মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল মেনে নিতে তিনি “সম্পূর্ণ প্রস্তুত” এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করতেও রাজি—মঙ্গলবার রাতে জানালেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

টেলিফোনে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমরা ওদের সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় থাকব। সম্ভবত কোনও একটা সমঝোতায় পৌঁছতে পারব।”

রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ হিসেবে ট্রাম্প ব্যালটে নিজের নাম না-থাকার কথা বলেন। আর ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে অভিহিত করেন “অত্যন্ত বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত” বলে।

সাউথ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সেনেটর ডার্লিন গ্রাহাম এবং টেক্সাসের রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের মতো প্রার্থীদের সমর্থন করার জন্যও তাঁর কোনও অনুশোচনা নেই বলে জানান ট্রাম্প। সেনেটের নির্বাচনে দু’জনই হেরেছেন।

মঙ্গলবার রাত সাড়ে দশটার কিছু আগে, হোয়াইট হাউসে বসে নির্বাচনের ফল দেখতে দেখতে টাইমসের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। তখন প্রতিনিধি পরিষদ এবং সেনেট—কংগ্রেসের দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পথে এগোচ্ছিলেন ডেমোক্র্যাটরা।

তিনি বলেন, “আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই ফলগুলো দেখছি। দেখছি, ডার্লিন হেরে গিয়েছে। ওহ্‌, আশ্চর্য ব্যাপার! আপনাদের কী মনে হয়, লিন্ডসি লড়লে কেমন করতেন?” গত জুলাইয়ে প্রয়াত সেনেটর লিন্ডসি গ্রাহামের প্রসঙ্গ টেনে এই প্রশ্ন করেন তিনি।

ট্রাম্প আরও বলেন, তাঁর বিশ্বাস, গ্রাহাম লড়লে সম্ভবত জিতে যেতেন।

দেশজুড়ে ডেমোক্র্যাটদের স্পষ্ট জয়গুলোর খবর যখন একে একে তাঁর কাছে পৌঁছচ্ছে, তখন টাইমসের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কথোপকথনে প্রেসিডেন্টের গলা শোনাচ্ছিল ম্রিয়মাণ।

কিন্তু রিপাবলিকানদের ব্যাপক পরাজয় সত্ত্বেও তিনি জোর দিয়ে বলেন, দ্বিতীয় দফার প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম দু’বছরের কোনও কাজ নিয়েই তাঁর অনুশোচনা নেই। তাঁর কথায়, “আমার বিবেচনায়, যে কোনও প্রেসিডেন্টের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে সফল দু’বছর।”

নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়ে গত এক বছর ধরে ধারাবাহিক ভাবে সন্দেহ ছড়ানোর চেষ্টা চালানোর পরে ভোটের ফল মেনে নেওয়ার এই প্রতিশ্রুতি দিলেন ট্রাম্প। মঙ্গলবারও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দফতর সমাজমাধ্যমে একের পর এক বার্তা দিয়ে নাগরিক নন, অথচ ভোট দিয়েছেন—এমন ব্যক্তিদের গ্রেফতারের অঙ্গীকার করেছে। যদিও এ ধরনের ভোটার খুঁজে পেতে প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হয়েছে।

মঙ্গলবার রাতে হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে কয়েক জন শীর্ষ সহযোগীকে নিয়ে ফলাফল দেখতে বসেছিলেন প্রেসিডেন্ট। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিদেশসচিব মার্কো রুবিও, অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ এবং বাণিজ্যসচিব হাওয়ার্ড লাটনিক। সেই বৈঠকের পরেই ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন। সেখানে উপস্থিত কয়েক জনের বর্ণনায়, পরিবেশ ছিল “বিষণ্ণ”, “শবযাত্রার মতো শোকাচ্ছন্ন”।

অতিথিদের চলে যাওয়ার বিষয়ে অবহিত ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাত দশটার আগেই কেউ কেউ বেরিয়ে যেতে শুরু করেন। ট্রাম্পের অন্য কয়েক জন মিত্র ঘনিষ্ঠ মহলে বলেন, তাঁরা যে ওয়াশিংটনের বাইরে রয়েছেন, তাতে খুশিই হয়েছেন।

ব্যক্তিগত কথাবার্তার বিবরণ দিতে গিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত কয়েক জন জানান, গোটা সন্ধ্যা জুড়ে ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক সহযোগীদের কাছে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। নির্বাচনের আগে জনমত সমীক্ষা সম্পর্কে তাঁকে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে।

তবে তিনি ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। কারণ, রিপাবলিকানদের পক্ষে পরিস্থিতি যে কঠিন, সে কথা তাঁর সহযোগীরা প্রকাশ্যেই বলেছিলেন।

হোয়াইট হাউসের এক আধিকারিক অবশ্য প্রেসিডেন্ট তাঁর উপদেষ্টাদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন—এই বক্তব্য অস্বীকার করেছেন।

টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তাঁর বিশ্বাস, ব্যালটে তাঁর নাম ছিল না বলেই রিপাবলিকানদের হারতে হয়েছে।

তাঁর কথায়, “আমি প্রার্থী ছিলাম না। আর আমি প্রার্থী ছিলাম না বলেই যথেষ্ট সংখ্যক মানুষকে ভোট দিতে বের করে আনতে পারিনি আমরা।”

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও তাঁর কোনও অনুশোচনা নেই বলে জানান তিনি। বলেন, সুযোগ এলে “আবারও একই কাজ করব”। তবে পেট্রলের দাম নিয়ে ভোটাররা যে অসন্তুষ্ট ছিলেন, তা মেনে নেন।

ট্রাম্প বলেন, “ইরানের ব্যাপারটায় ওদের আপত্তি নেই। কিন্তু সম্ভবত তেলের দাম নিয়ে ওরা খুশি হয়নি—খুশি হয়নি। তা, এ রকম তো হয়েই থাকে। কিন্তু ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। আসলে দেশ এবং বিশ্বের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ওটা ছিল অত্যন্ত বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।”

ট্রাম্প জানান, একসঙ্গে কাজ করা নিয়ে কথা বলতে ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। যদিও কারও নাম বলতে চাননি তিনি। তাঁর ধারণা, সরকারের ঋণগ্রহণের ঊর্ধ্বসীমা নিয়ে দুই পক্ষ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

তিনি বলেন, “আমার হাতে পূর্ণ ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। কাজেই ওদের আমাদের কাছে আসতেই হবে। আর ওদের যদি কোনও ভাল প্রস্তাব থাকে, তা হলে একসঙ্গে কাজ করতে আমি অবশ্যই রাজি।”

এই বিষণ্ণ দৃশ্যের মধ্য দিয়েই শেষ হয় এমন একটি দিন, যে দিন প্রেসিডেন্ট জনসমক্ষে আসেননি। তিনি অপেক্ষা করছিলেন এমন এক নির্বাচনী প্রচারের ফলের জন্য, যাকে তাঁর নিজের ওপর গণভোট হিসেবেই দেখতে হবে বলে বারবার জোর দিয়েছিলেন।

দিনের শুরুতে নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’-এ ফোন করে ভোটারদের কাছে শেষ আবেদন জানান ট্রাম্প। অভিবাসন রুখতে তাঁর প্রশাসনের কঠোর অভিযানের কথা তুলে ধরেন। দাবি করেন, তাঁর নীতির ফলেই অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছে।

“মূল্যবৃদ্ধির সমস্যার সমাধান হয়ে গিয়েছে,” দাবি করেন ট্রাম্প। অথচ তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ভোগ্যপণ্যের দাম অনেকটাই বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দাম বেড়েছিল ৩.৭ শতাংশ। এর একটি কারণ ছিল ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানির চড়া দাম।

তাঁর আরও দাবি, আমেরিকা এখন “বিশ্বের সবচেয়ে জমজমাট দেশ”।

প্রেসিডেন্টের এই উজ্জ্বল ছবির সঙ্গে বহু ভোটারের সংসার চালানোর খরচ নিয়ে উদ্বেগের ফারাকই স্পষ্ট করে দিচ্ছিল, নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে ট্রাম্পের বক্তব্য কতটা বেমানান হয়ে উঠেছিল।

জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানো নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে তিনি বারবার বিদ্রুপ করেছেন। মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী করেছেন পূর্বসূরিদের। ভুল দাবি করেছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও পেট্রলের দাম কমছে। তাঁর বক্তব্য ছিল, ইরান যুদ্ধের জন্য পেট্রলের বাড়তি দাম এমন কিছু বড় মাশুল নয়। তিনি বারবার দাবি করেছেন, আমেরিকা সেই যুদ্ধে ইতিমধ্যেই জিতে গিয়েছে। সোমবার অবশ্য তিনি ঘটনাটিকে যুদ্ধ বলেই মানতে চাননি।

প্রচারের এক অদ্ভুত মোড়ে পুরুষদের শরীর নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য তাঁর নির্বাচনী বক্তৃতার নিয়মিত বিষয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ওহায়োর রিপাবলিকান সেনেটর জন হাস্টেডের পশ্চাদ্দেশ নিয়ে তিনি বারবার মন্তব্য করেন।

ভোটাররা তাঁদের জীবনে যে সমস্যাগুলোকে সবচেয়ে জরুরি বলে জানাচ্ছিলেন, সে সব বিষয়ে ট্রাম্প খুব কমই গভীর ভাবে কথা বলেছেন। নিজের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার কথাও স্বীকার করেননি। দু’বছর আগে নির্বাচনে লড়ার সময় অর্থনীতি সামলানোর দক্ষতা ছিল তাঁর অন্যতম বড় শক্তি। অথচ এ বারের ভোটের আগে সেই বিষয়েই তাঁর কাজ সম্পর্কে ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক মত ছিল বেশি। শুল্কনীতি, অর্থনীতি, পেট্রলের দাম, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ইরান যুদ্ধ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ।

দেশজুড়ে প্রচারে ঘুরে প্রেসিডেন্ট নানা আর্থিক সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। বলেন, রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ‘ওবামাকেয়ার’-এর ৫০০ ডলারের “ফেরত” চেক দেওয়া হবে। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিককে দেওয়া হবে ৫,০০০ ডলার করে—যার নাম দেওয়া হয় “ট্রাম্প ডিভিডেন্ড”।

প্রেসিডেন্টের প্রচারের কেন্দ্রীয় বক্তব্য ছিল, আমেরিকানরা যেন মনে করেন, ভোটটা তাঁকেই দিচ্ছেন। দেশজুড়ে ৩০টি সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে হাজির হয়ে নিজের সমর্থকদের কাছে আবেদন জানান তিনি। প্রায়ই বলেন, “ধরে নিন, ব্যালটে আমার নামই আছে।”

কিন্তু প্রচারের শেষ কয়েক দিনে সেই হাড়ভাঙা খাটুনি নিয়ে প্রকাশ্যেই অভিযোগ করতে শুরু করেন ট্রাম্প। শুক্রবার ফ্লোরিডার এক সমাবেশে বলেন, তাঁর মনে হয়েছিল, এটাই হবে এ দফায় তাঁর শেষ সভা। তার পরে বিশ্রাম নিতে পারবেন। প্রেসিডেন্টের কথায়, “টানা আঠাশ দিন ধরে এই ঝক্কি পোহানো কম কথা নয়।”

ভোটের আগের দিন শেষ বার জনসমক্ষে আসার জন্য ট্রাম্প বেছে নেন লিঙ্কন মেমোরিয়ালের রিফ্লেক্টিং পুল। সমস্যায় জর্জরিত এই প্রকল্পটি তত দিনে একটি প্রতীক হয়ে উঠেছিল—রাজধানীকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ এগিয়ে নিয়ে যেতে তাঁর প্রশাসন কী ভাবে আইন এড়িয়ে যেতে এবং ভিন্নমতকে নিশানা করতে প্রস্তুত, তার প্রতীক।

নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা জেতার জন্য খুব জোর চেষ্টা করেছি।”

ট্রাম্প আরও বলেন, “আমেরিকা তৈরি। মানুষ ভোট দিতে প্রস্তুত। আশা করি, তারা সঠিক কাজটিই করতে প্রস্তুত।”

নির্বাচনের দিন জুড়ে ট্রাম্পের সাফল্যের প্রশংসা করে একের পর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায় হোয়াইট হাউস। তার মধ্যে একটি ছিল তাঁর “বিরামহীন সফরসূচি” নিয়ে।

কিন্তু দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সমাজমাধ্যমে তীব্র ভাষায় লেখা পোস্টে প্রেসিডেন্টের অস্থিরতা প্রকাশ পেতে থাকে। রিফ্লেক্টিং পুলে তাঁর বক্তৃতার সংবাদ পরিবেশন নিয়ে তিনি ক্ষোভ উগরে দেন। ক্যালিফর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি টেড লিউ এবং দ্য ডেইলি মেলকে অপমানসূচক ভাষায় আক্রমণ করেন। তাঁর অভিযোগ, ওই স্মারকটির নাম নিজের নামে রাখার ইচ্ছা নিয়ে তিনি যে রসিকতা করেছিলেন, তা বিকৃত ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

দিনের একটি সময়ে অবশ্য তাঁকে আশাবাদী মনে হয়েছিল। গুয়ামের ফলাফলের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। সেখানে এক রিপাবলিকান প্রার্থী গভর্নর নির্বাচিত হওয়ার পথে ছিলেন। ট্রাম্প লেখেন, “বাহ্‌, আশা করি, এটাই আগামী ফলাফলের ইঙ্গিত!”

সন্ধ্যা নামতেই, ইস্ট রুমে ফলাফল দেখার আসর বসানোর প্রস্তুতির মধ্যে তাঁর রাগ গিয়ে পড়ে ফক্স নিউজের ওপর। ওই চ্যানেলের এক ভাষ্যকারকে তিনি বলেন, “পাথরের মতোই নিরেট বোকা।” জানান, ওই “অপদার্থ” যতক্ষণ পর্দায় থাকবেন, ততক্ষণ তিনি চ্যানেল বদলে রাখবেন। সঙ্গে অবশ্য যোগ করেন, পরে আবার ফক্সেই ফিরবেন।

কিছু ক্ষণের মধ্যেই ফের ওই সংবাদ চ্যানেলকে আক্রমণ করেন তিনি। তাদের জনমত সমীক্ষার প্রশ্ন নিয়ে আপত্তি তোলেন। অভিযোগ করেন, চ্যানেলের দর্শকসংখ্যা কমার কারণ, তারা “ট্রাম্পবিদ্বেষে উন্মত্ত ডামোক্র্যাটদের” নিয়ে খবর করতেই অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে।