Home দৃষ্টিভঙ্গিসুমন নামা একটি পচা ডিমের আত্মকথা

একটি পচা ডিমের আত্মকথা

0 comments 4 views 3 minutes read
A+A-
Reset

সুমন চট্টোপাধ‍্যায়: আমার নাম ডিম।

না, এখন আর শুধু ডিম নই।

আমি পচা ডিম।

বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক অভিধানে আমার একটা সম্মানজনক স্থান তৈরি হয়েছে। যদিও সম্মানজনক কথাটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যেতে পারে। কারণ মানুষ আমাকে সাধারণত নাক চেপে স্মরণ করে।

তবু স্বীকার করতেই হবে, আমার উত্থান অভাবনীয়। একটা সময় ছিল যখন আমার জীবন খুব সাধারণ ছিল। মুরগি আমাকে পাড়ত।মানুষ কিনত। কেউ সেদ্ধ করত।কেউ ওমলেট বানাত।কেউ ডিমের ঝোল। আমার ভাগ্যে বড়জোর কোনও স্কুলপড়ুয়ার টিফিন লেখা ছিল। রাজনীতিতে প্রবেশের কথা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।

কিন্তু মানুষ বড় বিচিত্র প্রাণী। তারা যে কোনও সাধারণ জিনিসকে অসাধারণ বানিয়ে দিতে পারে। কখনও একটা লাঠিকে বিপ্লব বানায়। কখনও একটা চরকাকে স্বাধীনতার প্রতীক বানায়। আর কখনও একটা ডিমকে রাজনৈতিক ভাষ্যকার বানায়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

একদিন হঠাৎ দেখলাম, আমাকে আর রান্নাঘরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না। আমাকে আলাদা করে রাখা হচ্ছে। অত্যন্ত যত্নে। অত্যন্ত পরিকল্পনা করে। প্রথমে ভেবেছিলাম, নিশ্চয়ই আমি কোনও বিশেষ অতিথির জন্য নির্ধারিত। পরে বুঝলাম, অতিথি বিশেষ ঠিকই, তবে খাওয়ার জন্য নয়।

আমার রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল এক গরম দুপুরে। রোদের মধ্যে আমাকে রেখে দেওয়া হল। দিন গেল। আরও দিন গেল।আমার ভিতরে বিজ্ঞান কাজ করতে শুরু করে দিল। রসায়ন কাজ করতে লাগল। প্রকৃতি তার নিজস্ব জাদু দেখাতে লাগল। আমি ধীরে ধীরে সাধারণ ডিম থেকে উন্নীত হলাম পচা ডিমে।

এ যেন সরকারি চাকরিতে পদোন্নতির মতো। শুধু পার্থক্য হল, এখানে দক্ষতার বদলে দুর্গন্ধই ছিল যোগ্যতার মাপকাঠি। এরপর একদিন আমাকে একটা ব্যাগে ভরা হল। সঙ্গে আরও কয়েকজন সহকর্মী।

আমরা সবাই একই পেশার। একই আদর্শের। একই সুগন্ধের। ব্যাগের ভেতরে আমরা গল্প করছিলাম। একজন বলল, “কোথায় যাচ্ছি? ”আরেকজন বলল, “সম্ভবত কোনও সভায়।” তৃতীয়জন অভিজ্ঞ ছিল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বন্ধুরা, আজ আমাদের জীবনের বড় দিন।”

গন্তব্যে পৌঁছে আমি প্রথমবার রাজনীতিকে কাছ থেকে দেখলাম। মাইক। ব্যানার। স্লোগান। ক্যামেরা। নেতা। সমর্থক। প্রতিবাদী।সবকিছু মিলিয়ে এক বিশাল নাট্যমঞ্চ।আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, এতদিন যাদের শুধু টেলিভিশনে দেখতাম, আজ তাদের সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয় হতে চলেছে।

মানুষ বলে, রাজনীতিতে যোগাযোগ খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমার ক্ষেত্রেও তাই হল। শুধু যোগাযোগটা একটু দ্রুতগতির ছিল। তারপর এল সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। একটি হাত আমাকে তুলে নিল। আমি আকাশে উঠলাম। পৃথিবী নিচে ছোট হয়ে গেল। বাতাস কানে শিস দিতে লাগল। জীবনে প্রথমবার আমি নিজেকে ঈগল বলে মনে করছিলাম। যদিও বাস্তবে আমি ছিলাম একটি পচা ডিম। কিন্তু ইতিহাসে সব মহান মুহূর্তই কিছুটা বিভ্রম নিয়ে আসে।

আকাশে উড়তে উড়তে আমি একটা কথা বুঝলাম। মানুষ আসলে আমাকে ছুঁড়ছে না। সে তার রাগ ছুঁড়ছে। তার হতাশা ছুঁড়ছে। তার ব্যঙ্গ ছুঁড়ছে। তার বঞ্চনা ছুঁড়ছে। আমি শুধু বাহন। একটা ক্ষুদ্র যানবাহন। একটা রাজনৈতিক কুরিয়ার সার্ভিস। যার দায়িত্ব একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া।

আমার গন্তব্যে পৌঁছানোর পর যা ঘটল, তা ইতিহাসের অংশ। আমি সেটা বিস্তারিত বলব না। কারণ ভদ্র সমাজে সব কথা বলা যায় না। শুধু এটুকু বলব, আমার কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে। এবং যথেষ্ট গন্ধযুক্ত পরিবেশে।

পরে শুনলাম, আমি সংবাদে এসেছি। সামাজিক মাধ্যমে এসেছি।

চায়ের দোকানের আলোচনায় এসেছি। আমার ছবি ছাপা হয়েছে।

আমার বিশ্লেষণ হয়েছে। আমার উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। আমি তখন আর সাধারণ ডিম নই। আমি রাজনৈতিক চরিত্র।একটা প্রতীক। একটা রূপক। একটা সময়ের চিহ্ন।

কিন্তু আজ, কর্মজীবনের শেষে দাঁড়িয়ে, আমি কিছু কথা বলতে চাই। আমাকে নিয়ে যতই হাসাহাসি হোক, আমি আসলে সুখবর নই।আমি কোনও সুস্থ সমাজের লক্ষণ নই। আমি তখনই জন্ম নিই, যখন কোথাও সংলাপ কমে যায়। যখন মানুষের বিশ্বাস কমে যায়।যখন কথার জায়গা দখল করে ব্যঙ্গ। যখন শ্রদ্ধার জায়গা দখল করে বিদ্রুপ। আমি তখনই মঞ্চে উঠি।

তাই আমার সাফল্যে আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই। যেদিন আমার আর প্রয়োজন হবে না, সেদিনই গণতন্ত্রের জয় হবে। যেদিন মানুষ আবার বিশ্বাস করবে যে কথা বলেই কথা পৌঁছানো যায়, সেদিন আমি অবসর নেব।

আবার রান্নাঘরে ফিরে যাব। আবার ওমলেট হব। আবার ডিমের ঝোল হব। রাজনীতির ইতিহাসে আমার নাম না থাকলেও চলবে।কারণ সত্যি কথা বলতে কী, আমি কখনও রাজনৈতিক নায়ক হতে চাইনি।

আমি শুধু একটা ডিম ছিলাম। মানুষই আমাকে ইতিহাস বানিয়েছে। মানুষই আমাকে অস্ত্র বানিয়েছে। মানুষই আমাকে প্রতীক বানিয়েছে। আর মানুষই একদিন আমাকে অবসর দেবে।

ততদিন পর্যন্ত বাংলার রাজনৈতিক আকাশে আমি উড়ে বেড়াব। কখনও বাস্তবে। কখনও রূপকে। কখনও ব্যঙ্গের পাতায়। কখনও জনরোষের গল্পে। ক্ষমতাবানদের মনে করিয়ে দেব একটাই কথা—ফুলের মালা আর পচা ডিমের মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি নয়। সেই দূরত্বের নাম জনমত।

আর জনমতের চেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র পৃথিবীতে আজও আবিষ্কৃত হয়নি।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles