রাজপ্রাসাদে নারী পাচারের অভিযোগ ঘিরে তদন্তে স্কটল্যান্ডের পুলিশ। ১৯৯৯ সালে অ্যান্ড্রুর অতিথি হয়ে বালমোরালে গিয়েছিলেন জেফ্রি এপস্টিন ও ঘিলেন ম্যাক্সওয়েল, দাবি বিভিন্ন প্রতিবেদনে।
স্কটল্যান্ডের রাজকীয় বালমোরাল প্রাসাদে নারী পাচারের অভিযোগ ঘিরে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছেন ব্রিটেনের রাজপরিবারের বিতর্কিত প্রাক্তন সদস্য অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর এবং তাঁর অতিথি হিসেবে ওই প্রাসাদে যাওয়া কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিন ও তাঁর সহযোগী ঘিলেন ম্যাক্সওয়েল।
পুলিশ স্কটল্যান্ড জানিয়েছে, এ বিষয়ে কিছু তথ্য তাদের হাতে এসেছে। অ্যান্ড্রু, এপস্টিন ও ম্যাক্সওয়েলের বালমোরালে একসঙ্গে সময় কাটানো এবং সেখানে নারী পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে অনুসন্ধান এখনও ‘একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে’ রয়েছে।
১৯৯৯ সালে বালমোরালে গিয়েছিলেন এপস্টিন ও ম্যাক্সওয়েল। এপস্টিন ২০০৮ সালে নাবালিকাদের কাছ থেকে যৌনসেবা চাওয়ার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। পরে ২০১৯ সালে জেলবন্দি অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। অন্য দিকে, যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে এক নাবালিকাকে পাচারের অপরাধে ২০২১ সালে দোষী সাব্যস্ত হন ম্যাক্সওয়েল। বর্তমানে কারাবন্দি রয়েছেন তিনি।
মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত কয়েকটি ছবিতে অ্যান্ড্রু ও এপস্টিনকে বালমোরালের রাজকীয় এস্টেটে একসঙ্গে শিকার করতে দেখা যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। ‘ডেইলি এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই এস্টেটে নারী পাচার করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
পুলিশ স্কটল্যান্ডের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, “আমরা তথ্য পেয়েছি এবং সক্রিয় অনুসন্ধান চলছে। তবে তা এখনও একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সমস্ত অনুসন্ধানই প্রমাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং নির্যাতনের শিকার মানুষদের প্রয়োজনকে তার কেন্দ্রে রাখা হয়। চলমান অনুসন্ধানের বিস্তারিত তথ্য আমরা কখনও নিশ্চিত করি না। এ বিষয়ে আরও মন্তব্য করা অনুচিত হবে।”
এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশের পর ব্রিটেনের আরও কয়েকটি পুলিশ বাহিনী তদন্ত চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে ন্যাশনাল পুলিশ চিফস’ কাউন্সিল (এনপিসিসি)। এর মধ্যে রয়েছে টেমস ভ্যালি পুলিশ, মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং সারে পুলিশ।
এনপিসিসির এক মুখপাত্র বলেন, “আর কোনও সম্ভাব্য অপরাধ, সন্দেহভাজন, নির্যাতিত ব্যক্তি বা সাক্ষীকে চিহ্নিত করা একটি জটিল প্রক্রিয়া। এতে সময় লাগবে। তবে মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথিপত্র অত্যন্ত সতর্কভাবে খতিয়ে দেখতে ব্রিটেনের পুলিশ অঙ্গীকারবদ্ধ।”
তবে এনপিসিসি স্পষ্ট করেছে, এই মুহূর্তে জাতীয় স্তরে কোনও তদন্ত চলছে না।
চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি, নিজের ৬৬তম জন্মদিনে সরকারি পদে অসদাচরণের সন্দেহে গ্রেফতার হয়েছিলেন প্রাক্তন ডিউক অব ইয়র্ক অ্যান্ড্রু। অভিযোগ, ব্রিটেনের বাণিজ্যদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি এপস্টিনকে স্পর্শকাতর তথ্য সরবরাহ করেছিলেন। আইনি সতর্কবার্তা দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে তদন্ত এখনও চলছে। অ্যান্ড্রু অবশ্য কোনও অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেছেন।
এপস্টিন-সংক্রান্ত নথির মধ্যে থাকা কয়েকটি ইমেলও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে অ্যান্ড্রুর সঙ্গে ম্যাক্সওয়েলের যোগাযোগ নিয়ে। গত বছর প্রকাশিত নথির একটি ইমেলে ‘এ’ নামে স্বাক্ষরকারী এক ব্যক্তি ম্যাক্সওয়েলের কাছে ‘অনুপযুক্ত বন্ধু’ চেয়েছিলেন।
২০০১ সালের আগস্টে ‘দ্য ইনভিজিবল ম্যান’ ছদ্মনাম ব্যবহার করে ম্যাক্সওয়েলকে চারটি ইমেল পাঠানো হয়েছিল। তার একটিতে প্রেরক জানান, তাঁর ব্যক্তিগত পরিচারক সম্প্রতি মারা গিয়েছেন এবং তিনি ‘আরএন’ ছেড়েছেন। উল্লেখযোগ্য ভাবে, ওই ইমেল পাঠানোর আগের মাসেই রয়্যাল নেভি ছেড়েছিলেন অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর।
২০০১ সালের ১৬ আগস্ট পাঠানো আর একটি ইমেলে ওই ব্যক্তি জানান, তিনি তখন “রাজপরিবারের গ্রীষ্মকালীন শিবির বালমোরালে” রয়েছেন। এর পরেই ম্যাক্সওয়েলের কাছে তাঁর প্রশ্ন, “আমার জন্য কিছু অনুপযুক্ত বন্ধু খুঁজে পেয়েছ?”
২০০২ সালের মার্চে ‘দ্য ইনভিজিবল ম্যান’-কে পাঠানো একটি ইমেলে ম্যাক্সওয়েল জানান, নাম উল্লেখ না করা এক ব্যক্তিকে তিনি একটি বার্তা দিয়েছেন। সেই বার্তার শুরুতে লেখা ছিল, “এইমাত্র অ্যান্ড্রুকে তোমার টেলিফোন নম্বর দিলাম।”
ওই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে পাঠানো বার্তায় ম্যাক্সওয়েল আরও লিখেছিলেন, কিছু “দু’পেয়ে দর্শনীয় বস্তু” দেখতে পেলে “অ্যান্ড্রু” খুব খুশি হবেন।
২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্রিটেনের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন অ্যান্ড্রু। এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব নিয়ে বিতর্ক বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত ওই দায়িত্ব ছাড়েন তিনি।
ব্রিটেনের বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রসারে দেশে-বিদেশে সফরের জন্য কোনও বেতন পেতেন না অ্যান্ড্রু। তবে তাঁর যাতায়াত ও অন্যান্য খরচের পিছনে প্রতি বছর হাজার হাজার পাউন্ড ব্যয় হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব ছাড়ার বছরেই সামনে আসে অ্যান্ড্রুর একটি বিতর্কিত ছবি। সেখানে ভার্জিনিয়া জিউফ্রের কোমর জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় তাঁকে। জিউফ্রে অভিযোগ করেছিলেন, তাঁকে পাচার করে ম্যাক্সওয়েলের বাড়িতে অ্যান্ড্রুর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
অ্যান্ড্রু অবশ্য দাবি করেছেন, জিউফ্রের সঙ্গে তাঁর কখনও দেখাই হয়নি। তবে ২০২২ সালে আমেরিকায় দায়ের হওয়া একটি দেওয়ানি মামলার নিষ্পত্তি করতে জিউফ্রেকে কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড দিয়েছিলেন তিনি। ওই সমঝোতার মাধ্যমে মামলাটির নিষ্পত্তি হলেও অ্যান্ড্রু অভিযোগ অস্বীকার করে গিয়েছেন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে, মাত্র ৪১ বছর বয়সে আত্মহত্যা করে মারা যান জিউফ্রে। তাঁর অভিযোগ এবং এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি ঘিরে বিতর্কের রেশ এখনও কাটেনি। এ বার সেই তদন্তের পরিধিতে উঠে এল ব্রিটেনের রাজপরিবারের অন্যতম পরিচিত রাজকীয় আবাস বালমোরালও।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।