বাংলাস্ফিয়ার: আমেরিকায় সম্প্রতি শিশুদের ফর্মুলা দুধের নিরাপত্তা নিয়ে জারি হওয়া সতর্কতা এই ধরনের পণ্যের পুষ্টিগত মান সম্পর্কে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সম্ভাব্য জীবাণুদূষণের কারণে তদন্ত এবং বাজার থেকে পণ্য প্রত্যাহারের কথা জানিয়েছে সে দেশের কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি ভারী ধাতু, কীটনাশক ও অন্যান্য রাসায়নিক দূষক শনাক্ত করতে আরও বিস্তৃত পরীক্ষাও চলছে। এই ঘটনাগুলি কাঁচামালের উৎস, উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় মাননিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির গুরুত্ব সামনে এনেছে।
ভারতেও বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান কর্তৃপক্ষের (এফএসএসএআই) একটি পদক্ষেপের পরে। একটি ফলো-আপ ফর্মুলার নমুনা পুনরায় পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেটি বায়োটিন বা ভিটামিন বি৭-এর নির্ধারিত মান পূরণ করেনি। পণ্যের লেবেলে বিভ্রান্তিকর দাবি করার অভিযোগেও পৃথক কার্যক্রম শুরু করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। পুষ্টিগত মান পূরণ না করা এবং দূষণ এক বিষয় নয়। তবে দু’টিই পণ্যের গুণমান, লেবেলে দেওয়া তথ্য এবং ক্রেতার আস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
নয়াদিল্লির পিএসআরআই হাসপাতালের ডায়েটেটিক্স বিভাগের প্রধান ডা. শালিনী গারউইন ব্লিসের মতে, অভিভাবকদের বিপণনের দাবির বাইরে গিয়ে সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলিতে নজর দিতে হবে। তাঁর কথায়, “শিশুর ভালো পুষ্টি নিশ্চিত করার অর্থ সবচেয়ে দামি পণ্য কেনা নয়; বরং প্রতিটি পর্যায়ে তার প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপদ ও সুষম পুষ্টি দেওয়া।”
ফর্মুলা দুধ নির্ধারিত পুষ্টিমান, বিশেষ করে বায়োটিনের মান পূরণ না করলে কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি হতে পারে?
দ্রুত বৃদ্ধি ও বিকাশের কারণে শিশুর পুষ্টির প্রয়োজন প্রাপ্তবয়স্কদের থেকে অনেকটাই আলাদা। বায়োটিন শরীরকে চর্বি, শর্করা ও প্রোটিনের বিপাকক্রিয়ায় সাহায্য করে। এর ঘাটতিতে ত্বকে র্যাশ, চুল পড়ে যাওয়া, খেতে অনীহা বা কম খাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে স্নায়বিক উপসর্গও হতে পারে।
ফর্মুলা দুধের নির্ধারিত পুষ্টিমান পূরণ করা জরুরি, কারণ প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পাওয়ার জন্য শিশুরা এর ওপর নির্ভরশীল হতে পারে। কোনও পণ্যের গুণমান নিয়ে উদ্বেগ থাকলে অভিভাবকদের নিজের সিদ্ধান্তে শিশুর খাবার বদলে না দিয়ে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
প্রথম ছয় মাস শুধু মাতৃদুগ্ধ খাওয়ানো কতটা জরুরি? কখন ফর্মুলা দুধ প্রয়োজন হতে পারে?
প্রথম ছয় মাস শিশুকে শুধু মাতৃদুগ্ধ খাওয়ানোর সুপারিশ করা হয়। কারণ মায়ের দুধ প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের পাশাপাশি এমন অ্যান্টিবডি দেয়, যা শিশুকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। তবে প্রত্যেক মায়ের পরিস্থিতি আলাদা। চিকিৎসাগত কারণ বা স্তন্যপান করানোর অসুবিধার জন্য ফর্মুলা দুধের প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে শিশুর পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করাই অগ্রাধিকার। মা যে ভাবেই শিশুকে খাওয়ান না কেন, তাঁকে অপরাধবোধে না ভুগিয়ে বা তাঁর সিদ্ধান্তের বিচার না করে সহায়তা করা প্রয়োজন।
ফর্মুলা দুধের বিকল্প কী?
ছয় মাসের কম বয়সি শিশুর জন্য মাতৃদুগ্ধই প্রথম পছন্দ। স্তন্যপান সম্ভব না হলে স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত বাণিজ্যিক ইনফ্যান্ট ফর্মুলার প্রয়োজন হতে পারে। পশুর দুধ, উদ্ভিদজাত পানীয় এবং বাড়িতে তৈরি ফর্মুলা ছোট শিশুর জন্য নিরাপদ বিকল্প নয়। কারণ এগুলিতে পুষ্টি উপাদানের সঠিক ভারসাম্য না-ও থাকতে পারে।
প্রায় ছয় মাস বয়স থেকে মাতৃদুগ্ধ বা ফর্মুলা দুধের পাশাপাশি ভালো করে রান্না করা সবজি, ফল, শস্য ও ডালের মতো পরিপূরক খাবার দেওয়া শুরু করা যায়। খাবার থেকে আয়রন, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। শিশুর বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে খাবারে বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে এবং তার উপযোগী করে খাবারের ঘনত্ব ও বুনোট বদলাতে হবে।
রোগপ্রতিরোধ, হজম ও মস্তিষ্কের বিকাশ নিয়ে বিপণনের দাবি থেকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আলাদা করবেন কী ভাবে?
“রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়” বা “মস্তিষ্কের বিকাশে সাহায্য করে”—এ ধরনের দাবি আশ্বস্ত করতে পারে। কিন্তু অভিভাবকদের প্যাকেটের লেখার বাইরে গিয়েও বিচার করতে হবে। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।
কোনও বিশেষ উপাদান থাকলেই যে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে, দ্রুত বৃদ্ধি হবে বা বিকাশ আরও ভালো হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পণ্যটি শিশুর সামগ্রিক পুষ্টির প্রয়োজন পূরণ করছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞাপন বা সমাজমাধ্যমের প্রচারের ওপর নির্ভর না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বাণিজ্যিক শিশুখাদ্যে বাড়তি চিনি থাকলে স্বাস্থ্যের কী ক্ষতি হতে পারে?
শিশুদের খাবারে বাড়তি চিনি যোগ করার প্রয়োজন নেই। ঘন ঘন মিষ্টি খাবার খেলে দাঁতের ক্ষয় হতে পারে এবং বেশি মিষ্টি খাবারের প্রতি ঝোঁক তৈরি হতে পারে। এর ফলে আরও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্যাকেটের সামনে “স্বাস্থ্যকর” বা “পুষ্টিকর” লেখা দেখেই নির্ভর না করে উপাদানের তালিকায় চিনি, গ্লুকোজ সিরাপ বা অন্য কোনও মিষ্টিকারক আছে কি না, তা দেখা উচিত। বাড়তি মিষ্টি যোগ করা হয়নি, এমন বয়সোপযোগী খাবার বেছে নিলে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে উঠতে সাহায্য করে। এক বছরের কম বয়সি শিশুকে মধু দেওয়া উচিত নয়।
হিউম্যান মিল্ক অলিগোস্যাকারাইডস বা এইচএমও এবং হোয়ে প্রোটিন থাকলেই কি একটি ফর্মুলা অন্যটির চেয়ে ভালো?
অবশ্যই তা নয়। এইচএমও হল জটিল ধরনের শর্করা, যা স্বাভাবিক ভাবে মাতৃদুগ্ধে থাকে। আর হোয়ে হল দুধের একটি প্রোটিন। কিছু উপাদান মায়ের দুধের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য অনুকরণ করতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু ফর্মুলা দুধ মাতৃদুগ্ধের সম্পূর্ণ গঠন পুনরুৎপাদন করতে পারে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল পণ্যটির পুষ্টিগত পর্যাপ্ততা, নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট শিশুর নিজস্ব প্রয়োজনের সঙ্গে তার উপযোগিতা। বিশেষ প্রয়োজনের ফর্মুলা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে বেছে নিতে হবে। শুধু দামি বা বিশেষ মানের উপাদান থাকার বিজ্ঞাপন দেখে তা নির্বাচন করা উচিত নয়।
প্যাকেটজাত শিশুখাদ্যের লেবেলে কী দেখবেন? দূষণ নিয়ে কতটা সতর্ক থাকা প্রয়োজন?
অভিভাবকদের দেখতে হবে পণ্যটি কোন বয়সের শিশুর জন্য উপযোগী, উপাদানের তালিকায় কী রয়েছে, পুষ্টিসংক্রান্ত তথ্য কী বলছে, মেয়াদ কত দিন, কী ভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং প্যাকেট অক্ষত রয়েছে কি না।
ভারী ধাতু, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ এবং ক্ষতিকর জীবাণুর উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কাঁচামাল, জল, প্রক্রিয়াকরণ বা খাবার নাড়াচাড়ার সময় এই দূষকগুলি খাদ্যে প্রবেশ করতে পারে। কিছু দূষকের সংস্পর্শ শিশুর বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্য দিকে, জীবাণুদূষণ গুরুতর অসুস্থতা ঘটাতে পারে।
পণ্য দেখে বা তার লেবেল পড়ে সব সময় দূষণ শনাক্ত করা সম্ভব নয়। তাই প্রস্তুতকারকের মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, পরীক্ষাগারে পরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি অপরিহার্য। অভিভাবকদের নির্ভরযোগ্য জায়গা থেকে পণ্য কিনতে হবে, নিরাপদ জল ব্যবহার করতে হবে, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে এবং সরকারি পণ্য প্রত্যাহারের বিজ্ঞপ্তি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নির্দেশে নজর রাখতে হবে।
গুঁড়ো ফর্মুলা দুধ জীবাণুমুক্ত নয়। তাই তা প্রস্তুত ও সংরক্ষণের নির্দেশ সতর্ক ভাবে মেনে চলতে হবে। জল ফোটালেই ভারী ধাতুর মতো রাসায়নিক দূষক দূর হয় না।
নিরাপদ, সুষম ও বয়সোপযোগী পুষ্টি নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের কী করা উচিত?
বিপণনের দাবির বদলে শিশুর পুষ্টির প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথম ছয় মাস শুধু মাতৃদুগ্ধ এবং তার পরে স্তন্যপান চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরিপূরক খাবার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। যেখানে ফর্মুলা দুধ প্রয়োজন, সেখানে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে উপযুক্ত পণ্য বেছে নিতে হবে এবং প্রস্তুত করার নির্দেশ হুবহু মানতে হবে।
প্রায় ছয় মাস বয়স থেকে নানা ধরনের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার দেওয়া শুরু করতে হবে। বাড়তি চিনি ও নুন এড়িয়ে চলতে হবে, খাবারের মেয়াদ পরীক্ষা করতে হবে এবং খাবার তৈরি, পরিবেশন ও সংরক্ষণে নিরাপদ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
সমাজমাধ্যমের পরামর্শ দেখে ফর্মুলা দুধ বদলানো, পুষ্টির পরিপূরক যোগ করা বা বাড়িতে ফর্মুলা তৈরির চেষ্টা করা উচিত নয়। শিশুর বারবার বা দীর্ঘস্থায়ী বমি, খেতে অসুবিধা কিংবা যথেষ্ট ওজন না বাড়ার মতো সমস্যা হলে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। শিশুর নিরাপদ পুষ্টি নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত পুষ্টিমান এবং খাদ্যনিরাপত্তা—দুই-ই জরুরি।