১৯৭৪ সালের মে মাসে পুণের বসন্ত ব্যাখ্যানমালায় দেওয়া এক বক্তৃতায় দেওরস বলেছিলেন, “অস্পৃশ্যতা যদি অন্যায় না হয়, তা হলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই অন্যায় নয়।” তিনি আরও বলেছিলেন, অস্পৃশ্যতা কোনও সামান্য ভুল নয়, এটি সমাজের এক “ভয়ংকর ভুল”—এমন এক মর্মান্তিক ভ্রান্তি, যা কোনও আপস ছাড়াই মুছে ফেলতে হবে। তাঁর যুক্তি ছিল, ঐতিহ্যকে মূল্য দেওয়ার অর্থ ক্ষতিকর প্রথা আঁকড়ে থাকা নয়। বরং সমাজকে নিজের দুর্বলতাগুলি নিয়ে আত্মসমীক্ষা করতে উৎসাহ দিয়েছিলেন তিনি। সমস্ত দোষ বাইরের লোকের ঘাড়ে চাপানোর অভ্যাস সম্পর্কেও সতর্ক করেছিলেন। তাঁর কাছে দৈনন্দিন জীবনে সাম্যের অনুশীলন ছিল ব্যক্তিগত অঙ্গীকারের বিষয়। পরিবার, পাড়া এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন মেলামেশায় সবাইকে সঙ্গে নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলার দায়িত্ব তিনি স্বয়ংসেবকদের দিয়েছিলেন। এই পরিবার, পাড়া ও জনগোষ্ঠীগুলি মিলেই তো ভারতীয় সমাজ। ১৯৮৩ সালে ‘সামাজিক সমরসতা মঞ্চ’ গঠনের মাধ্যমে এই উদ্যোগগুলিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন তিনি।

বিশিষ্ট লেখক রমেশ পতঙ্গে আত্মসমীক্ষার মধ্য দিয়ে এবং জরুরি অবস্থার সময় কারাগারে আম্বেদকরের লেখা পড়ে সমরসতার ধারণাটিকে ব্যবহারিক দিক থেকে আরও প্রসারিত করেন। তাঁর বক্তব্য, সংবিধান আইনের দৃষ্টিতে সমান অধিকার নিশ্চিত করে; কিন্তু সাম্যের সংস্কৃতি লালন করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। এর অর্থ হতে পারে কোনও দলিত প্রতিবেশীকে বাড়িতে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো, কোনও দ্বিধা ছাড়াই তাঁর সঙ্গে হাসি-আড্ডায় মেতে ওঠা। মানুষের জন্মই তার মূল্য নির্ধারণ করে—এই ধারণাকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে এই ভাবনা। জাতপাতের বিনাশের লক্ষ্যে আম্বেদকরের সংগ্রামের সারকথাও ছিল সেটিই। আম্বেদকরের লেখা ও বক্তৃতায় গভীরভাবে আগ্রহী এবং অনুপ্রাণিত পতঙ্গে তাঁর ভাবনাকে বাস্তবে প্রয়োগ করেছিলেন। ১৯৮৮ সালে মহারাষ্ট্রে ‘সন্দেশ যাত্রা’র সময় দলিত নেতাদের আরএসএস স্বয়ংসেবকদের সঙ্গে একই মঞ্চে উপস্থিতিতে তার পরিচয় পাওয়া যায়।

বর্তমান সময়ে মোহন ভাগবতের দূরদর্শী নেতৃত্ব সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। তাঁর নেতৃত্বে জাতপাতের বৈষম্য প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে আরএসএসের অবস্থান আরও সোচ্চার হয়েছে। ২০২২ সালের অক্টোবরে এক বক্তব্যে তিনি বর্ণ ও জাতপাতের ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পদক্ষেপ করার আহ্বান জানান। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, বৈষম্য নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত সংরক্ষণ বহাল থাকা উচিত। তিনি এমন একটি জোরালো প্রশ্ন তোলেন, যা অতীতের অন্যায়ের প্রতিকার ও ক্ষতিপূরণমূলক ন্যায়বিচারের মূল ভাবনাকে স্পর্শ করে: যাঁরা এই ধরনের আচরণের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেয়েছেন, তাঁরা কেন ঐতিহাসিক অন্যায়ের প্রতিকারের জন্য নেওয়া ব্যবস্থাগুলিকে গ্রহণ করবেন না?

তাঁর কাছে সংরক্ষণ সম্পদ ও সুযোগে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। বিশেষত শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সেই সমস্ত সুযোগের ক্ষেত্রে, যেগুলি সমাজের বিশেষ কিছু অংশে জন্মানোর কারণে বহু জনগোষ্ঠীকে আগে দেওয়া হয়নি। ভাগবতের কাছে এই ধরনের উদ্যোগকে সমর্থন করা এবং সামাজিক সম্প্রীতির আহ্বান পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। আরএসএসের “এক মন্দির, এক কুয়ো এবং এক শ্মশান”-এর ভাবনা প্রকৃত অর্থে জাতপাতের বৈষম্য দূর করার বিষয়ে অনেক কথাই বলে। বাধাহীনভাবে জল তুলতে পারা, মর্যাদার সঙ্গে মন্দিরে প্রবেশ করা এবং জাতপাতের ভিত্তিতে আলাদা করে দেওয়ার ভয় ছাড়াই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারা—এসবই সাম্য ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের প্রকাশ।

আজ আরএসএস ভারতীয় সমাজের সমস্ত অংশের মধ্যে সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এক মন্দির, এক শ্মশানের আহ্বান এবং বিভিন্ন জাতের মানুষের একসঙ্গে খাওয়াদাওয়ার মতো উদ্যোগ ‘পঞ্চ পরিবর্তন’-এর পাঁচটি স্তম্ভের একটি স্তম্ভের অন্তর্গত। ‘পঞ্চ পরিবর্তন’-এর আওতায় সংগঠনের নানা উদ্যোগ মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শোনা এবং সহযোগিতার আহ্বান জানায়। এর ফলে ব্যক্তি, জনগোষ্ঠী ও সমাজ নিজেদের অভিন্ন সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ পায়। একই সঙ্গে এই অভিজ্ঞতা থেকে কার্যকর্তারাও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করেন।

সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক লালন করলে যোগাযোগ আর একবারের সাক্ষাতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা দীর্ঘস্থায়ী যোগাযোগের পথ তৈরি করে। হেডগেওয়ারের যৌথ কর্মকাণ্ডের ভাবনা থেকে দেওরস পর্যন্ত আমরা এক উল্লেখযোগ্য রূপান্তর দেখতে পাই। ভারতীয় জীবনাদর্শের প্রকৃত চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আরএসএসের ধারাবাহিক কাজের দিকেই তা ইঙ্গিত করে। সংগঠন বরাবরই ভারতীয়ত্বের চেতনায় বিশ্বাস করে এসেছে। এই চেতনাই তার সমতা ও সমরসতার কর্মসূচির মূল ভাবনার বার্তাবাহক।