খুব অবাক লাগে যখন দেখি, একুশ শতকের এই অবাধ তথ্যপ্রবাহ এবং ডিজিটাল যুগে এসে আমাদের সমাজ কাঠামোর সহনশীলতা কতটা ঠুনকো আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে! প্রযুক্তি আমাদের হাতে গোটা বিশ্বকে এনে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের মনন আর বিবেককে যেন ঠেলে দিয়েছে মধ্যযুগীয় অন্ধকারের দিকে। একটা সাধারণ ফেসবুক পোস্ট, তা সত্যি হোক বা নিছক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব—মুহূর্তের মধ্যে তা উন্মত্ত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। আর সেই গুজবের আগুনে পুড়ছে নিরীহ মানুষের ঘরবাড়ি, কেড়ে নেওয়া হচ্ছে তরতাজা প্রাণ, ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থা।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া একের পর এক ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ও তার জেরে সংঘটিত পাশবিক সহিংসতার ঘটনাগুলো আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। আমি বারবার নিজেকে প্রশ্ন করছি, আমরা কি সত্যিই এক সভ্য, আধুনিক ও সহনশীল সমাজের দিকে এগোচ্ছি, নাকি এক আদিম অন্ধকারের দিকে ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছি?
এড়িয়ে চলার নীতি বনাম রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা
সম্প্রতি দেশের তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ একটি মন্তব্য করেছেন, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিস্তর আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে। তিনি একটি সাক্ষাৎকারে পরামর্শ দিয়েছেন, ধর্ম অবমাননার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে কথা না বলে তা ‘এড়িয়ে চলাই’ উচিত। তার যুক্তি হলো, মানুষের আবেগের বা ধর্মীয় অনুভূতির কোনো নির্দিষ্ট ‘স্ট্যান্ডার্ড’ বা মানদণ্ড নেই। কে কীভাবে কোন কথায় প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা আগে থেকে নির্ধারণ করা অসম্ভব।
একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র বা সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি মন্ত্রীর এই কথার একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি হয়তো কিছুটা বুঝতে পারি; এটা ঠিক যে, আমরা অনেকেই এখনো বুঝতে শিখিনি যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা খুশি তা-ই লিখে দেওয়া যায় না। স্বাধীনতা মানেই স্বেচ্ছাচারিতা নয়। কিন্তু আমার মূল প্রশ্নটি অন্য জায়গায়—একটি গণতান্ত্রিক ও আধুনিক রাষ্ট্রের সমাধান কি কেবলই ‘এড়িয়ে চলা’ হতে পারে? একটা রাষ্ট্র বা প্রশাসন কি কেবল নাগরিকদের এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েই তাদের সাংবিধানিক দায় সারতে পারে?
মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন যে কথাটি বলেছেন, তার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেছেন, বছরের পর বছর ধরে দেশে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেখান থেকে আমরা বের হতে পারছি না। অপরাধীরা খুব ভালো করেই জানে, ধর্ম অবমাননার ধুয়ো তুলে কারও বাড়িতে আগুন দিলে, লুটপাট করলে বা কাউকে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে মারলে খুব সহজে পার পাওয়া যায়। কারণ, উন্মত্ত জনতার কোনো নির্দিষ্ট চেহারা থাকে না, আর রাষ্ট্রও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই উন্মত্ত জনতার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে কুণ্ঠাবোধ করে।
ঐতিহাসিক পুনরাবৃত্তি ও আইনের অপব্যবহার
এই যে গুজবের ভিত্তিতে হামলা, এটি বাংলাদেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। একটু পেছনে ফিরে তাকালেই আমরা ২০১২ সালের কক্সবাজারের রামু ট্র্যাজেডি, ২০১৬ সালের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর হামলা কিংবা ২০২১ সালে কুমিল্লার নানুয়া দীঘির পাড়ের ঘটনার কথা স্মরণ করতে পারি। প্রতিবারই একটি নির্দিষ্ট ছক মেনে ঘটনাগুলো ঘটানো হয়েছে—প্রথমে ফেসবুকে একটি অবমাননাকর পোস্ট বা ছবি (বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফেক বা এডিটেড) ছড়ানো, এরপর মাইকিং করে বা লাইভে এসে সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তোলা এবং শেষে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর বা উপাসনালয়ে সংঘবদ্ধ হামলা।
"রাষ্ট্রীয় আইনের দুর্বলতা ও সাইবার আইনের অপপ্রয়োগই আজ ধর্ম অবমাননার ধুয়ো তোলা অপরাধীদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। আইন এখানে রক্ষকের বদলে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছে।"
সবচেয়ে হতাশাজনক দিক হলো আমাদের আইনি কাঠামোর অপব্যবহার। দেশে সাইবার অপরাধ দমনের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা পরবর্তী সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো কঠোর আইন থাকলেও, সেগুলো প্রকৃত অপরাধীদের দমনের চেয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের ঘটনাটি এর সবচেয়ে বড় ও করুণ প্রমাণ। একজন যুবক, যিনি নিজে একসময় পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি করেছেন, তিনি দেখলেন তার নামে ফেসবুকে ভুয়া আইডি খুলে কে বা কারা আপত্তিকর ও উসকানিমূলক পোস্ট দিচ্ছে। তিনি আগেভাগেই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চাইলেন। অথচ যখন ওই ভুয়া পোস্টকে কেন্দ্র করে গ্রামে উত্তেজনা ছড়াল, তখন পুলিশ প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করার বদলে, সেই ভুক্তভোগী যুবককেই গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠাল!
গুজবের আগুনে পুড়ছে বিবেক: সাম্প্রতিক চিত্র
সম্প্রতি সাতক্ষীরার দেবহাটায় যে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটল, তা যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষকে শিউরে তুলবে। ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবক, যিনি গুরুতর মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছিলেন এবং অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন। বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টার পর যখন তাকে স্থানীয় এক পল্লী চিকিৎসকের চেম্বারে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল, ঠিক তখনই ফজলুল হক আমিনী নামের এক ব্যক্তি ফেসবুক লাইভে এসে তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে লোকজনকে জড়ো হওয়ার উসকানি দেয়। এরপর চিকিৎসারত একজন অসুস্থ মানুষকে উন্মত্ত জনতা পিটিয়ে হত্যা করল!
অন্যদিকে, রংপুরের পীরগঞ্জের চককরিম কাশিমপুর গ্রামের ঘটনাটি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। একটি পুরোনো ভিডিও ছড়ানোর গুজবকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে এক থেকে দেড়শ মানুষের একটি সংঘবদ্ধ দল লাঠিসোঁটা নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে তাণ্ডব চালাল। ৪৮টি হিন্দু পরিবারের মানুষ সেদিন অবর্ণনীয় আতঙ্কের মধ্য দিয়ে রাত কাটিয়েছে।
এই তালিকা এখানেই শেষ নয়। ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার পর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া, নেত্রকোনায় যুবককে গ্রেপ্তার, কিংবা লালমনিরহাটে চুল কাটানোর পর টাকা কম দেওয়া নিয়ে তর্কের জেরে মিথ্যা অভিযোগ তুলে হেনস্থা করা—প্রতিটি ঘটনাই এক সুতোয় গাঁথা। ব্যক্তিগত আক্রোশ, জমি দখল, চাঁদাবাজি বা তুচ্ছ বিরোধ মেটাতে 'ধর্ম অবমাননা'-কে এখন একটি অব্যর্থ মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যানের ভয়াল চিত্র
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দেওয়া পরিসংখ্যানগুলো শুধু কাগজের সংখ্যা নয়, এগুলো আমাদের সামাজিক অবক্ষয় ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার আয়না। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ২৫৭টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। আর হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ মাসে দেশে মোট ২ হাজার ৯৬৩টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৭৩.৭ শতাংশই ঘটেছে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী পাঁচ মাসে।
ঐক্য পরিষদের একটি পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—তারা বলছে, আগের মতো ঢালাও গণআক্রমণের বদলে এখন হামলাগুলো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, উপাসনালয় ও সম্পত্তিকেন্দ্রিক 'নির্যাতনে' রূপ নিয়েছে। অর্থাৎ, এসব হামলার পেছনে ধর্মীয় আবেগের চেয়ে অর্থনৈতিক ফায়দা লোটার উদ্দেশ্যই বেশি কাজ করছে।
অন্ধকারের পথ থেকে ফেরার সুনির্দিষ্ট উপায়
আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, কেবল ধর্মীয় আলোচনা এড়িয়ে গেলেই এই গভীর সামাজিক সংকট মিটবে না। এর জন্য প্রয়োজন কিছু সুনির্দিষ্ট ও কঠোর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ:
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন: ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে মানুষ হত্যা বা বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাগুলোর বিচারের জন্য বিশেষ 'দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল' গঠন করতে হবে। রামু বা নাসিরনগরের মতো বছরের পর বছর বিচার ঝুলে থাকলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলেই এই প্রবণতা কমবে।
পুলিশের জবাবদিহি ও জিরো টলারেন্স: সুনামগঞ্জের মতো কোনো ব্যক্তি যদি ফেক আইডির শিকার হয়ে আগেভাগে জিডি করেন, তবে তাকে গ্রেপ্তার না করে পুলিশকে প্রকৃত আইপি অ্যাড্রেস ট্র্যাক করে মূল অপরাধীকে ধরতে হবে। এই ক্ষেত্রে গাফিলতি প্রমাণ হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করতে হবে।
সাইবার সাক্ষরতা ও জাতীয় সচেতনতা: সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে যে ফেসবুকে যা দেখা যায়, তার সবকিছু সত্য নয়। একটি ছবি বা ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে এডিট করে সমাজে দাঙ্গা বাধানো খুব সহজ। রাষ্ট্রকে শিক্ষাব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের সাহায্যে ব্যাপক ভিত্তিতে ডিজিটাল লিটারেসি ক্যাম্পেইন চালাতে হবে।
কমিউনিটি সম্প্রীতি সেল: প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক এবং যুব সমাজের সমন্বয়ে 'কমিউনিটি সম্প্রীতি সেল' গঠন করতে হবে, যারা যেকোনো গুজবের প্রাথমিক পর্যায়েই মাঠে নেমে পরিস্থিতি শান্ত করতে ভূমিকা রাখবে।
যে সমাজ তার নাগরিকদের, বিশেষ করে দুর্বল ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই সমাজের ভিত্তি কখনোই মজবুত হতে পারে না। একটি রাষ্ট্র যখন উন্মত্ত জনতার কাছে নতিস্বীকার করে, তখন সেই রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। এড়িয়ে চলার নীতি বা আপসকামী মনোভাব নয়, বরং আইনের কঠোর শাসন, দ্রুত বিচারিক দৃষ্টান্ত এবং অসাম্প্রদায়িক মানবিক মূল্যবোধের জাগরণই পারে আমাদের এই অন্ধকারের পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আগুন নিয়ে খেললে সেই আগুনে একদিন নিজেদের ঘরও পুড়বে। সময় থাকতে তাই ঘুরে দাঁড়াতেই হবে।
লেখক পরিচিতি: বাপ্পাদিত্য বসু — রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট। মানবাধিকার এবং সমসাময়িক সামাজিক ইস্যু নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।