বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডিসেম্বর এমনিতেই আবেগের মাস। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি ডিসেম্বরে ফিরতে চান। কিন্তু তাঁর ইচ্ছা, ফেরার বাস্তব ব্যবস্থা এবং দেশে ফিরে আবার রাজনীতি করার সুযোগ—এই তিনটির মধ্যে এখনও অনেক দূরত্ব।

ঘোষণাটি একেবারে নতুনও নয়। গত ১০ জুলাই রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে নিয়ে ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান তিনি। তখন তিনি বলেছিলেন, এই পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়নি। অর্থাৎ, সেটি ছিল তাঁর নিজের ঘোষিত অভিপ্রায়; দুই পক্ষের মধ্যে স্থির হওয়া প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা নয়।

অক্টোবরে তিনি আবারও ডিসেম্বরের কথা বলেছেন। বারবার একই সময়সীমা উচ্চারণে রাজনৈতিক গুরুত্ব তৈরি হয়। তবে সেটিকে নিশ্চিত সফরসূচি ধরে নেওয়ার অবকাশ নেই। প্রশ্ন তাই শুধু তিনি ফিরবেন কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি কোন রাজনৈতিক জায়গাটি ফিরে পেতে চাইছেন, আর বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সেই চ্যালেঞ্জ কীভাবে সামলাবে।

ফিরতে চাইছেন যে দেশে, সেটিও বদলে গেছে

এই আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমেই সময়ের হিসাব পরিষ্কার রাখা দরকার। শেখ হাসিনা যে বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন, এখনকার বাংলাদেশ সেই অবস্থায় নেই। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পর্ব পেরিয়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় পেয়েছে। এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আওয়ামী লীগ সেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।

ফলে হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এখন একটি নির্বাচিত সরকারের সামনে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সরকারের নিজের নির্বাচনী সমর্থন রয়েছে, আবার দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে থাকায় প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও রয়ে গেছে। এই দুই বাস্তবতার একটিকে মুছে অন্যটি দিয়ে পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে।

কার্নেগি এনডাওমেন্টে গত মে মাসে প্রকাশিত বিশ্লেষণে অবিনাশ পালিওয়াল ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হিসেবে দেখেছেন। একই সঙ্গে তাঁর প্রশ্ন, ক্ষমতায় ফিরে বিএনপি রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক অর্থনীতির পুরনো কাঠামো কতটা বদলাতে পারবে।

এই প্রশ্নের সঙ্গে শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণার যোগ রয়েছে। নতুন সরকার যদি প্রতিষ্ঠান সংস্কার, সুশাসন এবং মানুষের দৈনন্দিন প্রত্যাশা পূরণে সফল হয়, তাহলে অতীতের শাসকের প্রত্যাবর্তনের আবেদন সীমিত থাকবে। ব্যর্থতা বাড়লে বিরোধীদের জন্য জায়গা তৈরি হবে। তবে সরকারের প্রতি অসন্তোষ তৈরি হওয়া আর সেই অসন্তোষ আওয়ামী লীগের সমর্থনে পরিণত হওয়া একই ঘটনা নয়।

ডিসেম্বরের ঘোষণা কাদের উদ্দেশে

শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের প্রথম শ্রোতা তাঁর নিজের দলের কর্মী-সমর্থকেরা। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা একটি দল হঠাৎ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব হারালে তার সংগঠনে অনিশ্চয়তা আসে। নেতৃত্বের নির্দেশ কতটা কার্যকর, পুরনো যোগাযোগ কতটা অটুট, মাঠে থাকার ঝুঁকি কতখানি—এসব প্রশ্ন সামনে চলে আসে।

এই পরিস্থিতিতে ফেরার একটি সময়সীমা কর্মীদের অপেক্ষার কারণ দেয়। নেতৃত্ব তাঁদের ছেড়ে যায়নি—এমন বার্তাও বহন করে। ঘোষণাটি কার্যকর হওয়ার আগেই তাই সাংগঠনিক কাজ করতে পারে।

দ্বিতীয় শ্রোতা ঢাকার সরকার। দেশে ফেরার কথা বলে শেখ হাসিনা সরকারকে প্রকাশ্যে জানাতে বাধ্য করছেন, তাঁকে কীভাবে গ্রহণ করা হবে। নিরাপত্তা, হেফাজত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের প্রতিটি বক্তব্য তখন আন্তর্জাতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠছে।

তৃতীয় শ্রোতা বিদেশি সরকার, সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার মহল। এখানে তাঁর প্রচারের লক্ষ্য সম্ভবত নিজের অবস্থান বদলে উপস্থাপন করা: ক্ষমতাচ্যুত শাসক থেকে বিচার ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন তোলা একজন নির্বাসিত নেতা হিসেবে সামনে আসা।

এটি তাঁর বক্তব্য ও সাম্প্রতিক পদক্ষেপ থেকে করা রাজনৈতিক পাঠ। এর অর্থ এই নয় যে আন্তর্জাতিক মহল তাঁর ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছে, কিংবা তাঁর ফেরার জন্য কোনো সমঝোতা তৈরি হয়েছে।

জাতিসংঘের কাছে আবেদন: রাজনৈতিক দরজা খোলার চেষ্টা

আন্তর্জাতিক স্তরে সবচেয়ে সাম্প্রতিক পদক্ষেপটি এসেছে তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে। ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত বিবৃতিতে লন্ডনের ম্যাট্রিক্স চেম্বার্স জানিয়েছে, শেখ হাসিনার পক্ষে আইনজীবী স্টিভেন পাওয়েলস জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের কাছে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন। সেখানে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং মতপ্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতার প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বর্তমান বিএনপি সরকারও বহাল রেখে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

এখানে সবচেয়ে জরুরি পার্থক্যটি হলো, এগুলো আবেদনকারীর বক্তব্য। জাতিসংঘ আবেদনটির অভিযোগ মেনে নিয়েছে বা বাংলাদেশের সরকারকে কোনো নির্দেশ দিয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত ওই বিবৃতি থেকে টানা যায় না।

তারপরও পদক্ষেপটির রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে। দেশে দলীয় কার্যক্রমের পথ সংকুচিত থাকলে আন্তর্জাতিক অধিকারব্যবস্থায় বিষয়টি নিয়ে যাওয়া আলোচনার আরেকটি ক্ষেত্র তৈরি করে। আওয়ামী লীগের ওপর বিধিনিষেধ তখন শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; রাজনৈতিক অধিকার ও নিষেধাজ্ঞার পরিধি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

আওয়ামী লীগের কৌশল সম্ভবত এখানেই। শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বিচার থেকে দলের সমর্থকদের রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নটিকে আলাদা করে সামনে আনা। আন্তর্জাতিকভাবে এই যুক্তির গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হলেও তা তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া রায় বাতিল করবে না। তবে দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।

বিচারের অবস্থাও আগের জায়গায় নেই

শেখ হাসিনাকে নিয়ে আলোচনায় শুধু ‘বিচার চলছে’ বললে বর্তমান বাস্তবতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁকে এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। শেখ হাসিনা অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তাই তাঁর দেশে ফেরা একজন সাধারণ অভিযুক্তের আদালতে হাজির হওয়ার মতো পরিস্থিতি হবে না। বিদ্যমান রায়, হেফাজত এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ—সব মিলিয়ে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল।

এই ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের নিজস্ব আদালত। নামের মধ্যে ‘আন্তর্জাতিক’ থাকলেও এটি হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নয়। বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বা সমালোচনা থাকতে পারে; কিন্তু তার সঙ্গে আদালতের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।

আবার আদালতের রায় রয়েছে বলেই বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সব প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অনুপস্থিতিতে বিচার, নিজের পছন্দের আইনজীবীর প্রতিনিধিত্ব এবং মৃত্যুদণ্ড নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। চলতি জুলাইয়েও সংস্থাটি ট্রাইব্যুনালের একাধিক মামলায় তদন্ত ও ন্যায়বিচারের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে হাসিনা সরকারের আমলের গুরুতর নির্যাতনের দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রয়োজনও স্পষ্ট করেছে।

বাংলাদেশের জন্য কঠিন কাজটি এখানেই। অপরাধের বিচার করতে হবে এমনভাবে, যাতে বিচারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যুক্তিসংগত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায়। দুর্বল তদন্ত বা রাজনৈতিক বাছবিচার শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায়বিচারের দাবিকেও দুর্বল করে।

নিরাপত্তার আশ্বাস কতটা গুরুত্বপূর্ণ

২৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, শেখ হাসিনা ফিরলে তাঁকে মব সহিংসতা বা বেআইনি পরিস্থিতির মুখে পড়তে দেওয়া হবে না; ব্যবস্থা নেওয়া হবে আইনি প্রক্রিয়ায়। তিনি এটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে হাসিনা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত।

এই বক্তব্যকে নিরাপদ রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের অনুমতি হিসেবে পড়া যাবে না। সরকার মূলত বলছে, তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের; উত্তেজিত জনতার নয়।

বক্তব্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কোনো সরকারের আইনের শাসনের দাবি সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে অপ্রিয় ও ক্ষমতাহীন প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে। শেখ হাসিনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অর্থ তাঁকে দায়মুক্তি দেওয়া নয়। বরং বিচার করার জন্যই তাঁকে রাষ্ট্রের সুরক্ষিত হেফাজতে রাখতে হবে।

অবশ্য প্রকাশ্য আশ্বাস আর বাস্তব প্রস্তুতি এক জিনিস নয়। তিনি সত্যিই ফিরলে বিমানবন্দর থেকে আদালত ও কারাগার পর্যন্ত নিরাপত্তা, আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা দিয়ে সেই আশ্বাসের মূল্য বোঝা যাবে।

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কি শুধু হাসিনার ওপর নির্ভরশীল

আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহাসিক দল। কিন্তু ইতিহাস বর্তমানের জবাবদিহির বিকল্প হতে পারে না। আবার দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ বা রায় থেকে প্রত্যেক সমর্থকের দায়ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হয় না।

আন্তর্জাতিক মতামতের পাতায় এই দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ সঞ্জয় কে ভরদ্বাজের একটি মতামত নিবন্ধে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ রাখার ফলে রাজনৈতিক বহুত্ব ও প্রতিনিধিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছিল। এটি নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে একটি যুক্তি; দলটির শাসনামলের সব কাজের সমর্থন নয়।

অন্যদিকে, দ্য ডেইলি স্টার-এ রাজনৈতিক ইতিহাস গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মূল্যায়নে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ যাত্রার সঙ্গে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার ইতিহাসও এসেছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, ২০২৪ সালের আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হলে দলটির ফেরার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে—যদিও তিনি সেটিকে অনিবার্য বলেননি।

এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি পাশাপাশি রাখলে আওয়ামী লীগের সামনে আসল প্রশ্নটি বোঝা যায়। দলটি কি শুধু শেখ হাসিনার ফিরে আসার অপেক্ষা করবে, নাকি নিজের শাসনামলের ব্যর্থতা ও দমননীতির অভিযোগের সৎ মূল্যায়ন করবে?

ক্ষমতার বাইরে থেকেও যদি দলের ভেতরে মতভেদ, নেতৃত্ব পরিবর্তন বা ভুল স্বীকারের সুযোগ না থাকে, তাহলে জনসমর্থন পুনর্গঠনের দাবি দুর্বল হবে। একজন নেতার দেশে ফেরা সংগঠনকে উদ্দীপনা দিতে পারে। বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন অন্য ধরনের কাজ।

বিএনপির জন্যও সহজ সমীকরণ নয়

ক্ষমতাসীন বিএনপির সামনে দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে রয়েছে। জুলাই-আগস্টের সহিংসতার বিচার নিয়ে জনদাবিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি এমন ব্যবস্থা গড়তে হবে, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় বিচার পাওয়ার বা অধিকার হারানোর একমাত্র মাপকাঠি হয়ে উঠবে না।

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থেমে যায়নি। নির্বাচনের আগে চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষণে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির জোটকে পুরনো দ্বিদলীয় কাঠামোর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়েছিল।

ফলে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিএনপির সিদ্ধান্ত সংসদীয় বিরোধী শক্তি, আন্দোলনের অংশীদার এবং বিভিন্ন ভোটারগোষ্ঠীর মধ্যে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। কঠোরতা দেখালেই সব রাজনৈতিক চাপ কমবে না; শিথিলতা দেখালেও সমালোচনা এড়ানো যাবে না।

এই অবস্থায় সরকারের সবচেয়ে টেকসই ভিত্তি হতে পারে প্রকাশ্য নীতি ও ধারাবাহিক প্রয়োগ। কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, কোন প্রমাণে ব্যবস্থা, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কাজের সীমা কোথায়—এসব যত স্পষ্ট হবে, গোপন সমঝোতা ও প্রতিহিংসার অভিযোগের জায়গা তত কমবে।

ভারতের হাতে কি ফেরার চাবি

শেখ হাসিনা ভারতে রয়েছেন বলে দিল্লির ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ ভারতের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হবে—এমন ধারণা দেশের নিজস্ব রাজনীতি, আদালত ও জনমতকে ছোট করে দেখে।

গত ৩ অক্টোবর ভারতের হাইকমিশনার জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ আইনি পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে এবং ফেরানোর নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই শেখ হাসিনার ঘোষিত ডিসেম্বরের সঙ্গে ভারতের প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে এক করে দেখা যাবে না।

স্বেচ্ছায় দেশে ফেরা এবং প্রত্যর্পণের মাধ্যমে ফেরত পাঠানো আলাদা বিষয়। প্রথমটির ক্ষেত্রেও ভ্রমণ ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা প্রয়োজন; দ্বিতীয়টির সঙ্গে দুই রাষ্ট্রের আইনি সিদ্ধান্ত যুক্ত।

দিল্লির জন্য বিষয়টি ব্যক্তিগত সম্পর্কের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে কাজ করা এবং শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া—দুটির মধ্যে কূটনৈতিক চাপ রয়েছে। গত আগস্টে তাঁর বক্তব্য ঘিরে ঢাকা-দিল্লির বিরোধ সেই অস্বস্তি প্রকাশ করেছে।

তবে প্রকাশ্যে যতটুকু জানা যাচ্ছে, তার বাইরে দাঁড়িয়ে গোপন চুক্তি, নিশ্চিত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বা বিদেশি শক্তির ঠিক করা ফেরার দিন নিয়ে সিদ্ধান্ত টানা সম্ভব নয়।

ডিসেম্বর এলে কী দেখা দরকার

এখন অন্তত তিনটি সম্ভাবনা খোলা রয়েছে।

শেখ হাসিনা ঘোষণাটি বাস্তবায়ন করে দেশে ফিরতে পারেন। সে ক্ষেত্রে প্রথম পরীক্ষা হবে নিরাপত্তা ও আইনি প্রক্রিয়া। তাঁর উপস্থিতি আওয়ামী লীগের কর্মীদের সাহস দিতে পারে, আবার বিরোধীদের তীব্র প্রতিক্রিয়াও তৈরি করতে পারে। কোনটি কতটা হবে, এখনই মাপার নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই।

ফেরার সময় পিছিয়েও যেতে পারে। সেক্ষেত্রে দলকে ব্যাখ্যা করতে হবে, বারবার ঘোষিত সময়সীমা কেন কার্যকর হলো না। দীর্ঘ অপেক্ষা নেতৃত্বের ওপর আস্থা ধরে রাখার কাজ কঠিন করতে পারে।

আরেকটি সম্ভাবনা হলো, তিনি ভারতে থাকলেও দলীয় নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে আইনি-কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে থাকবেন। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের কাছে সাম্প্রতিক আবেদন সেই পথেই একটি পদক্ষেপ।

এই মুহূর্তে সম্ভাবনা আর সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমারেখা রাখা জরুরি। ডিসেম্বরের কথা বলা হয়েছে; কিন্তু ফেরার ব্যবস্থা চূড়ান্ত হয়েছে—এমন প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই।

বাংলাদেশের জন্য বড় প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত একটি তারিখের চেয়েও বিস্তৃত। জুলাইয়ের নিহতদের পরিবার কি বিশ্বাসযোগ্য বিচার পাবে? অভিযুক্ত ও দণ্ডিত ব্যক্তিরাও কি আইনের নির্ধারিত অধিকার পাবেন? শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথ কি স্পষ্ট থাকবে?

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ঘটলে এই প্রশ্নগুলো আরও তীব্র হবে। না ঘটলেও সেগুলো থেকে যাবে। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি কোনো একজন নেতার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি হতে পারে না। সেই ভিত্তি গড়তে হবে এমন প্রতিষ্ঠানে, যাকে ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাচ্যুত—দুই পক্ষই নিজেদের সুবিধার বাইরে গিয়েও মানতে বাধ্য হয়।


এটি একটি মতামতধর্মী বিশ্লেষণ। এখানে প্রকাশিত মূল্যায়ন বাংলাস্ফিয়ারের সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এক নাও হতে পারে।