জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় নির্বাচিত ছাত্রসংসদ ফিরিয়ে আনার দাবিতে চলা আন্দোলনের মধ্যে সম্প্রতি পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এই কমিটির কাজ ছাত্রসংসদের সংবিধানের খসড়া তৈরি করা। ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচিত ছাত্রপ্রতিনিধিত্ব ফিরিয়ে আনার দাবিতে গত ১২ অক্টোবর থেকে আন্দোলন শুরু হয়েছে।

সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন জুবাইর মিনাইয়ের নেতৃত্বাধীন কমিটি খতিয়ে দেখবে, কেন ছাত্রসংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি, এ-সংক্রান্ত আদালতের রায় এবং ২০০৬ সালের লিংডো কমিটির সুপারিশও পর্যালোচনা করবে তারা।

কেন তৈরি হয়েছিল লিংডো কমিটি

২০০৫ সালের ১২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রককে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়। শিক্ষাঙ্গনের রাজনীতিতে হিংসা, অর্থবল এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়গুলি পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিল আদালত।

ছাত্রনির্বাচনের অপরাধীকরণ, নির্বাচনী অর্থব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, খরচের ঊর্ধ্বসীমা এবং প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতার মাপকাঠি খতিয়ে দেখাই ছিল কমিটির প্রধান কাজ। নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি ন্যায্য হয়েছে কি না, প্রার্থীদের যোগ্যতা নিয়ে আপত্তি কিংবা নির্বাচনী বিধি না মানার অভিযোগ—এসব বিরোধের নিষ্পত্তির জন্য একটি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার কথাও বিবেচনা করেছিল কমিটি।

এর তাৎক্ষণিক পটভূমিতে ছিল কেরলের একটি বিরোধ। কলেজগুলিতে সরাসরি ছাত্রনির্বাচন করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল কলেজ অধ্যক্ষদের সংগঠন। বিশৃঙ্খলা ও হিংসার আশঙ্কায় অধ্যক্ষরা পরোক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা চাইছিলেন। ২০০৪ সালে কেরল হাই কোর্ট তাঁদের অবস্থানের পক্ষে রায় দেয়। সেই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে কেরল বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জে এম লিংডোর নেতৃত্বে গঠিত হয় কমিটি। এর রিপোর্টের তারিখ ২০০৬ সালের ২৩ মে।

নির্বাচনের পদ্ধতি ও সময়

কমিটি জানায়, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলিতে সাধারণভাবে ছাত্রসংসদের নির্বাচন হওয়া উচিত। কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা অসম্ভব হলে ছাত্রপ্রতিনিধি মনোনীত করা যেতে পারে। তবে সেটি কেবল সাময়িক ব্যবস্থা। পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলিকে যথাযথ নির্বাচনব্যবস্থায় পৌঁছনোর কথা বলা হয়েছিল।

প্রতিষ্ঠানগুলি সরাসরি নির্বাচন, পরোক্ষ নির্বাচন অথবা দুই পদ্ধতির মিশ্র ব্যবস্থা বেছে নিতে পারে। একটি ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ ছোট বিশ্ববিদ্যালয়গুলির জন্য সরাসরি নির্বাচনের সুপারিশ করে কমিটি। অন্য দিকে, একাধিক ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে থাকা বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে পরোক্ষ নির্বাচনব্যবস্থার পরামর্শ দেওয়া হয়।

প্রতি বছর শিক্ষাবর্ষ শুরুর ছয় থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচন হওয়া উচিত। মনোনয়ন থেকে ফল ঘোষণা—প্রচার-সহ গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়া দশ দিনের বেশি চলতে পারবে না।

কারা লড়তে পারবেন

স্নাতক স্তরের পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বয়সসীমা ১৭ থেকে ২২ বছর। তবে চার বা পাঁচ বছরের পেশাভিত্তিক পাঠক্রমের পড়ুয়াদের জন্য এই সীমা শিথিল করা যেতে পারে। স্নাতকোত্তর স্তরে সর্বোচ্চ বয়স ২৪ বা ২৫ বছর এবং গবেষক পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে ২৮ বছর পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ রাখা হয়।

যে বছর কোনও পড়ুয়া নির্বাচনে লড়বেন, সে বছর তাঁর আগের কোনও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বাকি থাকলে চলবে না। উপস্থিতির হার হতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত ন্যূনতম হার অথবা ৭৫ শতাংশের মধ্যে যেটি বেশি, অন্তত ততটা। তবে নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য পরীক্ষায় ন্যূনতম কত নম্বর পেতে হবে, এমন কোনও শর্ত কমিটি দেয়নি।

প্রার্থীদের নিয়মিত, পূর্ণসময়ের পড়ুয়া হতে হবে। তাঁদের বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী অপরাধের রেকর্ড থাকা চলবে না এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকা চলবে না। একজন পড়ুয়া ছাত্রসংসদের পদাধিকারীর পদে একবার এবং কার্যনির্বাহী সদস্য পদে দু’বার প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পাবেন।

খরচ, দলীয় প্রভাব ও প্রচার

প্রত্যেক প্রার্থীর নির্বাচনী খরচের সর্বোচ্চ সীমা ধার্য করা হয় ৫,০০০ টাকা। এই অর্থ কেবল পড়ুয়াদের স্বেচ্ছায় দেওয়া চাঁদা থেকেই সংগ্রহ করা যাবে। ফল ঘোষণার দু’সপ্তাহের মধ্যে প্রার্থীদের খরচের হিসাব জমা দিতে হবে। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে সেই হিসাব দু’দিনের মধ্যে প্রকাশ করতে হবে। কোনও প্রার্থী হিসাব জমা না দিলে অথবা নির্ধারিত সীমার বেশি খরচ করলে তাঁর নির্বাচন বাতিল হবে।

কমিটির অভিমত ছিল, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছাত্রসংগঠনগুলি ক্যাম্পাসের নির্বাচনকে দলীয় রাজনীতির প্রভাবে নিয়ে আসে এবং পড়ুয়াদের পরস্পরবিরোধী গোষ্ঠীতে ভাগ করে দেয়। কমিটি সুপারিশ করে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নথিভুক্ত পড়ুয়া নন, এমন কেউ কোনও ভূমিকাতেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন না। এই বিধি ভাঙলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিপদও বাতিল হতে পারে।

কমিটি একটি নির্বাচনী আচরণবিধিও তৈরি করে। তাতে জাতপাত বা ধর্মীয় আবেগের ভিত্তিতে ভোট চাওয়া, ঘুষ দেওয়া, ভয় দেখানো, সম্পত্তির ক্ষতি করা, ক্যাম্পাসের বাইরে প্রচার চালানো এবং লাউডস্পিকার ও যানবাহন ব্যবহার—সবই নিষিদ্ধ করা হয়।

ছাপানো পোস্টার ও প্রচারপত্রও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অনুমতি ছিল কেবল হাতে তৈরি পোস্টারের। পরে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে করা আবেদনের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট ফটোকপি করা প্রচারপত্র ও নির্বাচনী ইস্তাহার ব্যবহারের অনুমতি দেয়। তবে সে ক্ষেত্রেও মোট খরচ ৫,০০০ টাকার সীমার মধ্যে রাখতে হবে।

অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা

নির্বাচন-সংক্রান্ত অভিযোগ জানাতে হবে একটি অভিযোগ নিষ্পত্তি সেলে। তার প্রধান থাকবেন ছাত্রকল্যাণ বিভাগের ডিন অথবা ছাত্রবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক। ফল ঘোষণার তিন সপ্তাহের মধ্যে পড়ুয়ারা অভিযোগ জানাতে পারবেন। অভিযোগ পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেলকে হয় তা খারিজ করতে হবে, নয়তো শুনানি ডাকতে হবে। সেলের সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কাছে আপিল করা যাবে।

কমিটি এ-ও সতর্ক করেছিল যে, রাজ্যের আইন তার সুপারিশ কার্যকর করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ১৯৯৪ সালের মহারাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় আইনের কথা উল্লেখ করা হয়। ওই আইন মহারাষ্ট্রে ছাত্রনির্বাচন নিষিদ্ধ করেছিল।

সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান

২০০৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট লিংডো কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করে। আদালত জানায়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দেশের সমস্ত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে এই সুপারিশগুলি অনুসরণ করতে হবে।

চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি লিংডো কমিটির ২০০৬ সালের রিপোর্ট কার্যকর করার নির্দেশ চেয়ে দায়ের করা একটি আবেদন খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট। ওই রিপোর্ট দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন পরিচালনার নিয়ন্ত্রক কাঠামো নির্ধারণ করেছে। শিক্ষার মান বজায় রেখে ক্যাম্পাসের রাজনীতি থেকে অর্থবল ও পেশিশক্তির প্রভাব দূর করাই ছিল তার উদ্দেশ্য।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ আবেদনটি গ্রহণ করতে অস্বীকার করে জানায়, এর সারবত্তা নেই। এর আগেই সর্বোচ্চ আদালত কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করে দেশের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের জন্য তা বাধ্যতামূলক করেছিল।