২৭ অক্টোবর মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে পশ্চিমবঙ্গের দুই জেলায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন খুনের মামলায় অভিযুক্ত দু’জন। উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় নিহত হন ২৩ বছরের প্রহ্লাদ দাস। এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। অন্য দিকে, মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে নিহত হন ৩৫ বছরের সামিউল শেখ। তাঁর বিরুদ্ধে এক বিজেপি কর্মীকে খুনের অভিযোগ ছিল।

পুলিশের বক্তব্য, দু’টি ‘এনকাউন্টার’ই ঘটেছে অপরাধের ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময়। উভয় ক্ষেত্রেই পুলিশের দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তি পুলিশকর্মীর সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নিয়ে আধিকারিকদের লক্ষ্য করে গুলি চালান। এর পরে পুলিশের পাল্টা গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়।

এর আগে জুলাইয়ে বারুইপুরেও প্রায় একই বিবরণ দিয়েছিল পুলিশ। সেখানে ১২ বছরের এক বালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডল ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় নিহত হন। পুলিশের দাবি ছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তি পুলিশকর্মীদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে পুলিশের ‘এনকাউন্টারে’ পাঁচ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিন জনের বিরুদ্ধে খুনের এবং দু’জনের বিরুদ্ধে নাবালিকাদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ছিল।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই ‘এনকাউন্টার’গুলি নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেননি। তিনি বলেছেন, বিষয়টি পুলিশ-সিআইডি খতিয়ে দেখছে। তবে সঙ্গে সঙ্গেই তিনি যোগ করেছেন, “কয়েকটা দিন যেতে দিন। গোটা রাজ্যকে গুন্ডামুক্ত করে দেব।”

২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন এই বিজেপি নেতা বলেছিলেন, তাঁর দল রাজ্যে ক্ষমতায় এলে মহিলাদের যৌন নির্যাতনে অভিযুক্তদের আদালতে তোলা হবে না। শুভেন্দুর কথায়, “সকালে জমা করব, বিকেলে খরচ করে দেব।”

অপরাধ দমনে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের পদ্ধতির প্রশংসা প্রায়ই করেছেন শুভেন্দু এবং রাজ্যের অন্য বিজেপি নেতারা। পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক ‘এনকাউন্টার’-মৃত্যুগুলির পরে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে এ রাজ্যও কি উত্তরপ্রদেশের পথ অনুসরণ করতে চাইছে?

শুভেন্দুর মন্ত্রিসভার সদস্য তথা পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি দিলীপ ঘোষ মনে করিয়ে দিয়েছেন, রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে ‘এনকাউন্টারের যোগী মডেল’ চালু করা হবে—বিগত কয়েক বছর ধরে তাঁরা বারবার এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

সামাজিক মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি লিখেছে, “পশ্চিমবঙ্গে এখন প্রকৃত অর্থেই নাগরিকদের সরকার রয়েছে। এর অর্থ, ধর্ষক ও তোলাবাজদের প্রতি বিন্দুমাত্র দয়া নয়। প্রথমে বারুইপুর, এ বার গাইঘাটা! যারা নারীর মর্যাদাহানি করে, তাদের জন্য এটিকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা বলে ধরে নিন—এ নিয়ে কোনও আপস হবে না!”

রাজ্যের বিরোধী দলগুলি এই ঘটনাগুলির সমালোচনা করে বলেছে, পুলিশের কাজ চটজলদি বিচার করা নয়, আইনের শাসন নিশ্চিত করা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামী তথা বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, “এনকাউন্টার প্রচার পাওয়ার উপায় হতে পারে। কিন্তু দেশে তো আইনের শাসন থাকা উচিত।”

সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম ঘটনাগুলিকে ‘সাজানো এনকাউন্টার’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি সরকারের আমলে অপরাধ এবং দলবদ্ধ হিংসার ঘটনা ব্যাপক ভাবে বেড়েছে।

অন্য দিকে, কংগ্রেস নেতা তথা প্রাক্তন সাংসদ অধীররঞ্জন চৌধুরী প্রশ্ন তুলেছেন পুলিশের দক্ষতা নিয়ে। অভিযুক্তরা যদি বারবার পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে নিতে পারে, তা হলে পুলিশ কতটা সক্ষম?

অধীর বলেছেন, “পশ্চিমবঙ্গের পুলিশের যদি নিজেদের বন্দুক খাপে সুরক্ষিত রাখার সাহস বা প্রশিক্ষণ না থাকে, আর কোনও অপরাধী যদি একই ভাবে বারবার পুলিশের রিভলভার ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালাতে পারে, তা হলে কি আমরা রাজ্যের পুলিশকে দক্ষ বলে মনে করব? নাকি তাদের নতুন করে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ভাবব?”

নাগরিক অধিকার রক্ষার সংগঠনগুলিও সাম্প্রতিক ‘এনকাউন্টার’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি বা এপিডিআর-এর রণজিৎ শূর এই ঘটনাগুলির পরিস্থিতিকে “সন্দেহজনক” বলেছেন। তাঁর প্রশ্ন, গাইঘাটার অভিযুক্তকে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য মাঝরাতে বাইরে নিয়ে যাওয়া হল কেন? অভিযোগ অনুযায়ী, তখন তাঁর হাতও বাঁধা ছিল না কেন?

২৩ বছরের ওই অভিযুক্তের মা-ও একই প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর ছেলের হাত বাঁধা ছিল।

সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ নিশ্চিত করে, রাষ্ট্র খেয়ালখুশিমতো কোনও মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে না। জীবনের অধিকারের মধ্যে মানবিক মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ পুলিশের পদক্ষেপকে কঠোর ভাবে আইনের সীমার মধ্যে থাকতে হবে; তা শাস্তি দেওয়ার হাতিয়ার হতে পারে না।

প্রকৃত আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই কেবল পুলিশ প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। আত্মরক্ষার এই অধিকার বর্তমানে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩৪ থেকে ৪৪ নম্বর ধারায় রয়েছে। তবে আত্মরক্ষার দাবি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। অন্য যে কোনও ব্যক্তির মতোই পুলিশকর্মীর বলপ্রয়োগও বিপদের মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩৭(২) ধারা অনুযায়ী, আত্মরক্ষার জন্য যতটা ক্ষতি করা প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করার অধিকার কোনও অবস্থাতেই আত্মরক্ষার অধিকারের আওতায় পড়ে না।

২০১৪ সালের ‘পিপল্‌স ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ (পিইউসিএল) বনাম মহারাষ্ট্র রাজ্য’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দেয়, পুলিশের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অনুমোদনযোগ্য নয়। সর্বোচ্চ আদালত এ বিষয়ে ১৬টি বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা নির্ধারণ করে। সংবিধানের ১৪১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এই নির্দেশিকাগুলির আইনের সমান বাধ্যতামূলক ক্ষমতা রয়েছে।

এই নির্দেশিকাগুলির মধ্যে রয়েছে এফআইআর দায়ের, স্বাধীন তদন্ত, বাধ্যতামূলক ভাবে প্রমাণ সংগ্রহ, ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের অনুসন্ধান এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলিকে অবহিত করা।

ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা, ২০২৩-এর ১৯৬(২) ধারা অনুযায়ী, পুলিশ হেফাজতে কিংবা ম্যাজিস্ট্রেট বা আদালত অনুমোদিত অন্য কোনও হেফাজতে কারও মৃত্যু হলে, কেউ নিখোঁজ হলে অথবা ধর্ষণের অভিযোগ উঠলে, সংশ্লিষ্ট এলাকার এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে স্বাধীন অনুসন্ধান বাধ্যতামূলক।

গাইঘাটার ‘এনকাউন্টার’-এর বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গ মানবাধিকার কমিশন গ্রহণ করেছে। ২৭ অক্টোবর কমিশনের সদস্য বিচারপতি মধুমতী মিত্রের প্রস্তাবের ভিত্তিতে চেয়ারম্যান, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আই পি মুখোপাধ্যায়, বনগাঁ পুলিশ জেলার পুলিশ সুপারকে ৬ নভেম্বরের মধ্যে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ঘটনাসংক্রান্ত সমস্ত প্রমাণ সংরক্ষণ করতেও বলেছেন তিনি।

অপরাধের ঘটনার পুনর্নির্মাণের অজুহাতে অভিযুক্তদের প্রকাশ্যে হাঁটানো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দল ও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলি। বিভিন্ন ঘটনায় অভিযুক্তদের অর্ধনগ্ন অবস্থায়, এমনকি শুধু অন্তর্বাস পরিয়েও রাস্তায় ঘোরানোর অভিযোগ উঠেছে।

বেহালার সরশুনায় ১৩ বছরের এক কিশোরীকে চুম্বন করার অভিযোগে ১৮ বছরের এক তরুণকে ‘শাস্তি’ দিতে ওই কিশোরীর পরিবারের সদস্যরা ওই তরুণ, তাঁর বাবা এবং তাঁর এক বন্ধুকে বন্দুক দেখিয়ে নগ্ন অবস্থায় হাঁটতে বাধ্য করেন। তার দু’দিন পরে, ২৭ অক্টোবর, কলকাতা পুলিশ ওই ঘটনায় অভিযুক্ত তিন জনকে একই জায়গায় খালি গায়ে এবং খালি পায়ে হাঁটায়। পুলিশের বক্তব্য ছিল, তারা “ঘটনার পুনর্নির্মাণ” করছে।

এর আগেও হাওড়া, কলকাতা এবং রাজ্যের অন্য অংশ থেকে অভিযুক্তদের প্রকাশ্যে হাঁটানোর একাধিক খবর সামনে এসেছিল। শুধু কোমরে দড়ি বেঁধেই নয়, গেঞ্জি ও অন্তর্বাস পরিয়েও তাঁদের ঘোরানো হয়েছে বলে অভিযোগ। রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এই গ্রেফতারিগুলি হয়েছে। যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই তোলাবাজির একাধিক অভিযোগ ছিল।

২০২৬ সালের ৫ জুন কলকাতা হাই কোর্ট পর্যবেক্ষণ করেছিল, কোনও ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে তাঁর বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া চালানোর ক্ষমতা রাষ্ট্রের রয়েছে। কিন্তু তাঁকে অপমানিত করার অধিকার রাষ্ট্রের নেই।

আদালত বলেছিল, “পুলিশ… আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। দোষী সাব্যস্ত হলে তার ফাঁসিও হতে পারে। কিন্তু গ্রেফতারের নামে ইচ্ছাকৃত ভাবে অভিযুক্তের মানহানি করা যায় না।”