গার্ডিয়ানের জন্য হ্যারিসের সমীক্ষা: ৭৬ শতাংশ ভোটারের মতে, সাধারণ আমেরিকানদের আর্থিক অবস্থার উন্নতির চেয়ে নিজেদের সম্পদ বাড়াতেই বেশি আগ্রহী নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা।

আসন্ন আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে সরকারি স্তরের দুর্নীতি। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ আমেরিকান মনে করেন, সরকারি পদাধিকারীরা ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের জন্য তাঁদের পদ ব্যবহার করেন। গার্ডিয়ানের জন্য একান্তভাবে করা হ্যারিসের একটি জনমত সমীক্ষায় এই ছবি উঠে এসেছে।

সমীক্ষায় প্রায় প্রতি দশ জন আমেরিকানের মধ্যে ন’জন বলেছেন, সরকারি স্তরের দুর্নীতি একটি সমস্যা। এখানে দুর্নীতি বলতে বোঝানো হয়েছে—নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জনস্বার্থের আগে নিজেদের অথবা তাঁদের অর্থদাতাদের আর্থিক স্বার্থকে স্থান দেওয়া।

প্রায় তিন-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ ৭৬ শতাংশ ভোটার বলেছেন, সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতির চেয়ে নিজেদের সম্পদ বাড়ানো নিয়েই বেশি মাথা ঘামান নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। কর্পোরেট সংস্থাগুলির ক্ষমতার তুলনায় সরকারি দুর্নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেক বেশি ভোটার। সরকারি দুর্নীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ৬৫ শতাংশ; কর্পোরেট ক্ষমতা নিয়ে ২৯ শতাংশ। দশ শতাংশের কিছু কম বলেছেন, এই দু’টির কোনওটিই তাঁদের উদ্বিগ্ন করে না।

জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ই অবশ্য নির্বাচনের প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে। ৩৬ শতাংশ ভোটার বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁরা কীভাবে ভোট দেবেন, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এটিই এককভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু অভিবাসন, আবাসনের খরচ, গর্ভপাত, অপরাধ ও নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিভিন্ন ইস্যুর মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয়ের পরেই স্থান পেয়েছে দুর্নীতি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার প্রেসিডেন্ট পদের মেয়াদের প্রায় দু’বছর অতিক্রান্ত হওয়ার মুখে এই সমীক্ষার ফল প্রকাশিত হল। এই সময়ে প্রেসিডেন্ট আক্ষরিক এবং রূপক—দুই অর্থেই ওয়াশিংটনের চেহারা বদলে দিয়েছেন।

৪০ কোটি ডলার ব্যয়ে একটি বলরুম তৈরির জন্য হোয়াইট হাউসের ঐতিহাসিক ইস্ট উইং ভেঙে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। তাঁর বক্তব্য, এই অর্থের মধ্যে সাড়ে ৩৩ কোটি ডলার আসছে বেসরকারি দাতাদের কাছ থেকে। তাঁদের মধ্যে রয়েছে অ্যাপল ও এনভিডিয়ার মতো সংস্থাও। অন্যদিকে, ট্রাম্পের ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারে প্রায় ৩০ কোটি ডলার অনুদান দেওয়ার পর ইলন মাস্ককে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের ক্ষমতা দেওয়া হয়। তার পর থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মীসংখ্যা কমেছে ৪ লক্ষ ২০ হাজারেরও বেশি।

এদিকে ট্রাম্পের ছেলেরা পরিবারের লাভজনক ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা চালাচ্ছেন। হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকে এই ব্যবসা ট্রাম্পকে ১০০ কোটি ডলার এনে দিয়েছে। আর ট্রাম্প নিজে কাতারের রাজপরিবারের কাছ থেকে উপহার হিসেবে গ্রহণ করেছেন ৪০ কোটি ডলার মূল্যের একটি ব্যক্তিগত জেট বিমান।

এই সব ঘটনা ভোটারদের নজর এড়ায়নি। হ্যারিসের সমীক্ষায় ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় রিপাবলিকানদের দুর্নীতির সমস্যা বেশি বলে জানানো ভোটারের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। ৪০ শতাংশ ভোটার বলেছেন, রিপাবলিকান পার্টির দুর্নীতির সমস্যা বেশি। রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যেও ২৯ শতাংশের একই মত। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৩২ শতাংশ ভোটার বলেছেন, দুই দলেই সমস্যাটি সমান। আর ২১ শতাংশের মতে, ডেমোক্র্যাটদের দুর্নীতির সমস্যা বেশি।

দেশজুড়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আসনগুলিতে নির্দলীয় ভোটারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে। তাঁদের মধ্যেও রিপাবলিকানদের দুর্নীতির সমস্যা বেশি বলে মনে করেন তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি মানুষ। ৩৪ শতাংশ নির্দলীয় ভোটার রিপাবলিকানদের দিকে আঙুল তুলেছেন; ডেমোক্র্যাটদের দিকে ১৩ শতাংশ। তবে নির্দলীয়দের সবচেয়ে বড় অংশ, ৪২ শতাংশের মতে, দুই দলের মধ্যেই সমস্যাটি সমান।

সাধারণ আমেরিকানরা দৈনন্দিন জীবনে অর্থনীতির যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন, তার সঙ্গে ওয়াল স্ট্রিটের তুলে ধরা ছবির বিস্তর ফারাক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পিছনে অবিরাম বিপুল ব্যয়ের জেরে শেয়ারবাজার চড়ছে। অক্টোবরের গোড়ায় এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং প্রযুক্তি সংস্থার শেয়ারপ্রধান ন্যাসড্যাক—দুই সূচকই রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল।

এই উত্থানে লাভবান হয়েছেন আমেরিকানদের তুলনামূলকভাবে ছোট একটি অংশ। সম্পদের বিচারে শীর্ষ এক শতাংশ আমেরিকানের হাতে রয়েছে শেয়ারবাজারের অর্ধেক মালিকানা। অন্যদিকে, নিচের দিকের ৫০ শতাংশের হাতে রয়েছে বাজারের মাত্র এক শতাংশের কিছু বেশি।

আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ হাতে থাকায় আমেরিকার ধনীতম ব্যক্তিরা নির্বাচনে আরও বেশি অনুদান ঢালছেন। ২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টের ‘সিটিজেনস ইউনাইটেড’ মামলার রায় নির্বাচনী অনুদানের সীমা তুলে দেওয়ার পর থেকে প্রতিটি নির্বাচনী বছরেই অর্থের প্রবাহ নতুন রেকর্ড গড়েছে। এনবিসি নিউজের হিসাবে, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইতিমধ্যেই বিজ্ঞাপনের পিছনে খরচ হয়েছে ১,১২০ কোটি ডলার—মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোনও পর্বে যা সর্বোচ্চ।

এই অনুদানের বড় একটি অংশ আসছে অতিধনীদের কাছ থেকে। ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিসের হিসাবে, এ বছরের বিভিন্ন নির্বাচনী লড়াইয়ে মাত্র ৪০ জন দাতা ইতিমধ্যেই ২৫০ কোটি ডলার দিয়েছেন। গত সপ্তাহে ধনকুবের মাইকেল ব্লুমবার্গ ঘোষণা করেন, ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জন্য শেষ মুহূর্তের অর্থসাহায্য হিসেবে তিনি ৮ কোটি ডলার দিচ্ছেন। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তাঁর পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি রিপাবলিকানদের মোট ৪০ কোটি ডলার দিচ্ছে।

সাধারণ আমেরিকানদের চোখে, অর্থের এই প্লাবন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাজের উদ্দেশ্যই বদলে দিয়েছে। অনেকের বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত তাঁরা নিজেদের নির্বাচনী এলাকার মানুষের চেয়ে নিজেদের এবং অর্থদাতাদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবেন। হ্যারিসের সমীক্ষায় ৭৮ শতাংশ ভোটার এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়েছেন: “আমার মতো মানুষকে সাহায্য করার চেয়ে নিজেদের সম্পদ বাড়ানো নিয়েই বেশি মাথা ঘামান নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা।”

হ্যারিস পোলের প্রধান নির্বাহী জন গেরজেমা বলেছেন, “জীবনযাত্রার ব্যয়ের পরেই মধ্যবর্তী নির্বাচনের দ্বিতীয় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে সরকারি দুর্নীতি। আমেরিকানদের ক্ষোভের কারণ, তাঁদের ক্রমবর্ধমান আর্থিক দুর্দশার জন্য যাঁদের তাঁরা দায়ী মনে করছেন, সেই নেতাদেরই আবার ওই দুর্দশা থেকে লাভবান হতে দেখছেন।”

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত যার হাতেই যাক, রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে ভোটাররা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করা এই ক্রয়ক্ষমতার সংকটের সমাধান চাইছেন।

জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত একাধিক নীতির মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৩২ শতাংশ ভোটার বলেছেন, সরকারি সিদ্ধান্তের উপর বিভিন্ন সংস্থা ও লবিবাজদের প্রভাবের সীমা বেঁধে দেওয়া উচিত। জনপ্রিয়তায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে শুল্ক প্রত্যাহার—এর পক্ষে ২৯ শতাংশ। তার পরেই রয়েছে পণ্যের দাম সংস্থাগুলি কতটা বাড়াতে পারবে, তার সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব; সমর্থন করেছেন ২৪ শতাংশ।

মঙ্গলবার ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটাররা একটি প্রস্তাবের উপর ভোট দেবেন। সেটি অনুমোদিত হলে ওই রাজ্যের শতকোটি ডলার বা তার বেশি সম্পদের মালিকদের উপর এককালীন পাঁচ শতাংশ সম্পদকর বসতে পারে। এই প্রস্তাব ঠেকাতে প্রযুক্তি ক্ষেত্রের ধনকুবেররা সম্মিলিতভাবে প্রতিদিন আনুমানিক ১০ লক্ষ ডলার খরচ করছেন। সব মিলিয়ে সেই ব্যয় ইতিমধ্যেই ৩৪ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।

নতুন সমীক্ষায় অর্ধেক ভোটার, অর্থাৎ ৫০ শতাংশ বলেছেন, ধনকুবেররা তাঁদের ন্যায্য অংশের কর দেন না। নির্দলীয় ভোটারদের মধ্যে এই মতের সমর্থক ৫৬ শতাংশ। রিপাবলিকানদের মধ্যে অবশ্য মাত্র ২৮ শতাংশ একই কথা বলেছেন।

আমেরিকার কর্পোরেট মহলের কেউ কেউ এই অসন্তোষ বুঝতে শুরু করেছেন। গত সপ্তাহে ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের প্রধান নির্বাহী স্কট কার্বি একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি দেশজুড়ে সম্পদকর চালুর পক্ষে। তাঁর এই মন্তব্যের জেরে কিছু রিপাবলিকানের সমালোচনার মুখে পড়তে হয় তাঁকে।

কার্বি বলেন, “আমাদের জাতীয় স্তরে সম্পদকর থাকা উচিত। আলাদা আলাদা রাজ্যে এই কর বসিয়ে লাভ হবে না, কারণ মানুষ অন্য রাজ্যে চলে যাবেন। আর আমি মনে করি, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট স্তরে করের হার প্রায় ১০০ শতাংশ হওয়া উচিত। আমি সেই কর দিতে রাজি।”

এই সমীক্ষা হ্যারিস পোল অনলাইনে চালিয়েছে ২০২৬ সালের ২২ থেকে ২৪ অক্টোবর, আমেরিকার ভিতরে। এতে অংশ নিয়েছেন ২,০৬৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকান; নমুনাটি জাতীয় জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্বমূলক। তাঁদের মধ্যে ১,৪৮১ জনের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ছবির বিবরণ: আটলান্টায় একটি ভোটকেন্দ্রের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন দু’জন। পাশে ‘আগাম ভোটদান’-এর সাইনবোর্ড। সেখানে আগাম ভোটগ্রহণ চলছে। সমীক্ষায় জীবনযাত্রার ব্যয়ের পরেই ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে দুর্নীতি। ছবি: ক্রিস্তোবাল হেরেরা/ইপিএ।