“শেখ হাসিনার বিকল্প পেয়ে গেছে আমেরিকা! পর্দার আড়ালে চলছে গ্রুমিং! ডিসেম্বর মাসে মঞ্চের পর্দা উঠবে!”—গোলাম মাওলা রনির এই বক্তব্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার একটি পরিচিত প্রবণতা ধরা পড়ে। কে ক্ষমতায় আসবেন, কে ফিরবেন, বিদেশে কাকে প্রস্তুত করা হচ্ছে—এসব নিয়ে আমাদের আগ্রহ প্রবল। অথচ যাঁদের জন্য রাজনীতি, তাঁদের প্রতিদিনের প্রয়োজন অনেক সময় সেই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

উদ্ধৃত দাবিটির পক্ষে যাচাইযোগ্য প্রমাণ সামনে না এলে সেটিকে রাজনৈতিক অনুমান হিসেবেই দেখতে হবে। আমেরিকা কাকে শেখ হাসিনার ‘বিকল্প’ ভাবছে, আদৌ কাউকে ভাবছে কি না, কিংবা ডিসেম্বরকে ঘিরে কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর ওই বক্তব্য একা দেয় না। একটি আকর্ষণীয় পূর্বাভাস কোনো রাষ্ট্রের নীতির প্রমাণ নয়।

তারপরও এমন বক্তব্য মানুষের কৌতূহল তৈরি করে। কারণ রাজনীতির প্রকাশ্য ঘটনাপ্রবাহের ওপর আস্থা কমলে অদৃশ্য পরিকল্পনার ব্যাখ্যা সহজে জায়গা পায়। মানুষ ভাবতে শুরু করেন, আসল সিদ্ধান্ত হয়তো অন্য কোথাও হচ্ছে। কিন্তু এই ভাবনার একটি বিপদ রয়েছে। দেশের সরকার কী করছে, বিরোধীরা কী প্রস্তাব দিচ্ছে, প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে চলছে—এসবের হিসাব চাওয়ার বদলে আমরা তখন অপেক্ষা করি, পর্দা কখন উঠবে।

সাধারণ মানুষের অবশ্য অপেক্ষা করার সুযোগ সীমিত। ডিসেম্বর আসতে এখনও সময় আছে। বাজার করতে হচ্ছে আজই। বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচও থেমে নেই। তারেক রহমান সরকারের মূল্যায়ন তাই শেষ পর্যন্ত এই দৈনন্দিন জীবনেই ফিরে আসবে। বিদেশি কোনো রাজধানীর কথিত পছন্দ দিয়ে সেই মূল্যায়ন এড়ানো যাবে না।

কোন রাজনীতি মানুষের কাছে জরুরি

বিদেশি শক্তির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা অপ্রয়োজনীয় নয়। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য রপ্তানিবাজার, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনো দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং সেই দেশ বাংলাদেশের নেতৃত্ব ঠিক করে দিচ্ছে—এই দুটি ধারণার মধ্যে অনেক দূরত্ব।

একজন রাজনীতিকের বিদেশ সফর, কোনো রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক বা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উপস্থিতি থেকে ক্ষমতার গোপন সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। যোগাযোগের অর্থ জানতে হয় তার বিষয়বস্তু ও ফল দিয়ে। শুধু ছবি বা ইঙ্গিতের ওপর দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিলে পাঠককে তথ্যের বদলে সম্ভাবনার গল্প দেওয়া হয়।

এই ধরনের গল্প সরকার ও বিরোধী—উভয়ের জন্য সুবিধাজনক হয়ে উঠতে পারে। সরকার বাস্তব অসন্তোষের পেছনে বাইরের পরিকল্পনা খুঁজতে পারে। বিরোধীরা নিজেদের দুর্বলতা কাটানোর বদলে বিদেশি সমর্থনের প্রত্যাশা দেখাতে পারে। দুই ক্ষেত্রেই নাগরিকের ভূমিকা ছোট হয়ে যায়।

অথচ রাজনৈতিক নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতার সবচেয়ে স্থায়ী ভিত্তি দেশের মানুষের আস্থা। সেই আস্থা তৈরি হয় কাজ, আচরণ ও জবাবদিহি দিয়ে। বাজারে স্বস্তি নেই, চাকরি অনিশ্চিত, প্রশাসনের কাছে গেলে সমাধান মেলে না—এমন অভিজ্ঞতা জমতে থাকলে বিদেশি সমর্থনের কোনো দাবিই দীর্ঘদিন ভরসা জোগাতে পারে না।

বাজারে স্বস্তি এসেছে কি না

বাজারের পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করতে হলেও শব্দের সংযম প্রয়োজন। ‘সবকিছুর দাম প্রতিদিন বাড়ছে’ বললে ক্ষোভ বোঝানো যায়, কিন্তু অর্থনীতির সঠিক চিত্র পাওয়া যায় না। আবার মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে বলে মানুষের কষ্ট শেষ হয়ে গেছে বলাও সমান বিভ্রান্তিকর।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮.৩৪ শতাংশ। আগস্টে ছিল ৮.২৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.০২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭.২২ শতাংশে উঠেছে। তবে সামগ্রিক হার গত বছরের সেপ্টেম্বরের ৮.৩৬ শতাংশের সামান্য নিচে রয়েছে। মাসের তুলনা এবং বছরের তুলনায় তাই একই ছবি পাওয়া যাচ্ছে না।

এই হিসাব বোঝা জরুরি। মূল্যস্ফীতির হার কমলে সাধারণত দাম বাড়ার গতি কমে; আগের দাম ফিরে আসে না। কয়েক বছর ধরে খরচ বেড়েছে এমন একটি পরিবার নতুন করে কম হারে মূল্যবৃদ্ধির মুখোমুখি হলেও তার পুরনো ক্ষতি পুষিয়ে যায় না।

সরকারের অর্থনৈতিক বক্তব্যে এই বাস্তবতার স্বীকৃতি থাকা প্রয়োজন। পরিসংখ্যান দেখিয়ে মানুষের অভিজ্ঞতাকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করলে উল্টো দূরত্ব বাড়ে। বরং বলতে হবে, কোন ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে, কোথায় চাপ রয়েছে এবং সেই চাপ কমাতে কী করা হচ্ছে।

আয়ের হিসাবে যে ঘাটতি

দামের পাশাপাশি আয়ের হিসাব না দেখলে সংসারের সংকট বোঝা যায় না। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে বিবিএসের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৯ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির নিচে। অবশ্য এই সূচক প্রত্যেক পেশার মানুষের ব্যক্তিগত আয়ের পরিবর্তন প্রকাশ করে না।

কেউ হয়তো কয়েক বছর একই বেতনে কাজ করছেন। কারও কাজ আছে সপ্তাহে চার দিন। কেউ নিয়মিত বেতন পান না। তাঁদের কাছে জাতীয় গড়ের সামান্য উন্নতি অনেক দূরের বিষয়। দৈনিক আয় কমলে কিংবা পরিবারের একজন কাজ হারালে বাজারদর অপরিবর্তিত থাকলেও সংকট বাড়ে।

প্রথমে মানুষ নিজের খরচ কমান। তারপর খাবারের মানে আপস আসে, চিকিৎসা পিছিয়ে যায়, সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু কেনা বন্ধ হয়। বাইরে থেকে সংসারটি স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ক্ষয়ে যেতে থাকে।

এই চাপ সব সময় রাজনৈতিক স্লোগানে প্রকাশ পায় না। বাজারের দোকানে দীর্ঘ দরদাম, পরিচিতজনের কাছে ধার চাওয়া কিংবা মাসের মাঝামাঝি সঞ্চয় ভাঙার মধ্যে তার প্রকাশ ঘটে। সরকারকে সেই নীরব সংকেতও পড়তে হবে। শুধু প্রকাশ্য বিক্ষোভের পরে ব্যবস্থা নিলে অনেক পরিবারের জন্য তত দিনে ক্ষতি হয়ে যায়।

আট মাসে কতটা আশা করা যায়

ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়া সরকারের কাছে আট মাসে বহু বছরের সমস্যা দূর করার দাবি বাস্তবসম্মত নয়। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকি, রাজস্বের সীমাবদ্ধতা ও বিনিয়োগের বাধা নতুন নয়। বর্তমান সরকার এগুলোর সবকিছুর স্রষ্টা নয়—এই কথাটি স্বীকার করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের উন্নয়ন হালনাগাদেও আর্থিক খাত, জ্বালানি ও রাজস্ব ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার কথা এসেছে। সংস্থাটি বলেছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে আরও প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন। পাশাপাশি প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উন্নতিকে ইতিবাচক দিক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

কিন্তু উত্তরাধিকার এবং বর্তমান দায়িত্বের মধ্যে সীমারেখাও আছে। সমস্যাটি পুরনো হলে তার বিরুদ্ধে বর্তমান পদক্ষেপ কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্ন আরও জরুরি হয়। কোন কাজ আগে করা হলো, কোন সিদ্ধান্ত পিছিয়ে গেল, কোথায় জনস্বার্থের বদলে প্রভাবশালীর স্বার্থ রক্ষা পেল—এসবের উত্তর দিতে হবে।

সময় চাওয়া তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন অগ্রগতির চিহ্ন থাকে। সব প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলেও একটি সৎ হিসাব মানুষ গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু প্রতিটি ব্যর্থতার ব্যাখ্যা যদি অতীতেই আটকে থাকে, তাহলে বর্তমান নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

জ্বালানির সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মূল্য

দ্রব্যমূল্যের আলোচনায় সরকারের নিজের সিদ্ধান্তও বিচার করতে হবে। উৎপাদন থেকে পরিবহন—খাদ্যপণ্যের প্রায় প্রতিটি ধাপে জ্বালানির ব্যবহার রয়েছে। এখানে খরচ বাড়লে বাজারে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা স্বাভাবিক।

২০ সেপ্টেম্বর চার ধরনের জ্বালানির দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পরে পরিবহনব্যয় বৃদ্ধির খবর এসেছে। ঢাকা ট্রিবিউনের বাজার প্রতিবেদনে ব্যবসায়ীরা সেই খরচ পণ্যের দামে যুক্ত হওয়ার কথা বলেছেন। তবে তাঁদের ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত হিসাব নয়; খরচ ও মূল্যবৃদ্ধির সম্পর্ক যাচাই করা দরকার।

জ্বালানির দাম সমন্বয়ের আর্থিক প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু সেই প্রয়োজনের ব্যাখ্যার সঙ্গে সামাজিক প্রভাবের হিসাবও প্রকাশ করা উচিত। রাজকোষে কতটা চাপ কমল এবং মানুষের সংসারে কতটা চাপ বাড়ল—দুটিই সরকারি সিদ্ধান্তের ফল।

বিশেষ করে কৃষক, ছোট উৎপাদক ও সীমিত আয়ের পরিবারের পক্ষে বাড়তি খরচ সামলানো কঠিন। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁদের জন্য কী ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, পরে তা কতটা কার্যকর হয়েছে—এ প্রশ্ন এড়ানো যায় না। প্রয়োজনীয় সংস্কারও মানুষের সহনক্ষমতা বিবেচনা করে করতে হয়। নইলে সংস্কারের প্রতি সমর্থন দুর্বল হয়।

সিন্ডিকেটের নামের পরে তদন্ত চাই

বাজার নিয়ে প্রায় প্রতিটি আলোচনায় ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটি আসে। কিন্তু শব্দটির বহুল ব্যবহার তদন্তের বিকল্প হতে পারে না। কোন পণ্যে কারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে, কীভাবে করছে এবং কতটা অস্বাভাবিক মুনাফা হচ্ছে—সেটি নির্দিষ্টভাবে জানতে হবে।

কোথাও যোগসাজশ থাকতে পারে, কোথাও সরবরাহ কমতে পারে, কোথাও আমদানি বা পরিবহনব্যয় বাড়তে পারে। ভিন্ন সমস্যার জন্য একই অভিযান কার্যকর হবে না। কারণ না বুঝে খুচরা ব্যবসায়ীকে জরিমানা করলে সাময়িক দৃশ্য তৈরি হয়, স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন।

সরকার চাইলে নির্বাচিত নিত্যপণ্যের একটি নিয়মিত বাজারচিত্র প্রকাশ করতে পারে। উৎপাদক কত পাচ্ছেন, আমদানি খরচ কত, পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান কোথায় বাড়ছে—এই তথ্য থাকলে নীতি ও তদন্ত দুটিই শক্তিশালী হবে।

বড় সরবরাহকারী, গুদাম ও আমদানিকারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের সক্ষমতা কতটা, সেটিও দেখতে হবে। ছোট দোকান সহজে নজরে পড়ে বলে তার ওপর বাজারের সব ব্যর্থতার দায় চাপানো অন্যায্য। জনগণ কঠোর ভাষার পাশাপাশি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও নিয়মের সমান প্রয়োগ দেখতে চান।

ফ্যামিলি কার্ডকে কীভাবে বিচার করব

ফ্যামিলি কার্ড বর্তমান সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। ১০ মার্চ পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩৭ হাজার পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করে নারীর নামে মাসে ২,৫০০ টাকা সরাসরি ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ওয়ালেটে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়। এটি শুরু থেকেই সব পরিবারের সুবিধা ছিল না।

অভাবের সংসারে এই অর্থের গুরুত্ব আছে। খাবার, ওষুধ বা সন্তানের খরচের একটি অংশ মিটলেও উপকার। তাই উদ্যোগটিকে মূল্যহীন বলা সমালোচনার সততা নষ্ট করবে। তবে নগদ সহায়তার সাফল্য দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের সাফল্য দাবি করা যায় না।

এখন প্রয়োজন হালনাগাদ ফলাফল। কত পরিবার নিয়মিত অর্থ পেয়েছে, যোগ্য কত পরিবার বাদ পড়েছে, অভিযোগ করলে সমাধান মিলছে কি না—এসব জানাতে হবে। অন্য সুবিধা বন্ধ হয়ে থাকলে পরিবারের মোট সহায়তার পরিবর্তনও দেখতে হবে।

ডিজিটাল লেনদেন মাঝপথে টাকা হারানোর ঝুঁকি কমাতে পারে। কিন্তু উপকারভোগী বাছাইয়ের ভুল বা রাজনৈতিক পক্ষপাত দূর করতে আলাদা নজরদারি প্রয়োজন। কার্ড বিতরণের ছবি কর্মসূচির শুরু দেখায়; পরিবারের জীবন কতটা সহজ হলো, তা জানতে দীর্ঘতর মূল্যায়ন লাগে।

কাজের নিশ্চয়তা ছাড়া স্বস্তি টিকবে না

সহায়তা মানুষকে সংকটে টিকিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু নিয়মিত কাজ ও আয় ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী স্বস্তি আসবে না। কারখানার উৎপাদন কমলে শ্রমিকের বাইরে পরিবহন, সরবরাহ ও আশপাশের ব্যবসাও চাপে পড়ে। তাই শিল্পের সমস্যা শেষ পর্যন্ত পরিবারের বাজারের সমস্যায় ফিরে আসে।

তবে কত কারখানা বন্ধ হয়েছে বা কত মানুষ কাজ হারিয়েছেন, তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। স্থায়ী বন্ধ, সাময়িক উৎপাদন বন্ধ এবং আংশিক কাজ কমানো এক নয়। এগুলো গুলিয়ে ফেললে সংকটের প্রকৃতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বোঝা কঠিন হয়।

আন্তর্জাতিক ঝুঁকিও রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এপ্রিল–জুন ২০২৬-এর মূল্যস্ফীতি পর্যালোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত বৈশ্বিক জ্বালানির দাম ও পরবর্তী প্রভাবের আলোচনা এসেছে।

বাইরের ধাক্কা সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু সরবরাহের প্রস্তুতি, শিল্পে অগ্রাধিকার এবং ছোট উৎপাদককে সহায়তা দেশীয় নীতির বিষয়। বিনিয়োগের জন্যও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ দরকার। গ্যাস, বিদ্যুৎ, ঋণ ও বিধিব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে শুধু আহ্বান জানিয়ে আস্থা ফেরানো কঠিন।

শ্রমিকের দাবি ও রাজনৈতিক অভিযোগ

শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে সরকারের বক্তব্যও গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করতে হবে। ২০ অক্টোবর তারেক রহমান এর পেছনে শেখ হাসিনার অর্থায়ন এবং দেশের কয়েকটি রাজনৈতিক শক্তির সহযোগিতার অভিযোগ করেন। পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান খোলা ও কর্মসংস্থান তৈরিতে সরকারের চেষ্টার কথা বলেন।

অভিযোগের পক্ষে তথ্য থাকলে তদন্ত হোক। কিন্তু তা দিয়ে সব আন্দোলনের কারণ ব্যাখ্যা করা যায় না। বেতন বকেয়া থাকলে শ্রমিকের দাবি বাস্তব। কেউ সহিংসতা ঘটালে তার দায় আলাদা। একই ঘটনায় দুটো বিষয় থাকলে দুটোকেই পৃথকভাবে দেখতে হবে।

বিরোধীরা শ্রমিকের দুর্দশাকে নিজেদের সংঘাতের উপকরণ করলে সেটিও সমালোচনাযোগ্য। আবার রাজনৈতিক ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা দেখিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বন্ধ করা গ্রহণযোগ্য নয়।

এখানে সরকারের জন্য শোনার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি ক্ষোভে ষড়যন্ত্র খুঁজলে প্রশাসনের নিজের ত্রুটি ধরা পড়ে না। অভিযোগকারীর রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, তাঁর দাবির সত্যতা পরীক্ষা করতে হবে। বকেয়া পাওনা আদায় বা নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেও বহাল থাকে।

গ্রেপ্তারের সংখ্যার চেয়ে আইনের মান

শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বিবৃতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দৈনিক পাঁচ থেকে সাত হাজার মানুষ গ্রেপ্তারের অভিযোগ এসেছে। একই প্রতিবেদনে সংখ্যাটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি বলেও জানানো হয়েছে। অতএব, এটিকে প্রতিষ্ঠিত পরিসংখ্যান হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।

তবে অভিযোগটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বলে সরকার শুধু উড়িয়ে দিতে পারে না। গ্রেপ্তার, তদন্ত ও মামলার অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত তথ্য দিলে যাচাই সম্ভব হয়। কতজন আটক হলেন, তার পাশাপাশি কেন আটক হলেন এবং পরে কী প্রমাণ পাওয়া গেল—সেটিও জরুরি।

আখতারুজ্জামানের ঘটনাতেও পূর্ণ চিত্র প্রয়োজন। বিরোধীরা তাঁর গ্রেপ্তারকে বিমানবন্দরে যাত্রী দুর্ভোগের প্রতিবাদের প্রতিক্রিয়া বলেছে। মামলায় আবার সরকারি কাজে বাধা, হুমকি ও নিরাপত্তাকর্মীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত ধরে নেওয়া যেমন ভুল, তেমনি সেগুলো বাদ দিয়েও লেখা যায় না।

সাদিক কায়েমের ‘নব্য ফ্যাসিস্ট’ মন্তব্যও একটি রাজনৈতিক মূল্যায়ন। রাষ্ট্রের আচরণ বিচার করতে দেখতে হবে আইন সমানভাবে চলছে কি না, নাগরিক প্রশ্ন করতে পারছেন কি না এবং ভুলের প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে কি না। তকমার চেয়ে এই পরীক্ষাগুলো বেশি নির্ভরযোগ্য।

ক্ষোভ কখন আস্থার সংকটে বদলায়

বাজারদর নিয়ে অসন্তোষ মানেই সরকার পতনের পূর্বাভাস নয়। মানুষ সরকারের কোনো উদ্যোগ সমর্থন করে অন্য সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পারেন। সময়ও দিতে পারেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ একই বিষয়ে সমালোচনা করলেই তাদের মধ্যে ঐক্য তৈরি হয়েছে ধরে নেওয়া যায় না।

কিন্তু সরকারের প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যা স্বীকার করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সমস্যা অস্বীকার করে সমালোচককে সন্দেহ করা ভিন্ন রাজনৈতিক ফল তৈরি করে। নাগরিক যদি দেখেন তাঁর কথা শোনা হচ্ছে, তাহলে সমাধানে সময় লাগলেও কিছু আস্থা থাকে।

ঝুঁকি বাড়ে যখন অর্থনৈতিক কষ্টের সঙ্গে অপমান বা ভয় যুক্ত হয়। কাজ নেই, খরচ বাড়ছে, সহায়তা পেতে হয়রানি হচ্ছে, অভিযোগ করেও উত্তর নেই—এই অভিজ্ঞতা জমলে অসন্তোষ আর একটি খাতের মধ্যে সীমিত থাকে না।

তখন অদৃশ্য বিকল্প নেতৃত্বের গল্পও বেশি আবেদন পেতে পারে। মানুষ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা খোঁজেন। সেই জায়গায় যাচাইহীন পূর্বাভাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সরকার এই প্রবণতা মোকাবিলা করতে চাইলে শুধু গুজবের প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়; নিজের কাজকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে।

ডিসেম্বরের আগে যে হিসাব প্রয়োজন

তারেক রহমান সরকারের সামনে তাই কিছু স্পষ্ট কাজ রয়েছে। বাজারের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ, জ্বালানি সিদ্ধান্তের প্রভাব মূল্যায়ন, সহায়তার অর্থ ঠিকমতো পৌঁছানো এবং উৎপাদনের বাধা কমানোর অগ্রগতি দেখাতে হবে। আইনশৃঙ্খলার সাফল্যও শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে মাপলে চলবে না।

বিরোধীদের দায়িত্ব হলো তথ্যসমর্থিত সমালোচনা ও বাস্তব বিকল্প দেওয়া। বিদেশি সমর্থনের ইঙ্গিত বা আসন্ন নাটকীয় পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থনৈতিক কর্মসূচির ঘাটতি পূরণ করা যায় না। সম্ভাব্য নেতৃত্বকে একই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে: অর্থ কোথা থেকে আসবে, বাজার কীভাবে চলবে, কাজ কীভাবে বাড়বে?

রনির দাবি সত্য কি না, তা প্রমাণের বিষয়। ডিসেম্বর ঘিরে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, তা ভবিষ্যতের বিষয়। বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্ত এবং মানুষের জীবনযাত্রা কিন্তু এখনই বিচার করা যায়।

রাজনৈতিক পর্দা ওঠার অপেক্ষায় বাজারের হিসাব থেমে থাকে না। যে পরিবারটি আজ খরচ কমিয়ে খাবার কিনছে, তার কাছে সরকারের জবাবও আজ প্রয়োজন। বাংলাদেশের রাজনীতির গুরুত্ব শেষ পর্যন্ত সেখানেই—ক্ষমতার মঞ্চে কে থাকবেন, তার সঙ্গে নাগরিকের জীবন কতটা বদলাবে, সেই সম্পর্কটি স্পষ্ট করা।