একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে সব সময় যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না। শুধু সেই রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে, শিক্ষকের মর্যাদা মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে, মুক্তচিন্তার কণ্ঠরোধ করেই একটি জাতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া যায়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতায় শিক্ষকসমাজের ওপর সংঘটিত নির্যাতন, অপমান, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়নের ঘটনাগুলো সেই ভয়ংকর আশঙ্কাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
গত ২৬ মাসে বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে অরাজকতা, মব সন্ত্রাস এবং শিক্ষক লাঞ্ছনার সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক অবক্ষয় নয়। বরং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিষ্ক্রিয়তা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবেশ এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা, প্রকাশ্যে অপমান, শারীরিকভাবে হেনস্তা এবং ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করার ঘটনা ঘটেছে। কোথাও শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার হয়নি, বরং মনগড়া অভিযোগ দিয়ে তাঁকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
এ কেমন রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে একজন শিক্ষকের অপরাধ নির্ধারণ করবে উত্তেজিত জনতা? কোথায় আইনের শাসন? কোথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন? কোথায় শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তা?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, এসব ঘটনায় রাষ্ট্রের কার্যকর প্রতিরোধ অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত ছিল। প্রশাসন যখন মবের সামনে নীরব থাকে, তখন সেই নীরবতা নিরপেক্ষতা নয়; তা অপরাধীদের সাহস জোগায়। যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শিক্ষকদের নিশানা করা হয়, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাঁদের সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এই নিপীড়নের দায় কি কেবল মব বাহিনীর, নাকি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতারও?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখলের সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো প্রথমে পুরোনো শিক্ষক ও প্রশাসনকে ভয় দেখানো, তারপর তাঁদের অপসারণ করে নিজেদের অনুগতদের জায়গা করে দেওয়া। বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ঘটনাগুলোতে এমন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অভিযোগ উঠেছে। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উসকানি ও শিক্ষক লাঞ্ছনায় ভূমিকা রাখতে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মিথ্যা মামলা ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ই কাউকে আইনবহির্ভূত নিপীড়নের অধিকার দিতে পারে না।
এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) তাদের ৩ নভেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে কথিত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের শাস্তির মুখোমুখি করার বিষয়টি তুলে ধরেছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যথাযথ তদন্ত, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী।
প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪ জন শিক্ষককে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখা এবং আরও ২৫ জনের পাঠদানের দায়িত্ব সীমিত করার তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও একাধিক শিক্ষককে বরখাস্ত, সাময়িক বরখাস্ত কিংবা দায়িত্ব থেকে সরানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব তথ্য বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রভাব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এখানে একটি মৌলিক সত্য মনে রাখা প্রয়োজন—একজন শিক্ষক আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী হতে পারেন। সেটি তাঁর নাগরিক অধিকার। তিনি কোনো অপরাধে জড়িত থাকলে তদন্ত হবে, বিচার হবে। কিন্তু কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাঁর চাকরি, সম্মান, শিক্ষাদানের অধিকার কিংবা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কেড়ে নেওয়া যায় না। গণতন্ত্রের অর্থ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা নয়; বরং ভিন্নমতকে নিরাপদ রাখার নিশ্চয়তা দেওয়া।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড আমাদের শিখিয়েছে, একটি জাতির মেধা ও মনন ধ্বংস করার পরিকল্পনা কতটা ভয়ংকর হতে পারে। গণহত্যাকারী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগি আল বদর, আল শামস, রাজাকার বাহিনী পরিকল্পিতভাবে শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল সদ্য স্বাধীন হতে যাওয়া বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করে দেওয়া। আজকের ঘটনাকে সেই গণহত্যার সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই, কিন্তু শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের ভয় দেখিয়ে নীরব করার প্রবণতা আমাদের ইতিহাসের ভয়াবহ স্মৃতিকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।
একজন শিক্ষক যখন নিজের শিক্ষার্থীর সামনে অপমানিত হন, তখন তাঁর ব্যক্তিগত সম্মানের পাশাপাশি ভেঙে যায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আস্থার সম্পর্ক। যে হাতের স্পর্শে শিক্ষার্থী প্রথম অক্ষর চিনেছে, সেই হাতকেই যখন অপমানিত করা হয়, তখন সেখানে কেবল একজন শিক্ষকের পরাজয় ঘটে না; পরাজিত হয় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিকতার ভিত্তি।
আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বিপদ শুধু শিক্ষক নির্যাতন নয়; বরং নির্যাতনকে স্বাভাবিক করে তোলার সামাজিক প্রবণতা। রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া, ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রতিহিংসাকে আড়াল করা এবং মবের শক্তিকে আইনের ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই ধ্বংস করে।
এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শিক্ষক নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার, অন্যায়ভাবে অপসারিত শিক্ষকদের পুনর্বহাল, রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলা প্রত্যাহার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে। মব সন্ত্রাসে জড়িত প্রত্যেককে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কোনো রাজনৈতিক দলের নিয়োগকেন্দ্র কিংবা ক্ষমতা দখলের ঘাঁটিতে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন দখল করা যায়, প্রশাসনিক পদ দখল করা যায়, কিন্তু জ্ঞান ও বিবেককে বন্দি করা যায় না। যে রাষ্ট্র শিক্ষকের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সে রাষ্ট্র শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে না। যে সরকার শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, সেই সরকারের কাছে সভ্য সমাজের নৈতিক নেতৃত্ব দাবি করাও কঠিন।
বাংলাদেশ কি তাহলে এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যেখানে শিক্ষককে আগে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষা দিতে হবে, তারপর শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের অনুমতি মিলবে? যেখানে জ্ঞান নয়, পরিচয় নির্ধারণ করবে শিক্ষকের অবস্থান? যেখানে মেধার চেয়ে মবের শক্তি বড় হয়ে উঠবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজই দিতে হবে।
কারণ, একটি জাতির স্বাধীনতা শুধু তার ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয়; তার শিক্ষা, চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও। শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করা তাই কোনো পেশাগত দাবি নয়, এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব, সভ্যতা ও ভবিষ্যৎ রক্ষার সংগ্রাম।
মনে রাখতে হবে, শিক্ষকের কণ্ঠ রুদ্ধ করে কোনো জাতি কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। যে সমাজ শিক্ষকের চোখের জল দেখতে পায় না, একদিন সেই সমাজ নিজের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে হারিয়ে ফেলে।
— এফ এম শাহীন, লেখক, গণমাধ্যমকর্মী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।