ইজরায়েলের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনে এখনও পর্যন্ত যে ছবি উঠে এসেছে, তাতে মনে হচ্ছে, ভোটাররা বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে দুর্বল করেছেন, কিন্তু প্রত্যাখ্যান করেননি। এই রায়ের মধ্যে ধরা পড়েছে ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পরবর্তী ইজরায়েলের এক গভীর দোটানা। নেতানিয়াহুর গোঁড়া, শক্তিপ্রদর্শননির্ভর ও মেরুকরণমূলক রাষ্ট্রভাবনা থেকে অনেকেই মুক্তি চান। কিন্তু তার জায়গায় কী আসবে, সে সম্পর্কে তাঁদের স্পষ্ট ধারণা নেই।

ইজরায়েলে দক্ষিণপন্থা ও বামপন্থা বলতে কী বোঝায়?

ইজরায়েলের রাজনীতিতে ‘ডান’ ও ‘বাম’ শব্দ দু’টির অর্থের সঙ্গে ভারত বা অন্য দেশের দক্ষিণপন্থা ও বামপন্থার ধারণা হুবহু মেলে না। বিরোধী শিবির নিজেদের তুলনায় বেশি ধর্মনিরপেক্ষ, উদার ও গণতান্ত্রিক বলে তুলে ধরে ঠিকই। কিন্তু ২০২৩ সালে হামাসের হামলার পর বিদেশনীতি নিয়ে দুই শিবিরের অবস্থানের মধ্যে মোটের উপর বিস্তর মিল রয়েছে।

ইজরায়েলের রাজনৈতিক বিভাজন মূলত কয়েকটি প্রশ্নকে ঘিরে গড়ে উঠেছে—জাতীয় নিরাপত্তা, ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাত, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতিগুলির ভবিষ্যৎ এবং ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক।

দক্ষিণপন্থীরা সাধারণত স্বাধীন প্যালেস্টাইনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে এসেছেন এবং বসতি স্থাপনকে সমর্থন করেছেন। অন্য দিকে, ভূখণ্ড নিয়ে আপস ও আলোচনার প্রশ্নে বামপন্থীরা তুলনায় বেশি নমনীয় থেকেছেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে সব অবস্থান একদা দক্ষিণপন্থীদের নিজস্ব বলে বিবেচিত হত, ইজরায়েলের ইহুদি সমাজের রাজনীতিতে সেগুলির গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।

ইজরায়েলের ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’-এর ২০২৫ সালের অক্টোবরের একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, গাজা যুদ্ধ পরিচালনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে ৭২ শতাংশ ইজরায়েলি অসন্তুষ্ট। অথচ একই যুদ্ধে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সন্তুষ্ট ৫৭ শতাংশ।

এই ফারাকটি নির্বাচনের ফল বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কোনও ভোটার কঠোর সামরিক প্রত্যাঘাতের পক্ষে থেকেও নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের বিরোধিতা করতে পারেন, তাঁর সরকারের কাজকর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন কিংবা দেশ পরিচালনায় অন্য ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি চাইতে পারেন। একই ভাবে, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার অর্থই যে স্বাধীন প্যালেস্টাইনি রাষ্ট্রকে সমর্থন করা অথবা মৌলিক ভাবে বামপন্থার দিকে সরে যাওয়া, তা নয়।

তিন বছর আগে ইজরায়েলের অন্যতম বড় রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল নেতানিয়াহুর প্রস্তাবিত বিচারব্যবস্থার ‘সংস্কার’। তার বিরুদ্ধে বিপুল মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামলা ও তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে বিষয়টি পিছনের সারিতে চলে গেলেও, ২০২৫ সালের মার্চে সরকার এমন একটি আইন পাশ করাতে সক্ষম হয়, যা বিচারপতি নিয়োগের উপরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। এই ‘সংস্কার প্যাকেজ’-এর আর একটি অংশে এমন আইন আনার প্রস্তাব রয়েছে, যার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট কোনও আইন বাতিল করলেও ইজরায়েলের সংসদ, নেসেট, তা পুনর্বহাল করতে পারবে। সেই প্রস্তাব এখনও পাশ হয়নি।

ইজরায়েলি গবেষণা সংস্থা মিতভিমের বিশ্লেষক ইয়োনাতান টুভাল বলেন, “আইজেনকটের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে, তার শরিক যে দলগুলিই হোক না কেন, বর্তমান সরকারের সঙ্গে তার উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকবে। বিশেষত দক্ষ ও পেশাদার প্রশাসন ফিরিয়ে আনা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী করা এবং বছরের পর বছর ধরে চলে আসা স্বজনপোষণ, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ধারা উল্টে দেওয়ার ক্ষেত্রে।”

বিদেশনীতির প্রশ্নে টুভালের মতে, ইরানে “বাস্তবে অর্জনযোগ্য নিরাপত্তার লক্ষ্য এবং অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী সামরিক অভিযানের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ফারাক করার ক্ষেত্রে” এমন সরকার আরও সংযত হতে পারে। গাজার ক্ষেত্রে তারা “সামরিক সাফল্যকে এমন রাজনৈতিক বন্দোবস্তে রূপান্তরিত করতে বেশি আগ্রহী হতে পারে, যার ফলে ইজরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার এবং পুনর্গঠনের পথ খুলবে।”

পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হিংসাত্মক কার্যকলাপ কতটা বিনা শাস্তিতে চলতে দেওয়া হবে, তা নিয়েও ইজরায়েলের ডান ও বাম শিবিরের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

টুভাল বলেন, আইজেনকটের সরকার “সম্ভবত বসতি স্থাপনকারীদের হিংসায় রাশ টানবে এবং সরাসরি ভূখণ্ড দখল করে ইজরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করবে। তবে বসতিগুলির প্রতি সমর্থন এবং স্বাধীন প্যালেস্টাইনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা বজায় রাখবে।”

আরব দলগুলির ভূমিকা কেন শুধু সরকার গড়ার অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়?

আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলির নির্বাচনী ফল কেবল পরবর্তী সরকার কে গড়বে, তা-ই নির্ধারণ করবে না। ইজরায়েলের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলি আরব নাগরিকদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতার বৈধ অংশীদার হিসাবে মেনে নিতে প্রস্তুত কি না, সেই প্রশ্নেরও পরীক্ষা হবে। ফলে তাদের ভূমিকা জোট গঠনের চেনা পাটিগণিতের চেয়ে অনেক বড়।

ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা এবং ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রাক্তন উপপ্রধান ইয়াইর গোলান বুধবার বলেন, পরিবর্তনের সরকার গড়তে বিরোধীদের উচিত আরব দলগুলির সঙ্গে কাজ করা। এক্স-এ একটি পোস্টে তিনি লেখেন, “নেতানিয়াহু হেরেছেন। আমি ১২০ পর্যন্ত গুনতে জানি। ৬৫ সংখ্যাটি ৫৫-র চেয়ে বড়। ইজরায়েলের গণতন্ত্র এ ভাবেই চলে। ব্যস। ইহুদি ভোট আর আরব ভোটের মধ্যে নেতানিয়াহুর বর্ণবাদী বিভাজন আমরা আর মেনে নিতে পারি না।”

অন্য দিকে, আরব দলগুলির সঙ্গে হাত মেলানোর বিরুদ্ধে নেতানিয়াহু ইতিমধ্যেই সুর চড়াতে শুরু করেছেন। নির্বাচনী প্রচারের সময়ে তাঁর বিরোধীরাও বলেছিলেন, তাঁরা আরব শিবিরের সঙ্গে হাত মেলাবেন না। ফলে আরব দলগুলির সমর্থনে সরকার গঠিত হলে তা এক দিকে হবে ইজরায়েলের আরও বর্জনমূলক রাষ্ট্রভাবনার প্রত্যাখ্যান; অন্য দিকে, সেই সরকারকে নিজের সমর্থক ভোটারদের চাপও সামলাতে হবে।

টুভাল বলেন, “বিরোধী জোট ‘বিবিবাদ’, অর্থাৎ নেতানিয়াহুকেন্দ্রিক রাজনীতিকে উৎখাত করার লক্ষ্যে ব্যর্থ হয়েছে। তবু তারা নেতানিয়াহুর জোটের আসনসংখ্যা ৬৪ থেকে ৫৫ বা ৫৬-তে নামিয়ে আনতে পেরেছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য যথেষ্ট নয়। নেসেট, বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যম কিংবা অন্য ক্ষেত্রে নিজের জোটের জোরে নেতানিয়াহু আর যা খুশি করতে পারবেন না। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী জোটকে এখন বাস্তব সাফল্য অর্জন করতে হবে। তা না হলে তাদের ব্যর্থতা এক ঐতিহাসিক পরাজয়ে পরিণত হবে।”

পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে, তা জানতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে কেন?

ইজরায়েলে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি নির্বাচিত হন না। ভোটাররা নেসেটের ১২০ জন সদস্যকে নির্বাচিত করেন। সরকারকে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থা অর্জন করতে হয়। নির্বাচিত দলগুলির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে রাষ্ট্রপতি এমন এক জন নেসেট সদস্যকে সরকার গড়ার দায়িত্ব দেন, যাঁর সফল হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে তিনি মনে করেন। সবচেয়ে বড় দল হলেই স্বয়ংক্রিয় ভাবে সরকার গড়ার অধিকার পাওয়া যায় না।

সরকার গঠনের জন্য আইনে কয়েকটি পর্যায় নির্দিষ্ট করা রয়েছে।

প্রথমে ২৮ দিন: যে নেসেট সদস্য সরকার গঠনের দায়িত্ব পান, তাঁর হাতে থাকে ২৮ দিন। রাষ্ট্রপতি চাইলে আরও সর্বাধিক ১৪ দিন সময় দিতে পারেন। অর্থাৎ প্রথম দফায় মোট ৪২ দিন পর্যন্ত সময় পাওয়া সম্ভব।

দ্বিতীয় চেষ্টা: প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রপতি অন্য কোনও নেসেট সদস্যকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দিতে পারেন। তিনি পাবেন ২৮ দিন। এই দফায় সময় বাড়ানোর সুযোগ নেই।

শেষ সুযোগ: দ্বিতীয় চেষ্টাও ব্যর্থ হলে, অথবা রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন সরকার গঠনের আর কোনও সম্ভাবনা নেই, তা হলে নেসেট সদস্যরা ২১ দিন সময় পান। এই সময়ের মধ্যে তাঁরা সরকার গড়তে ইচ্ছুক অন্য কোনও সদস্যকে দায়িত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানাতে পারেন। এমন অনুরোধ জমা পড়লে সংশ্লিষ্ট সদস্য সরকার গড়ার জন্য ১৪ দিন পাবেন।

নতুন নির্বাচন: কোনও অনুরোধ জমা না পড়লে কিংবা শেষ চেষ্টাও ব্যর্থ হলে, ধরে নেওয়া হবে নেসেট নিজেকে ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে ক্ষেত্রে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন করতে হবে।

এগুলি পরপর কয়েকটি পৃথক পর্যায়। জোট গঠনের আলোচনার জন্য একটানা ৯০ দিনের কোনও একক সময়সীমা নেই। আলোচনা ব্যর্থ হলে গোটা প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত আর একটি নির্বাচনের দিকে গড়াতে পারে। নতুন সরকার গঠিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত নেতানিয়াহুর বিদায়ী সরকারই তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসাবে কাজ চালিয়ে যাবে।