বিভিন্ন রাজ্যে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিধান পরিষদের নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় এই ভোটের ফলকে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কোনও দল সব আসনে জিতলেও, কিংবা একেবারে মুছে গেলেও, তা থেকে বলা যায় না যে সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই দলের সমর্থন বাড়ছে বা কমছে। কারণ, এই নির্বাচনের ভোটাররা সামগ্রিক ভোটারসমাজের একটি বিশেষ অংশ। লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের ভোটারদের সঙ্গে এই নির্বাচকমণ্ডলীকে এক করে দেখা যায় না। যে রাজ্যে সাত কোটিরও বেশি নথিভুক্ত ভোটার বিধানসভা নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করেন, সেখানে বিধান পরিষদের এই ভোটে অংশ নেন তাঁদের একটি ছোট অংশমাত্র।

উত্তরপ্রদেশে ১১টি নির্বাচনী কেন্দ্রে ভোট হয়েছে। বিহারে ভোট হয়েছে আটটি আসনে। মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকে ভোট হয়েছে যথাক্রমে পাঁচটি ও চারটি কেন্দ্রে।

বিধান পরিষদ হল রাজ্য আইনসভার উচ্চকক্ষ। দেশের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে মাত্র ছ’টিতে এই পরিষদ রয়েছে—উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলঙ্গানা। বিধান পরিষদের সদস্যসংখ্যা সংশ্লিষ্ট বিধানসভার সদস্যসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি হতে পারে না। আবার তা কখনও ৪০-এর কমও হতে পারে না। এটি একটি স্থায়ী কক্ষ, যা ভেঙে দেওয়া যায় না। সদস্যদের মেয়াদ ছ’বছর। প্রতি দু’বছর অন্তর এক-তৃতীয়াংশ সদস্য অবসর নেন। ফলে সব আসনে একসঙ্গে ভোট হয় না; নির্বাচন হয় পর্যায়ক্রমে।

বিধান পরিষদে সদস্য হওয়ার পাঁচটি পথ রয়েছে। এক-তৃতীয়াংশ সদস্য নির্বাচিত হন বিধায়কদের ভোটে। আরও এক-তৃতীয়াংশ নির্বাচিত হন পুরসভা ও জেলা বোর্ডের মতো স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার প্রতিনিধিদের ভোটে। এক-দ্বাদশাংশ নির্বাচিত হন স্নাতকদের ভোটে এবং আরও এক-দ্বাদশাংশ শিক্ষকদের ভোটে। বাকি এক-ষষ্ঠাংশ সদস্যকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশিষ্ট অবদানের ভিত্তিতে মনোনীত করেন রাজ্যপাল। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে একক হস্তান্তরযোগ্য ভোটপদ্ধতিতে গোপন ব্যালটে ভোট হয়। ভোটাররা পছন্দের ক্রম অনুযায়ী প্রার্থীদের সাজান। গণনার সময় জয়ের জন্য নির্ধারিত ভোটের কোটা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভোট বা বাদ পড়া প্রার্থীর ভোট অন্য প্রার্থীর কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে ফল নির্ধারিত হয়।

স্নাতক ও শিক্ষক নির্বাচনী কেন্দ্রগুলি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা নিয়ে গঠিত। নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। স্নাতক ভোটার হওয়ার জন্য অন্তত তিন বছর আগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করতে হয়। শিক্ষক ভোটার হওয়ার জন্য মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা তার উচ্চতর কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত তিন বছর শিক্ষকতা করতে হয়। উভয় ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় বসবাস বা কাজ করার শর্ত রয়েছে। কারও নামই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার তালিকায় ওঠে না। পৃথক ভোটার তালিকায় নাম তুলতে প্রত্যেককে আবেদন করতে হয়। এই কারণেই এই নির্বাচকমণ্ডলী এত ছোট। বিধান পরিষদের ক্ষমতাও সীমিত। অর্থবিলের উপর ভোট দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। সাধারণ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও পরিষদের সুপারিশ অগ্রাহ্য করতে পারে বিধানসভা। ফলে রাজ্যে কে সরকার গড়বে, সে সম্পর্কে এই নির্বাচনের ফল বিশেষ কিছু বলে না।

এই ফল থেকে কোনও দলের সামগ্রিক নির্বাচনী শক্তির সরাসরি বিচার করা না গেলেও, বিভিন্ন দলের ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য আলাদা করে বোঝা প্রয়োজন। দলের সংগঠন কীভাবে কাজ করছে এবং তার শক্তি কতটা, তার কিছুটা আভাস এই ভোটে পাওয়া যায়। এই আসনগুলিতে জিততে হলে উপযুক্ত প্রার্থী বাছতে হয়, কয়েক মাস আগে থেকে ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করাতে হয় এবং ছোট এই নির্বাচকমণ্ডলীকে ভোট দিতে নিয়ে আসতে হয়। এগুলি দলীয় সংগঠনের কাজ; কোনও জনসমর্থনের ঢেউয়ের ফল নয়।

নাগপুরে একটি আসনে জিতে কংগ্রেস কিছুটা সংবাদশিরোনামে এসেছে এবং জয়ের খাতা খুলেছে। কিন্তু এই নির্বাচন থেকে দলটির শিক্ষা নেওয়া উচিত। কারণ, কর্নাটকের মতো রাজ্যে ক্ষমতায় থেকেও সেখানে তারা একটি আসনও জিততে পারেনি। বিজেপি–জেডি(এস) জোট চারটি আসনেই জিতেছে। কংগ্রেসের ঝুলি শূন্য। রাজ্যে ক্ষমতাসীন কোনও দলের হাতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা, দলীয় কর্মীবাহিনী এবং স্থানীয় যোগাযোগ থাকার কথা। সেই সুবাদে অন্তত একটি বা দু’টি আসন জেতার প্রত্যাশা থাকে। তা-ও না পারা থেকে মনে হয়, বেঙ্গালুরুতে সরকারের অবস্থান এবং মাটির কাছাকাছি স্তরে দলের সাংগঠনিক উপস্থিতির মধ্যে একটি ফাঁক রয়েছে। কংগ্রেস নেতারা যুক্তিসঙ্গতভাবেই বলতে পারেন, এই ফল সরকারের কাজকর্মের উপর রায় নয়। কিন্তু যে রাজ্যে দল ক্ষমতায়, সেখানে বিরোধীরা সব আসন জিতে নেবে—এমন ফল নেতৃত্ব উড়িয়ে দিতে পারে না।

২৮টি আসনের মধ্যে ১৪টি জেতার সাফল্য বিজেপি উদ্‌যাপন করতেই পারে। এই ফল বিভিন্ন রাজ্যে দলটির সাংগঠনিক শক্তির পরিচয় দেয়। তবে বিজেপির উদ্বেগের জায়গা হল, স্নাতক ভোটারদের নির্বাচনী কেন্দ্রগুলি দীর্ঘদিন ধরেই তাদের শক্ত ঘাঁটি। লোকনীতি–সিএসডিএস পরিচালিত ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন সমীক্ষার ভোট-পরবর্তী সমীক্ষা অনুযায়ী, স্নাতক ও তার বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন ভোটারদের মধ্যে বিজেপি একাই পেয়েছিল ৩৮ শতাংশের সমর্থন। এনডিএ-র ক্ষেত্রে তা ছিল ৪৫ শতাংশ। অন্য সব দল ও জোটের তুলনায় এই সমর্থন বেশি ছিল। শিক্ষিত ও শহুরে ভোটারদের উপর যে দল দীর্ঘদিন ধরে ভরসা করে এসেছে, সেই সমর্থনের ভিত পাতলা হতে দেখলে তাদের স্বস্তিতে থাকার কথা নয়।

উত্তরপ্রদেশে, বিশেষ করে বারাণসীতে পরাজয় বিজেপির জন্য সতর্কঘণ্টা হওয়া উচিত। আগামী বছরই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। আর ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে ধাক্কা খাওয়ার চড়া মূল্য বিজেপিকে জাতীয় স্তরে দিতে হয়েছে। বারাণসী প্রধানমন্ত্রীর নিজের নির্বাচনী এলাকা। ফলে এই ভোটের গুরুত্ব সীমিত হলেও পরাজয়ের প্রতীকী তাৎপর্য উপেক্ষা করা কঠিন। যে উত্তরপ্রদেশে একসময় বিজেপি প্রায় একতরফা জয় পেয়েছিল, ২০২৪ সালে সেই রাজ্যে আসন হারানোর ফলেই দলটি লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি এবং শরিকদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি বিজেপির পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভোটাররা সরে যাচ্ছেন—এমন যে কোনও ইঙ্গিত দলের নির্বাচনী কৌশল নির্ধারকদের উদ্বিগ্ন করবে। বিজেপি অন্যত্র পাওয়া জয়ের কথা তুলে ধরতে পারে। কিন্তু বারাণসীতে নিজেদের শিবিরের দখলে থাকা আসনে পরাজয় এমন একটি ফল, যা দলের ভিতরে প্রশ্ন তুলবেই।

বিহারে জন সুরাজের জয়ের খাতা খোলাকে সেখানে দলটির সাংগঠনিক শক্তি বাড়ার লক্ষণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিশেষত, সম্প্রতি বিজেপির প্রাধান্য থাকা একটি আসনে দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোরের জয়ের পর এই সাফল্য এসেছে। অগস্টে বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে প্রশান্ত কিশোর বিজেপির নীরজ কুমারকে ১৯,৩২৪ ভোটে হারিয়েছিলেন। ১৯৯৫ সাল থেকে এই আসনে বিজেপি কখনও হারেনি। অথচ ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জন সুরাজ একটিও আসন পায়নি। তিন মাসে দু’টি জয়—একটি বিধানসভা উপনির্বাচনে, অন্যটি বিধান পরিষদের ভোটে—দেখাচ্ছে, দলটি তার প্রচারকে ভোটে রূপান্তরিত করতে পারছে। তবে সাধারণ নির্বাচনে, যেখানে অনেক বড় এবং অনেক বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ ভোটারসমাজের কাছে পৌঁছতে হবে, সেখানেও এই সাফল্য ধরে রাখা যাবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।

এই বিচারে কংগ্রেসের সামনে সংগঠন নিয়ে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। বিজেপির সতর্ক হওয়ার কারণ আছে। আর জন সুরাজের উৎসাহিত হওয়ার কারণ রয়েছে।

এই ফলের যুক্তিসঙ্গত পাঠ তাই সংযত হওয়া উচিত। নির্বাচন বিশ্লেষণের একটি মৌলিক নিয়ম হল, তথ্য যতটা বলছে, তার চেয়ে বেশি অর্থ তার মধ্যে খুঁজে না নেওয়া। বিধান পরিষদের এই নির্বাচন সমগ্র ভোটারসমাজের ইচ্ছার প্রতিফলন নয়। তবে দলীয় সংগঠন কীভাবে কাজ করছে, তা বোঝায়। এই নির্বাচনে জয় দলীয় কর্মীদের মনোবল বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আর যে কোনও রাজনৈতিক দলকে সচল রাখতে কর্মীদের সেই মনোবলের গুরুত্ব যথেষ্ট।