দেওয়া তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে ক্যালিফোর্নিয়ার আইনজীবীরা। তাঁদের আশঙ্কা, ত্রুটিপূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে বৈধ ভোটারদেরও সন্দেহের তালিকায় ফেলা হতে পারে। তাতে ভোটাধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার পাশাপাশি নির্বাচনী প্রক্রিয়াও ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেসের নির্বাচনী কর্তা ডিন লোগানের বক্তব্য, তাঁর দফতরের কর্মীরা রাজ্য ও কেন্দ্রীয় আইন মেনেই দায়িত্ব পালন করছেন।
ডেমোক্র্যাট এবং ভোটাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ, নির্বাচনের একেবারে শেষ মুহূর্তে এ ভাবে মামলা ও সমনের চাপ বাড়িয়ে ভোট পরিচালনার কাজে বিঘ্ন ঘটানো হতে পারে। তাঁদের আরও আশঙ্কা, ফলাফল প্রতিকূল হলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার জমিও তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ, ভোটের আগে লড়াই শুধু প্রার্থী ও দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাও এখন বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।
আদালতেও অবশ্য সব ক্ষেত্রে সুবিধা করতে পারেনি ট্রাম্প প্রশাসন। গত ২৮ অক্টোবর এক ফেডারেল বিচারক সংশ্লিষ্ট ডাকব্যালটের গণনা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার আবেদন খারিজ করে দেন। ৩০ অক্টোবর নবম সার্কিট আপিল আদালতও ব্যালট আলাদা করে রাখার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। তিন বিচারকের বেঞ্চে দুই বিচারক আবেদন খারিজের পক্ষে মত দেন, অন্য জন ছিলেন ভিন্নমতাবলম্বী। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকদের আশঙ্কা, এ ধরনের নির্দেশ বৈধ ভোটারদের অধিকার এবং সামগ্রিক গণনাপ্রক্রিয়াকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে।
একই দিনে অন্য এক বিচারক নির্বাচনী কর্মীদের ভয় দেখানো থেকে বিচার দফতরকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। ফলে নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখার প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং ভোট পরিচালনাকারীদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির সম্ভাবনা—দুইয়ের মধ্যে সীমারেখা নিয়েই বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
আইনি লড়াইয়ের পরিধিও ক্যালিফোর্নিয়ায় আটকে নেই। আলাস্কাতেও সেনেট নির্বাচন ঘিরে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। সেখানে রিপাবলিকান প্রার্থী পরাজিত হলে নির্বাচনের ফলের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন আটকে দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ফলকে কেন্দ্র করে এমন আইনি তৎপরতা নির্বাচনী সংঘাতের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা রাজ্যগুলির উপর কেন্দ্রীয় প্রশাসন ক্রমশ চাপ বাড়াচ্ছে।
মাঠেও ফিরছেন ট্রাম্প
আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি প্রচারের ময়দানেও সক্রিয় হচ্ছেন ট্রাম্প। আগে বাতিল করা আইওয়া ও কানসাসের জনসভা ফের সূচিতে ফিরিয়ে এনেছেন তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী রবিবার, ১ নভেম্বর, পরপর দুই রাজ্যে জনসভা করবেন প্রেসিডেন্ট। হোয়াইট হাউসের বক্তব্য, প্রায় ২০টি টেলিফোনভিত্তিক ভার্চুয়াল সভার সঙ্গে সময় মেলাতেই প্রচারসূচি নতুন করে সাজানো হয়েছে। সরাসরি জনসভা এবং দূরবর্তী প্রচার—দুইয়ের সমন্বয়ে কম সময়ে আরও বেশি ভোটারের কাছে পৌঁছনোর আশা রিপাবলিকান নেতৃত্বের।
কানসাসে রিপাবলিকান সেনেটর রজার মার্শালের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটনের লড়াই প্রত্যাশার তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে। অন্য দিকে, আইওয়াতেও নিজেদের আসন ধরে রাখা রিপাবলিকানদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। ফলে শেষ মুহূর্তের প্রচারে কোনও খামতি রাখতে চাইছে না দল।
সব মিলিয়ে, আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দ্বিমুখী লড়াইয়ে নেমেছে ট্রাম্প প্রশাসন—এক দিকে আদালতে আইনি তৎপরতা, অন্য দিকে নির্বাচনী প্রচারে গতি ফেরানোর চেষ্টা। প্রশাসনের দাবি, নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বৈধতা রক্ষাই তাদের লক্ষ্য। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, ভোটের ঠিক আগে একের পর এক মামলা, সমন ও সতর্কবার্তা কি সত্যিই নির্বাচনী ব্যবস্থার উপর আস্থা বাড়াবে, নাকি ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও গভীর করবে? শেষ পর্যন্ত এই সংঘাতের প্রভাব শুধু নির্বাচনের ফলেই নয়, সেই ফলের গ্রহণযোগ্যতার উপরও পড়তে পারে।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।