বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে শুধু ঢাকা–টোকিও সম্পর্কের আরেকটি অধ্যায় হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা যাবে না। এই সফরে যে বন্দর, শিল্প ও যোগাযোগের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তার সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং পশ্চিমবঙ্গেরও স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে।
আলোচনার কেন্দ্রে বিগ-বি—‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’। উদ্যোগটি নতুন নয়। ২০১৪ সালে শেখ হাসিনা ও শিনজো আবের বৈঠকে এর সূচনা। এখন তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচি সেই উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে এগিয়ে নিতে চাইছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মাথায় রাখলে এই ধারাবাহিকতা উল্লেখ করার মতো। আগের সরকারের সঙ্গে তীব্র বিরোধ থাকা সত্ত্বেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উদ্যোগ থামিয়ে দেওয়া হয়নি। বড় প্রকল্পের পরিকল্পনা এক সরকারের সময়ে, নির্মাণ অন্য সরকারের সময়ে এবং সুফল আরও পরে পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। রাষ্ট্রের প্রয়োজনকে সেই দীর্ঘ সময় ধরেই দেখতে হয়।
কলকাতার কাছে প্রশ্নটি অন্য জায়গায়ও। মাতারবাড়ি বন্দর ও তার চারপাশের শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলে পূর্ব ভারতের বাণিজ্যে কী বদল আসতে পারে? কলকাতা–হলদিয়ার ব্যবসায় চাপ পড়বে, নাকি নতুন সুযোগ তৈরি হবে? উত্তর-পূর্ব ভারত কতটা সুবিধা পাবে? উত্তরগুলো এখনই নিশ্চিত নয়। তবে প্রশ্নগুলো নিয়ে কাজ শুরু করার সময় হয়েছে।
পুরনো বিগ-বি, নতুন পরিকল্পনা
২০১৪ সালের ২৬ মে টোকিওতে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে শিনজো আবে বিগ-বি প্রস্তাব করেছিলেন। জাপানের সরকারি নথিতেই তার উল্লেখ রয়েছে। তাই উদ্যোগটির ইতিহাস থেকে হাসিনা–আবের ভূমিকা বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।
একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের ভূমিকারও মূল্যায়ন প্রয়োজন। ২৭ অক্টোবর তারেক রহমান ও তাকাইচি বিগ-বি’কে “BIG-B for Shared Prosperity” নামে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যোগাযোগের পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলা, আন্তর্জাতিক অস্থিরতার ধাক্কা সামলানো, সরকারি–বেসরকারি ব্যবসার সুযোগ এবং শান্তি ও নিরাপত্তায় সহযোগিতা এই পরিকল্পনায় জায়গা পেয়েছে।
সহজ করে বললে, আলোচনা এখন শুধু বন্দর বা রাস্তা তৈরিতে সীমাবদ্ধ নেই। সেগুলো ব্যবহার করে শিল্প গড়ে তোলা, বিনিয়োগ আনা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে।
তবে পরিকল্পনার পরিসর বড় হলেই কাজ সহজ হয় না। বরং বিদ্যুৎ, বন্দর, রাস্তা, শিল্পাঞ্চল ও সরকারি দপ্তরকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়। একটি অংশ পিছিয়ে থাকলে অন্য অংশের সুবিধাও আটকে যায়। নতুন ঘোষণার আসল পরীক্ষা হবে সেই সমন্বয়ে।
জাপান কী চাইছে
জাপান দীর্ঘদিন বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী। কিন্তু এই সম্পর্ককে শুধু সাহায্যের সম্পর্ক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বাংলাদেশের বাজার, শ্রমশক্তি এবং ভৌগোলিক অবস্থান জাপানের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।
সফরের আগে জাপানের নিক্কেইয়ের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রয়টার্স জানিয়েছিল, সম্ভাব্য বেসরকারি বিনিয়োগের মধ্যে গাড়িশিল্পসহ উৎপাদন খাত, জ্বালানি স্থাপনা এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ব্যবসার পরিকল্পনা রয়েছে। রয়টার্স তখন তথ্যটি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি বলেও জানিয়েছিল।
শীর্ষ বৈঠকের পরে জাপানের জিজি প্রেস বিনিয়োগের প্রত্যাশার পাশাপাশি বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তায় টহলযান দেওয়ার বিষয়টি জানিয়েছে। প্রতিবেদনে জাপানের জন্য বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপথের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থাৎ, টোকিওর আগ্রহের মধ্যে ব্যবসা ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা—দুটিই রয়েছে। তাকাইচিও বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হিসেবে দেখেছেন।
এই স্বার্থ থাকা অস্বাভাবিক নয়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা টেকে যখন দু’পক্ষই তার মধ্যে লাভ দেখতে পায়। প্রশ্ন হলো, সেই লাভ কীভাবে ভাগ হবে এবং চুক্তির শর্ত কতটা গ্রহণযোগ্য হবে।
সফরে কী পাওয়া গেল
সফরকালে একটি অনুদান চুক্তিসহ ছয়টি সহযোগিতা দলিল সই হয়েছে বলে বাসস জানিয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও ব্যবসার পরিবেশ, কৃষি, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং জলবায়ু সহযোগিতা তার মধ্যে রয়েছে।
পাশাপাশি দুটি প্রকল্পে মোট ৪৬.৫৬ বিলিয়ন ইয়েন ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে। সংবাদে ব্যবহৃত বিনিময়হার অনুযায়ী, তা প্রায় ২৯ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার। একটি প্রকল্প বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নের জন্য, অন্যটি উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়।
এখানে কয়েকটি বিষয় আলাদা রাখা দরকার। ঋণ অনুদান নয়। ঋণের প্রতিশ্রুতি মানেই অর্থ হাতে এসে যাওয়া নয়। আবার সহযোগিতা স্মারক সই হলেই নির্দিষ্ট বিনিয়োগ শুরু হয়ে যায় না।
এই ঋণের পুরো অঙ্ককে মাতারবাড়ি বন্দরের নতুন বরাদ্দ বলাও ঠিক হবে না। প্রকল্পগুলোর উদ্দেশ্য আলাদা।
এর বাইরে আগামী পাঁচ বছরে জাপানি বেসরকারি খাত থেকে সর্বোচ্চ এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ এবং প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা জানানো হয়েছে। সেটিও সম্ভাবনার হিসাব; ইতিমধ্যে আসা বিনিয়োগ বা তৈরি হওয়া চাকরি নয়।
সফরের প্রাপ্তি মূল্যায়নে এই পার্থক্য জরুরি। নইলে ঋণ, অনুদান ও ভবিষ্যতের বিনিয়োগ যোগ করে এমন একটি অঙ্ক তৈরি হয়, যা শুনতে বড় হলেও বাস্তব অবস্থাটি বোঝায় না।
মাতারবাড়িতে বন্দর হলেই কি শিল্প আসবে
বিগ-বি’কে শুধু মাতারবাড়ি বন্দরের আরেক নাম ভাবলে ভুল হবে। বন্দরটি তার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কিন্তু পরিকল্পনাটি অনেক বড়।
জাপানের নথিতে বন্দরের সঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বিমানবন্দর, সড়ক, রেল, নৌপথ ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে যুক্ত করে উন্নয়নের কথা রয়েছে।
এর যুক্তি সহজ। জাহাজ থেকে পণ্য নামবে, দ্রুত গন্তব্যে যাবে, কারখানায় উৎপাদন হবে, আবার সেই পণ্য বাজারে পৌঁছবে। এই পুরো ব্যবস্থাটি ঠিকমতো চললেই বন্দর অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা নিতে পারবে।
কিন্তু বন্দরে দ্রুত পণ্য নামিয়ে যদি রাস্তায় আটকে থাকতে হয়, তাহলে সময়ের সুবিধা নষ্ট হবে। কারখানায় গ্যাস বা বিদ্যুৎ অনিশ্চিত হলে বিনিয়োগকারী শুধু বন্দর দেখে আসবেন না। কাস্টমসে কত দিন লাগবে বা কী নিয়ম মানতে হবে, তা পরিষ্কার না থাকলেও ব্যবসার খরচ বাড়বে।
তাই মাতারবাড়ির সাফল্য শুধু নির্মাণের অগ্রগতি দিয়ে মাপা যাবে না। পণ্য পরিবহনে মোট কত খরচ হচ্ছে, সময় কত লাগছে এবং কত শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিষেবাটি ব্যবহার করছে—সেই হিসাবও দেখতে হবে।
বন্দর তৈরি করা বড় কাজ। তাকে নিয়মিত ব্যবসার কেন্দ্র করে তোলা আরও দীর্ঘ কাজ।
উত্তর-পূর্ব ভারতের লাভ কোথায়
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সমুদ্রের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো আকর্ষণীয় সম্ভাবনা। জাপানের সরকারি উন্নয়ননীতিতেও বাংলাদেশ ও উত্তর-পূর্ব ভারতকে পরস্পর যুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে দেখার কথা রয়েছে।
মাতারবাড়ি সেই যোগাযোগের নতুন পথ খুলতে পারে। তবে উত্তর-পূর্ব ভারতের সব রাজ্য বা সব ব্যবসা একই সুবিধা পাবে, এমন ধরে নেওয়া যায় না।
ত্রিপুরার একটি কারখানা এবং অসমের অন্য প্রান্তের একটি ব্যবসার জন্য পরিবহনের হিসাব আলাদা হবে। শুধু বন্দরের দূরত্ব দেখলে হবে না। সীমান্তে কত সময় লাগবে, পণ্য বদলে অন্য গাড়িতে তুলতে হবে কি না, মাশুল কত এবং জাহাজ কত নিয়মিত পাওয়া যাবে—এসবও গুরুত্বপূর্ণ।
মানচিত্রে ছোট পথ বাস্তবে সব সময় সস্তা হয় না। আবার ব্যবস্থা ভালো হলে নতুন পথ ব্যবসাকে বাড়তি সুযোগ দেয়। একটি পথে সমস্যা হলে অন্যটি ব্যবহার করা যায়।
এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ঢাকা–দিল্লির মধ্যে নিয়মিত সহযোগিতা প্রয়োজন। জাপান আলোচনায় সহায়ক ভূমিকা নিতে পারে। কিন্তু ভারত–জাপানের ঘনিষ্ঠতা দিয়ে বাংলাদেশ–ভারতের সব মতপার্থক্য মিটে যাবে না। সীমান্ত ও পরিবহনের বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান দু’দেশকেই করতে হবে।
কলকাতা–হলদিয়ার সামনে কী প্রশ্ন
মাতারবাড়ি কি কলকাতা ও হলদিয়ার ব্যবসা কমিয়ে দেবে? প্রশ্নটি স্বাভাবিক। এখনই তার নিশ্চিত উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।
বন্দর বেছে নেওয়ার সময় ব্যবসায়ী মোট খরচ, সময়, পরিষেবা এবং বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ দেখেন। কোনো পণ্যের জন্য মাতারবাড়ি সুবিধাজনক হতে পারে। অন্য পণ্যের ক্ষেত্রে কলকাতা বা হলদিয়াই ভালো বিকল্প থাকতে পারে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল কলকাতা ও হলদিয়াসহ ভারতের পূর্ব উপকূলের কয়েকটি বন্দর পরিদর্শন করেছিল। ভারতীয় পক্ষ তখন বাংলাদেশের পণ্য তৃতীয় দেশে পাঠানোর জন্য ভারতীয় বন্দর ব্যবহারের সুবিধা তুলে ধরেছিল।
এ থেকে বোঝা যায়, বাণিজ্যের পথ স্থায়ী নয়। খরচ ও পরিষেবা বদলালে পথও বদলাতে পারে। মাতারবাড়ির উন্নয়ন সেই হিসাবের মধ্যে নতুন একটি বিকল্প আনবে।
আবার সব সম্পর্ক প্রতিযোগিতার হবে, এমনও নয়। ভারত–বাংলাদেশ নৌপথে কলকাতা, হলদিয়া, মোংলা ও চট্টগ্রামের মধ্যে সংযোগের ব্যবস্থা রয়েছে। ভবিষ্যতে মাতারবাড়ি এই যোগাযোগের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হতে পারে, তা পরীক্ষা করার সুযোগ আছে।
পশ্চিমবঙ্গের কাছে তাই কাজটি দু’দিকের। নিজেদের বন্দর ও পরিবহন পরিষেবার মান বাড়াতে হবে। পাশাপাশি নতুন যোগাযোগে এখানকার ব্যবসার অংশ নেওয়ার জায়গাও খুঁজতে হবে। প্রতিবেশীর উন্নয়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের চেয়ে নিজের প্রস্তুতি বাড়ানো বেশি কাজে দেবে।
টহলযান দেওয়ার গুরুত্ব কতটা
সফরে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের জন্য একটি টহলযান সরবরাহের অনুদান চুক্তিও হয়েছে। জাইকার তথ্য অনুযায়ী, ২৬ অক্টোবর চুক্তিটি সই হয়। সর্বোচ্চ অনুদান ২.১২ বিলিয়ন ইয়েন। নকশা ও সংগ্রহসহ পরিকল্পিত বাস্তবায়নকাল ৩১ মাস।
বন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও সমুদ্রপথে বাণিজ্য বাড়লে নিরাপত্তার প্রয়োজনও বাড়ে। সেই দিক থেকে পদক্ষেপটির গুরুত্ব আছে। জাপান বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনীতির পাশাপাশি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও কাজ বাড়াচ্ছে।
কিন্তু এখান থেকে সামরিক ঘাঁটি বা কোনো দেশের বিরুদ্ধে জোটের সিদ্ধান্ত টানা যাবে না। সহযোগিতা কী কাজে ব্যবহার হবে, কতটা বিস্তৃত হবে এবং ভবিষ্যতে কী যুক্ত হবে—সেগুলো দেখে মূল্যায়ন করতে হবে।
ভারতের পক্ষে বিষয়টি নজরে রাখা স্বাভাবিক। তবে তথ্যের চেয়ে বড় সিদ্ধান্তে পৌঁছলে বিশ্লেষণের বদলে অনুমানই প্রাধান্য পাবে।
চীন কি এই হিসাবের বাইরে
মাতারবাড়িতে জাপানের ভূমিকা বাড়লেই চীন পিছিয়ে গেল—এভাবে বিষয়টি দেখা সহজ, কিন্তু যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের বিদেশি সম্পর্ক একটি বন্দর বা একটি অংশীদারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
নতুন যৌথ বিবৃতিতেও বিগ-বি’কে চীনবিরোধী উদ্যোগ বলা হয়নি। সেখানে ঝুঁকি সামলানো এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব রয়েছে।
একাধিক অংশীদার থাকলে বাংলাদেশের সামনে বিকল্প বাড়তে পারে। কিন্তু শুধু অংশীদারের সংখ্যা দিয়ে লাভ মাপা যায় না। প্রতিটি চুক্তিতে কত খরচ, কী দায় এবং কী সুবিধা রয়েছে, তা দেখতে হবে।
দিল্লিরও মনে রাখা প্রয়োজন, ঢাকা জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে নিজের উন্নয়ন ও কৌশলগত প্রয়োজন থেকে। ভারতের স্বার্থের সঙ্গে তার মিল থাকতে পারে, সব ক্ষেত্রে মিল থাকা বাধ্যতামূলক নয়। প্রতিবেশীর এই নিজস্ব হিসাব মেনেই সহযোগিতা এগিয়ে নিতে হয়।
ঋণ ও স্থানীয় মানুষের হিসাবও জরুরি
জাপান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু। কিন্তু বন্ধুত্ব প্রকল্পের আর্থিক হিসাবের বিকল্প নয়। জাইকার ঋণের সুদ, মেয়াদ ও কেনাকাটা সংক্রান্ত শর্ত থাকে। ঋণ নিয়ে তৈরি প্রকল্প কতটা ব্যবহার হবে এবং তার ব্যয় বহনের ক্ষমতা কতটা, তা বিচার করতেই হবে।
একইভাবে বন্দরের আশপাশের মানুষের কথা বাদ দেওয়া যায় না। জমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন, মাছ ধরার সুযোগ ও উপকূলীয় পরিবেশের প্রশ্ন রয়েছে।
জাইকা মাতারবাড়ি বন্দরকে পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাবের মূল্যায়নে ‘ক্যাটাগরি এ’ করেছে। অর্থাৎ, সম্ভাব্য বড় বিরূপ প্রভাব খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। এটি ক্ষতি অনিবার্য হওয়ার ঘোষণা নয়।
আঞ্চলিক সমৃদ্ধির আলোচনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন স্থানীয় মানুষও তার সুবিধা পাবেন। তাঁদের ক্ষতিকে উন্নয়নের স্বাভাবিক মূল্য ধরে নেওয়া যায় না।
সফরের পরে নজর থাকবে কাজে
তারেক রহমানের জাপান সফর গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত এনেছে। পুরনো সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া হয়েছে, নতুন দলিল সই হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের আশা তৈরি হয়েছে। তবে এগুলোর কোনোটিই নিজে থেকে অর্থনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত করে না।
এর পরে দেখতে হবে ঋণের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হলো, বিনিয়োগের কতটা এল, বন্দরের সঙ্গে শিল্প ও যোগাযোগের কাজ কতটা এগোল। বাংলাদেশের জন্য যেমন এই হিসাব জরুরি, ভারতের ব্যবসা ও নীতিনির্ধারকদের কাছেও তা গুরুত্বপূর্ণ।
কলকাতা–হলদিয়ার ভবিষ্যৎ মাতারবাড়ির সাফল্য বা ব্যর্থতার ওপর ছেড়ে দেওয়ার বিষয় নয়। নিজেদের পরিষেবা ভালো করা, পরিবহনের খরচ কমানো এবং নতুন ব্যবসার সুযোগ খোঁজার কাজ স্বাধীনভাবেই করতে হবে।
বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে নতুন পরিকল্পনা হচ্ছে। সেই পরিকল্পনায় ঢাকার সঙ্গে টোকিওর সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হচ্ছে। পূর্ব ভারতের সামনে এখন প্রয়োজন ঠান্ডা মাথায় হিসাব করা—কোথায় প্রতিযোগিতা আসবে, কোথায় সহযোগিতা সম্ভব এবং প্রস্তুতি কোথা থেকে শুরু করতে হবে।