নয়াদিল্লি: চার রাজ্যের বিধান পরিষদ (এমএলসি) নির্বাচনে এনডিএ সার্বিক ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখলেও, গেরুয়া শিবিরের দুই সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটিতেই বড়সড় ধাক্কা খেল বিজেপি। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সংসদীয় ক্ষেত্র উত্তরপ্রদেশের বারাণসী এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) সদর দফতর মহারাষ্ট্রের নাগপুর—উভয় কেন্দ্রেই পরাজিত হলেন বিজেপি প্রার্থীরা। বারাণসী স্নাতক আসনে বিপুল ভোটে সমাজবাদী পার্টির (এসপি) জয় এবং নাগপুরে উপমুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীশ ও নীতিন গডকড়ীর খাসজমিতে কংগ্রেসের আসন ধরে রাখা নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে।
বারাণসীতে পদ্মপতন: পরাজয় স্বীকার কেদারনাথের
বারাণসী ডিভিশন স্নাতক আসনে কার্যত একতরফা লড়াইয়ে জয়ী হয়েছেন সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী আশুতোষ সিনহা। দীর্ঘ ভোটগণনা শেষে তিনি বিজেপির অভিজ্ঞ প্রার্থী কেদারনাথ সিংহকে ২০,০৩২ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। সিনহা পান ৫৫,০৪৬টি ভোট, যেখানে বিজেপির কেদারনাথ সিংহ আটকে যান ৩৫,১১৪ ভোটে। বারাণসীর শিক্ষক ও স্নাতক—উভয় আসনেই এবার জয় পেল অখিলেশ যাদবের দল।
ফলাফল স্পষ্ট হতেই গণতান্ত্রিক সৌজন্য বজায় রেখে সামাজিক মাধ্যমে পরাজয় মেনে নেন কেদারনাথ সিংহ। তিনি বলেন, “ফলাফল হয়তো প্রত্যাশামতো হয়নি, কিন্তু বারাণসীর শিক্ষিত ভোটারদের এই রায় আমি অত্যন্ত বিনম্রতার সঙ্গে মাথা পেতে নিলাম।” পদ বা ক্ষমতার চেয়ে জনসেবাই রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য উল্লেখ করে তিনি কর্মী-সমর্থকদের ধন্যবাদ জানান এবং ভবিষ্যতে মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন।
নাগপুরে ৪০ ঘণ্টার স্নায়ুযুদ্ধ: ফড়ণবীশের ‘টুইট বিতর্ক’
মহারাষ্ট্রের নাগপুর স্নাতক আসনের লড়াই ছিল রুদ্ধশ্বাস। টানা ৪০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা গণনার শেষে জয়ী হন কংগ্রেসের আইনজীবী ও শিক্ষাবিদ প্রার্থী অভিজিৎ ওয়ানজারি। বিজেপি প্রার্থী তথা প্রাক্তন বিধায়ক সুধাকর কোহলেকে ৩,২৭১ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে নিজের আসন ধরে রাখেন তিনি। ওয়ানজারি পান ৬৭,২৩১টি ভোট এবং কোহলে পান ৬৩,৯৬০টি ভোট।
এই কেন্দ্রকে ঘিরে রাজনৈতিক নাটক তুঙ্গে ওঠে গণনা চলাকালীন। প্রাথমিক রাউন্ডে বিজেপি প্রার্থী সামান্য এগিয়ে থাকার সময় উপমুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীশ এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে আগাম জয়ের বার্তা দিয়ে পোস্ট করেন। কিন্তু দ্বিতীয় পছন্দের ভোট গণনায় ফল উল্টে যেতেই তড়িঘড়ি সেই পোস্ট মুছে ফেলা হয়। এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে আসরে নামে কংগ্রেস। মহারাষ্ট্র প্রদেশ কংগ্রেস তীব্র কটাক্ষ করে লেখে, “ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার আগেই ফড়ণবীশ তির ছুড়তে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই তির উল্টে নিজের বুকেই বিঁধল, শেষে টুইট মুছতে বাধ্য হলেন। এটা কেবল ট্রেলার, ২০২৯ সালে মানুষ এমন রাজনৈতিক জবাব দেবে যে আজকের দিনের কথা মনে পড়বে।”
ব্যালট পেপার তরজা ও রাজনৈতিক বার্তা
কয়েক দিন আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক্স হ্যান্ডেলে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে হওয়া এই নির্বাচন নিয়ে কংগ্রেসকে কটাক্ষ করে লিখেছিলেন—চার রাজ্যের ২৮টি আসনে ব্যালটে ভোটে কংগ্রেস ক’টি আসন জিতেছে? তবে নাগপুর ও বারাণসীর ফলাফল সামনে আসতেই বিরোধী শিবির পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেছে। মোদীর উদ্দেশে কংগ্রেসের প্রশ্ন, "বলুন তো নাগপুরে কে জিতল?"
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্নাতক ও শিক্ষক কেন্দ্রের ভোটাররা মূলত সমাজের উচ্চশিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি নীতির প্রশ্নে এই শিক্ষিত ভোটারদের অসন্তোষই প্রতিফলিত হয়েছে ব্যালটে। উত্তরপ্রদেশে ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বারাণসীর জয় অখিলেশ যাদব ও কংগ্রেসের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের জন্য বড় মনোবল বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়াল। অন্যদিকে, মহারাষ্ট্রে শাসকজোটের অন্দরে অন্তর্দ্বন্দ্ব ও নাগপুরের মতো সুরক্ষিত দুর্গে ফাটল বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য আত্মপর্যালোচনার বার্তা দিয়ে গেল।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।