ন্যায়বিচার দিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির ব্যর্থতায় হতাশ হয়ে জাপান ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশের মামলাকারীরা বিচারব্যবস্থার বাইরের প্রতিকারের পথ খোঁজেন। মারিও পুজোর দ্য গডফাদার (১৯৬৯) উপন্যাসে আদালতে ন্যায়বিচার না পেয়ে মৃতদেহের সৎকারের ব্যবসায়ী আমেরিগো বোনাসেরা সাহায্যের জন্য মাফিয়া ডন ভিটো কর্লিওনের দ্বারস্থ হন। ভারতে অবশ্য ধনী ও প্রভাবশালী পাওনাদারেরা প্রায়ই পুলিশের কাছে যান। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ‘প্রতারণা’ কিংবা ‘অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ’-এর অভিযোগ তুলে নিজেদের বিরোধকে ফৌজদারি মামলার চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

কেউ কেবল টাকা দেওয়ার চুক্তি ভঙ্গ করলেই এই অপরাধগুলির কোনওটি সংঘটিত হয় না। তা হলে এমন সব অভিযোগে পুলিশ কেন সক্রিয় হয়, যেগুলির মধ্যে প্রায়ই অপরাধের কোনও স্পষ্ট উপাদানই থাকে না? অভিযোগকারী পুলিশ অফিসারকে প্রস্তাব দেন, প্রতিপক্ষকে দিয়ে মীমাংসা করাতে পারলে তাঁকে বখরা দেওয়া হবে। এমন কথাও শোনা যায় যে, পুলিশের একটি শাখা এই ধরনের অভিযোগ হাতে নেওয়ার জন্য ‘কমিশনের ভিত্তিতে’ ঘুষ চায়। অবশ্য সব পুলিশ অফিসার এমন প্রলোভনে পা দেন না।

দেওয়ানি বিরোধে পুলিশ জড়িয়ে পড়লে প্রক্রিয়াটি এমন দ্রুততায় এগোয়, যার অভিঘাত মারাত্মক। দেওয়ানি মামলায় বিবাদীকে সচরাচর সশরীরে আদালতে হাজির হতে হয় না। কিন্তু পুলিশ ‘অভিযুক্ত’ দেনাদারকে অস্পষ্ট ভাষায় লেখা একটি তলবনামা পাঠিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে থানায় হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়। এমন তলবনামা পাওয়াটাই যথেষ্ট আতঙ্কজনক হতে পারে। এর পরে যা ঘটে, তা আরও ভয়াবহ।

পুলিশ তখন একটি ‘প্রাথমিক অনুসন্ধান’ চালায়। সেই সময়ে ‘অভিযুক্ত’ দেনাদারকে বিরোধ মিটিয়ে নিতে প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হয়। থানায় তাঁকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। সেখানে তিনি দেখেন, আরও গুরুতর অপরাধের ঘটনায় ধরা পড়া অন্যদের পুলিশ গালিগালাজ করছে কিংবা মারধর করছে। তাঁকেও ভয় দেখিয়ে জেরা করা হয়। পুলিশ হুমকি দেয়, মীমাংসায় রাজি না হলে তাঁকে, তাঁর স্বামী বা স্ত্রীকে, কিংবা পরিবারের সদস্যদের গ্রেফতার করা হবে। কয়েক ঘণ্টার এই ক্লান্তিকর নির্যাতনের পরে তাঁকে বাড়ি যেতে দেওয়া হয়। আবার বলে দেওয়া হয়, পরের দিন ফিরে আসতে হবে—আরও এক দফা একই দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে।

ব্যবসার জগতে সময়ই অর্থ। এই পরিবেশে অধিকাংশ মানুষ ভেঙে পড়েন। প্রথম তথ্য বিবরণী বা এফআইআর দায়ের হওয়ার আগেই বিরোধের মীমাংসা হয়ে যায়। কোনও কোনও বিবরণ অনুযায়ী, থানায় আসা এই ধরনের ঘটনার ৫০ শতাংশই প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর্যায়ে শেষ হয়ে যায়। যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি গ্রেফতার হওয়ার ভয়ও বিবাদীকে মীমাংসায় বাধ্য করার শক্তিশালী অস্ত্র। ভারতের কারাগারগুলির অবস্থা শোচনীয়। ফৌজদারি মামলা দায়ের হলে সামাজিক ও পেশাগত সুনাম নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও কাজ করে।

‘আইন ও সমাজ’ নিয়ে গবেষণা করেন যাঁরা, তাঁরা জানেন, ‘আইনের বইয়ে যা লেখা আছে’ এবং ‘বাস্তবে আইন যেভাবে কাজ করে’—এই দুয়ের মধ্যে প্রায়ই বিস্তর ফারাক থাকে। দেওয়ানি বিরোধকে ফৌজদারি মামলায় পরিণত করা ‘আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার’ বলে বিবেচিত হয়। সুপ্রিম কোর্ট বারবার এর নিন্দা করেছে এবং এমন প্রবণতা থেকে বিরত থাকতে বলেছে। কিন্তু বাস্তবে আইনের প্রয়োগের ছবিটা অন্য রকম।

যে ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার এবং কাজের সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন, তার জন্য আমাদের লোকবলের অভাবে ধুঁকতে থাকা, অতিরিক্ত কাজের চাপে জর্জরিত আদালতগুলিকেই দায়ী করা অন্যায় হবে। ভারতের দেওয়ানি বিচারব্যবস্থার ভিত গড়ে উঠেছে সেকেলে পদ্ধতির ওপর। বাদীর ডিক্রি পাওয়ার চেষ্টা বানচাল করতে বিবাদীকে এখানে সম্ভাব্য সমস্ত সুযোগ দেওয়া হয়। ১৮৭২ সালে প্রিভি কাউন্সিল মন্তব্য করেছিল, ‘ভারতে একজন মামলাকারীর দুর্ভোগ শুরু হয় ডিক্রি পাওয়ার পরে।’ আজও কথাটি সত্য।

এই সমস্ত কিছুই হতাশ মামলাকারীদের মধ্যে যাঁদের প্রভাবশালী যোগাযোগ রয়েছে, তাঁদের ঠেলে দিচ্ছে পুলিশ অফিসারদের কাছে—যাঁদের সততা কখনও কখনও প্রশ্নের মুখে পড়ে। এই অফিসারেরাই দেওয়ানি বিরোধে চটজলদি, সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে ‘বিচার’ করে দেন। এভাবেই গড়ে উঠছে দেওয়ানি ন্যায়বিচার দেওয়ার এক সমান্তরাল ব্যবস্থা।