লিওনেল মেসির কাতার বিশ্বকাপ যেন নিখুঁত এক গল্পের পরিণতি ছিল। সেটাই ছিল মহা-সমাপ্তি। মেসিকে চিরকালই তুলনা করা হয়েছে দিয়েগো মারাদোনার সঙ্গে। আর মারাদোনার জীবনের নাটকীয় উত্থান-পতনের পাশে দাঁড়ালে মেসির জীবনকাহিনি সবসময়ই যেন একটু ফিকে মনে হতো। একদিকে মারাদোনার জীবন—চোট, মাদকাসক্তি, নিষেধাজ্ঞা, সংগঠিত অপরাধচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ, সর্বোচ্চ সাফল্য ও সর্বনিম্ন পতনের এক অপেরা; অন্যদিকে মেসির গল্প—একটি ছেলে ফুটবলে অসাধারণ প্রতিভাবান ছিল, তারপর টানা দুই দশক ধরে অসাধারণই থেকে গেল, একের পর এক শিরোপা জিতল। হ্যাঁ, হতাশা ছিল, চোখের জল ছিল, আত্মসন্দেহের মুহূর্তও ছিল, কিন্তু তিনি কখনও নর্দমার অতলে তলিয়ে যাননি, সাংবাদিকদের দিকে এয়ারগান তাক করেননি, কিংবা ডোপ টেস্ট এড়াতে নকল যৌনাঙ্গ ব্যবহার করেননি।
তবু কাতার বিশ্বকাপ অন্তত কিছুটা নাটকীয় উত্তেজনা এনে দিয়েছিল। ক্লাব ফুটবলে সাফল্য যেন যথেষ্ট ছিল না। মেসি আরও কিছু খুঁজছিলেন। আগের বছর ব্রাজিলের মাটিতে কোপা আমেরিকা জেতার পথে তিনি নিজের স্বভাবসিদ্ধ সংযম অতিক্রম করে দলের প্রকৃত নেতা হয়ে উঠেছিলেন। তিনি সতীর্থদের উদ্দেশে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনাল জয়ের পর টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে যখন তিনি হঠাৎ ওয়াউট ভেগহর্স্টকে উদ্দেশ করে বলে উঠলেন, “Que mira, bobo?”—“কী দেখছ, বোকা?”—তখন সেটাকেও উদযাপন করা হয়েছিল নীরব মানুষটির খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসা হিসেবে, যদিও বাক্যটি ছিল খানিকটা শিশুসুলভ।
প্রশ্ন ছিল, আর্জেন্টাইন মহাতারকা কি অবশেষে বিশ্বকাপ ট্রফিটা জিততে পারবেন? ধরে নেওয়া হচ্ছিল, এটাই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। নক-আউট পর্বে প্রতিটি ম্যাচ যেন তাঁর শেষ ম্যাচ হয়ে উঠেছিল। তাঁর প্রতিভার দীপ্তি এবং সেই দীপ্তির ভঙ্গুরতার অনুভূতি বারবার মানুষের মনে করিয়ে দিচ্ছিল জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বকে।
কাতার বিশ্বকাপ যেন একটি পূর্ণবৃত্ত সম্পন্ন করেছিল। ১৯৯৫ সালে কাতারেই আর্জেন্টিনা জিতেছিল তাদের প্রথম অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ, হোসে পেকারমান ও উগো তোকাল্লির নেতৃত্বে। পরবর্তী বারো বছরে তারা আরও চারবার সেই শিরোপা জেতে। বর্তমান কোচ লিওনেল স্কালোনি ছিলেন সেই প্রথম দলের সদস্য। তাঁর দুই সহকারী ওয়াল্টার স্যামুয়েল ও পাবলো আইমারও ছিলেন সেই দলে। মেসি নিজে ছিলেন ২০০৭ সালের শেষ বিজয়ী দলের অংশ। তাঁর সতীর্থ পাপু গোমেসও ছিলেন সেই দলে, আর আঞ্জেল দি মারিয়া খেলেছিলেন ২০০৫ সালে।
পেকারমান-তোকাল্লির যে ফুটবল-দর্শন, যে মানসিকতা, তা যেন এই বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের শিরায় শিরায় প্রবাহিত হচ্ছিল। একইসঙ্গে ছিল এক অদ্ভুত আশঙ্কা—যুব ফুটবলে ইতিহাসের অন্যতম সফল প্রজন্ম হয়েও যদি তারা সিনিয়র পর্যায়ে কিছুই জিততে না পারে? তাই মনে হচ্ছিল, যা কাতারে শুরু হয়েছিল, তা কাতারেই গৌরবের সঙ্গে শেষ হলো।
যদি মেসি সত্যিই গল্পের নিয়ম মেনে চলতে চাইতেন, তাহলে ট্রফি গ্রহণের সময় কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া বিশ্ত পোশাকটি সরিয়ে ফেলে সেখানেই অবসরের ঘোষণা দিতেন। বিজয়মিছিল করতেন, সতীর্থদের কাঁধে চড়ে স্টেডিয়াম প্রদক্ষিণ করতেন, ঠিক যেমন মারাদোনা করেছিলেন ১৯৮৬ সালে আজটেকা স্টেডিয়ামে। নিখুঁত সমাপ্তি। পর্দা নামুক। ক্রেডিট রোল হোক।
কিন্তু চার বছর পরে যখন দেখা যাচ্ছে আর্জেন্টিনা আবারও বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং সেই দলে এখনও রয়েছেন মেসি, তখন বিষয়টি খানিক অস্বস্তিকরই লাগে। তিনি যেন গল্পের নিয়ম ভেঙে ফেলেছেন। জীবনে তাঁর ‘আর একবার শেষ অভিযান’ হয়ে গেছে ড্যানি গ্লোভারের সিনেমার চরিত্রগুলোর থেকেও বেশি। টুর্নামেন্ট চলাকালীন তাঁর বয়স হবে ৩৯। ফলে তিনি বিশ্বকাপে খেলা সবচেয়ে বয়স্ক আর্জেন্টাইন ফুটবলার হয়ে উঠবেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে সামগ্রিকভাবে তিনি হবেন মাত্র দশম বয়স্কতম খেলোয়াড়—কারণ আধুনিক ফুটবলে খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে।
অবশ্য ঝুঁকিও কম নয়। তাঁর বিদায় যদি হয় ব্যর্থতার মধ্যে, তাহলে সেটি আর্জেন্টিনার জন্য কাতারের আগের সমস্ত বিশ্বকাপের মতোই এক অপূর্ণ, বিষণ্ন পরিসমাপ্তি হয়ে উঠতে পারে।
তবু আরেকটি সম্ভাবনাও আছে—বিজয়ের সম্ভাবনা।
তিনি কি আবারও পারবেন?
সাধারণ মানুষের কাছে মনে হতে পারে, তাঁর আর কিছু প্রমাণ করার নেই। কাজ শেষ হয়েছে। এবার বিশ্রাম নেওয়ার সময়। অথবা কোচিং, ধারাভাষ্য, কিংবা সম্পূর্ণ অন্য কোনও পেশায় যাওয়ার সময়।
কিন্তু অভিজাত ক্রীড়াবিদদের মধ্যে এক ধরনের অদম্য, কখনও কখনও অযৌক্তিক আত্মবিশ্বাস থাকে। হয়তো মেসির বিশ্বাস, তিনি আবারও আর্জেন্টিনাকে বিশ্বজয়ের পথে নেতৃত্ব দিতে পারবেন।
বহু বছর মারাদোনার ছায়ায় বেঁচে থাকার পর, বারবার শুনতে হয়েছে—বার্সেলোনার হয়ে যতই সাফল্য পান না কেন, দেশের হয়ে মারাদোনা যা করেছেন, তিনি তা করতে পারেননি। কাতারে সেই অভিযোগের জবাব তিনি দিয়েছেন। কিন্তু এবার কি তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারেন?
যদি তিনি দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতেন, তাহলে কি এমন এক ভবিষ্যৎ আসবে, যখন আর্জেন্টিনার মানুষ আসাদো ভাজার আগুনের পাশে বসে অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্বীকার করবেন—দিয়েগো যতই মহান হোন, বিশ্বকাপ তিনি জিতেছিলেন একবার; মেসি জিতেছেন দু’বার?
কিন্তু সেটি কতটা বাস্তবসম্মত?
কাতারেই মেসিকে বয়স্ক মনে হচ্ছিল। তিনি অনেক সময় ম্যাচের প্রান্তে ঘুরে বেড়াতেন, হঠাৎ এক ঝলক প্রতিভার আলো ছড়িয়ে আবার অদৃশ্য হয়ে যেতেন। রদ্রিগো দে পল তাঁর ‘পা’ হয়ে উঠেছিলেন—এতটাই যে পরে ইন্টার মায়ামি মেসির জন্য একই কাজ করার উদ্দেশ্যে তাঁকে এমএলএস-এ নিয়ে আসে। জুলিয়ান আলভারেস এবং এনসো ফার্নান্দেসও বিপুল পরিশ্রম করেছেন তাঁকে আড়াল করে রাখার জন্য।
তবু হয়তো একবার মেনে নেওয়া গেলে যে একজন খেলোয়াড় আর আগের মতো দৌড়তে পারেন না, তখন তাঁর শারীরিক সক্ষমতার সামান্য আরও অবনতি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ থাকে না। ছায়ার মধ্যে ঘুরে বেড়ানোই তখন তাঁর শক্তি হয়ে ওঠে। তিনি প্রতিপক্ষের চোখ এড়িয়ে থাকেন, আর ঠিক সেই কারণেই বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন। তিনি আর খেলার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে পুরো যন্ত্রটিকে মন্থর করেন না; বরং অন্ধকারের আড়াল থেকে আচমকা আঘাত হানার সুযোগ খোঁজেন।
সম্ভবত এটাই ২০২৬ সালের মেসি—একজন মানুষ, যিনি আর তরুণ নন; একজন কিংবদন্তি, যাঁর গল্প শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল; অথচ যিনি এখনও মঞ্চ ছাড়তে রাজি নন। আর হয়তো সেই কারণেই তাঁর গল্প এখনও আমাদের টানে। কারণ অসমাপ্ত গল্পের আকর্ষণ কখনও কখনও নিখুঁত সমাপ্তির থেকেও বেশি।