শুভ্রাংশু মুখোপাধ্যায় | ডেটলাইন মিউনিখ

বসার ঘরে তখন গানের মহড়া চলছে। কেউ নাচের তাল মেলাচ্ছেন, কেউ গানের কোন অংশটা আর একবার গাইতে হবে, তা নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে ভুল হচ্ছে, হাসাহাসি হচ্ছে, আবার শুরু হচ্ছে মহড়া। আমার স্ত্রী এসবের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি উৎসাহী। পুজোর আগে কখনও আমাদের বাড়িতে, কখনও অন্য সদস্যদের বাড়িতে চলে এমনই মহড়া। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তার ঘনঘটা বাড়লেই বুঝে যাই, মা দুর্গা দোরগোড়ায়।

কলকাতায় থাকতে পাড়ার মোড়ে বাঁশ পড়া, প্যান্ডেল তৈরির শব্দ কিংবা নতুন জামাকাপড়ের দোকানে ভিড় দেখেই পুজোর আগমন টের পেতাম। মিউনিখে সেই অনুভূতিটা আসে একটু অন্যভাবে। এখানে শিউলি নেই, কাশফুলও নেই। বদলে রয়েছে শরতের রঙিন পাতা আর শীতের আগাম বার্তা। কিন্তু বাঙালির পুজোর উন্মাদনায় ভৌগোলিক দূরত্ব বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেনি।

২০১৪ সালে প্রথম জার্মানিতে আসা, আর ২০১৫ সাল থেকে মিউনিখে বসবাস। তখন দুর্গাপুজোর খোঁজ করতে গিয়ে মূলত বাংলাদেশি বাঙালিদের আয়োজিত একটি পুজোর কথাই জানতে পেরেছিলাম। আজ সেই শহরেই প্রায় পাঁচটি দুর্গাপুজো হয়। গত এক দশকে মিউনিখের বাঙালি সমাজ যেমন বড় হয়েছে, তেমনই বেড়েছে একসঙ্গে উৎসব করার ইচ্ছা।

তবে এই উৎসবের গুরুত্ব আমার কাছে নতুনভাবে ধরা দিয়েছিল করোনার সময়।

২০২০ ও ২০২১ সালে জমায়েতের বিধিনিষেধে অনেক আয়োজনেই প্রবেশ সীমিত ছিল। আমি আর আমার স্ত্রী তখন কোনও পুজো আয়োজক সংগঠনের সদস্য ছিলাম না। ফলে পুজোর দিনগুলোতেও অনেক সময় বাড়িতে কাটাতে হয়েছে। কলকাতার চেনা আনন্দ থেকে দূরে থাকার কষ্টটা তখন বেশ বুঝেছিলাম।

সেই অভিজ্ঞতার পরই সিদ্ধান্ত নিই, শুধু দর্শক হয়ে থাকব না। পুজোর আয়োজনের সঙ্গেও যুক্ত হব। তারপর কত মানুষের সঙ্গে আলাপ, কত বন্ধুত্ব। প্রবাসে এই উৎসব যে শুধু ধর্মীয় আচার নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গড়ে তোলারও উপলক্ষ, সেটা ধীরে ধীরে বুঝেছি।

২০২৪ সালের পুজোটা অবশ্য আমার কাছে চিরকাল বিশেষ হয়ে থাকবে।

সেবার বাবা-মাকে কলকাতা থেকে মিউনিখে নিয়ে এসেছিলাম। আনন্দটা আরও বেড়ে গেল যখন আমার ভাইও আমেরিকার সিয়াটল থেকে উড়ে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিল। কলকাতা, সিয়াটল আর মিউনিখ, তিন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা পরিবারের সবাই আবার একসঙ্গে!

ছোটবেলায় কলকাতার পুজো মানেই ছিল বাবা-মায়ের হাত ধরে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়ানো। ভিড়ের মধ্যে হাতটা যাতে ছুটে না যায়, সেই সাবধানতা। কোথায় যাব, কী খাব, কখন বাড়ি ফিরব, সব ঠিক করতেন তাঁরাই। আমাদের আবদার থাকত, আরও একটা ঠাকুর দেখে বাড়ি ফিরব।

বহু বছর পর ছবিটা যেন উল্টে গেল। এবার আমরা দুই ভাই বাবা-মাকে নিয়ে মিউনিখের পুজোয় বেরিয়েছি। চারপাশে কলকাতার পরিচিত রাস্তা নেই, কিন্তু ঢাকের আওয়াজ আর পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ শুনে পুরোনো দিনগুলোই ফিরে আসছিল। তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে অঞ্জলি দেওয়ার মুহূর্তে মনে হয়েছিল, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন, কিছু সম্পর্ক আর স্মৃতির দূরত্ব হয় না।

পরের বছর, ২০২৫ সালে, আমাদের মিউনিখের পুজোর ছবি ও খবর বাংলার সংবাদমাধ্যমে পৌঁছেছিল। এতদিন বিদেশে বসে কলকাতার পুজো দেখেছি। সেবার মনে হয়েছিল, কলকাতাও যেন একটু ফিরে তাকিয়েছে আমাদের দিকে।

আর এ বছর, ২০২৬ সালে, নতুন অভিজ্ঞতা। আমরা একেবারে গোড়া থেকে একটি বারোয়ারি পুজোর আয়োজন করছি।

প্রস্তুতি শুরু হয় জুলাই থেকেই। অগস্টে স্কুলের ছুটিতে যাঁরা কলকাতায় যান, তাঁদের অনেকের উপরেই পড়ে পুজোর সামগ্রী নিয়ে আসার দায়িত্ব। কারও ব্যাগে ধূপ, কারও সুটকেসে পুজোর বাসন। এবার ঢাক পর্যন্ত আনতে হয়েছে কলকাতা থেকে। ফলে ছুটি কাটিয়ে ফেরার সময় লাগেজের ওজন নিয়ে চিন্তা যে একটু বাড়ে, তা বলাই বাহুল্য!

তারপর হল খোঁজা। মিউনিখে চাইলেই রাস্তার পাশে প্যান্ডেল তৈরি করা যায় না। কোথাও অগ্নিনিরাপত্তার কারণে হোমযজ্ঞের অনুমতি নেই, কোথাও দর্শনার্থীর সংখ্যা সীমিত। সব শর্ত মেনে উপযুক্ত হল খুঁজে পাওয়াই এক বিরাট যজ্ঞ।

সঙ্গে শিল্পী আনা, অন্য শহরের আয়োজকদের সঙ্গে যৌথ অনুষ্ঠানের আলোচনা, প্রসাদ, ভোগ, আমন্ত্রণ, প্রচার আর খাবারের মেনু ঠিক করা। সময়ের হিসাবও আলাদা। গ্রীষ্মকালীন সময় অনুযায়ী জার্মানি কলকাতার থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা পিছিয়ে। তবু অঞ্জলি কিংবা সন্ধিপুজোর নির্ঘণ্টে কলকাতার সময়টাও যথাসম্ভব মাথায় রাখি। অফিসের কাজ সামলে এসব আয়োজন সহজ নয়।

প্রতিমা আনা-নেওয়ার দলে যুক্ত হয়ে বুঝেছি, কতখানি পরিশ্রম লুকিয়ে থাকে এর পিছনে। এখানে প্রতি বছর নতুন প্রতিমা আনা সম্ভব হয় না বলে পুজোর পর প্রতিমাকে যত্ন করে স্টোরেজ ইউনিটে রাখা হয়। পরের বছর আবার সেখান থেকে আনা হয়। কেউ সাজসজ্জা করেন, কেউ পুজোর আচার সামলান, কেউ খাবারের ব্যবস্থা। এতগুলো ছোট ছোট দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উৎসবটা দাঁড়িয়ে যায়।

আর সেই মুহূর্তে ক্লান্তির কথা মনেই থাকে না।

পুজোর দিনগুলোয় মিউনিখের রাস্তায় আমাদের সাজসজ্জাও একটু বদলে যায়। অক্টোবরফেস্টে লেডারহোজেন আর ডির্ন্ডলের পরিচিত ছবির মধ্যে শাড়ি আর পায়জামা-পাঞ্জাবিও নিজেদের জায়গা করে নেয়। কলকাতা থেকে যত্ন করে আনা নতুন পোশাকগুলো অবশেষে আলমারি থেকে বেরোয়।

যদিও সমস্যা একটা আছে। ঠান্ডা!

অনেক সময় শাড়ি-পাঞ্জাবির উপর জ্যাকেট চাপিয়ে বেরোতে হয়। সুযোগ পেলেই তাই জ্যাকেট খুলে বাঙালি সাজটা উপভোগ করি। স্থানীয় জার্মানদের প্রশংসাও মেলে। আমার স্ত্রীকে শাড়ি পরে যাতায়াতের পথে একাধিকবার প্রশংসা শুনতে হয়েছে।

পুজোর পাঁচ দিনে আমাদের আয়োজনে প্রায় এক হাজার মানুষের সমাগম হয়। ষষ্ঠী থেকে দশমী, অঞ্জলি, সন্ধিপুজো, ধুনুচিনাচ, সিঁদুরখেলা, কোনও আনন্দেরই অভাব থাকে না। আমাদের পুজোয় আবার এক মহিলা ঢাকিও আছেন, যিনি সম্পর্কে আমার স্ত্রী। তাই ঢাকের আওয়াজ শুনলে আমার উৎসাহটা একটু বেশিই!

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচ, গান, শ্রুতিনাটক, নাটক, সবই থাকে। নবরাত্রি উপলক্ষে ডান্ডিয়ারও আয়োজন করি। ভালো লাগে যখন স্থানীয় জার্মান অতিথিরাও আমাদের সঙ্গে ডান্ডিয়া কিংবা ধুনুচিনাচে অংশ নেন। মিউনিখের ভারতীয় কনস্যুলেটও এই উদ্যোগে সহযোগিতা করে।

আর খাওয়াদাওয়া? পুজোর ওই পাঁচ দিন আমাদের বাড়িতে কার্যত হাঁড়িই চড়ে না।

সবাই মিলে খাওয়া, আড্ডা, হইহুল্লোড়। অনেকে নিজের হাতে তৈরি খাবার নিয়ে আসেন। কেউ চেনা বাঙালি পদ, কেউ অভিনব ফিউশন রান্না। ছোট ছোট খাবারের স্টলগুলো দেখে কখনও মনে হয়, কলকাতার কোনও পুজোমণ্ডপের পাশের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি।

এই উৎসবের আর একটা বড় প্রাপ্তি এখানেই জন্মানো বাঙালি পরিবারের শিশুরা। মা দুর্গার দশটা হাত কেন, ঢাক কেন বাজে, অঞ্জলি কী, তাদের প্রশ্নের শেষ নেই। গান, নাচ, আবৃত্তি কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে নিজেদের প্রতিভা দেখানোর সুযোগও পায় তারা। আমাদের কাছে যে পুজো শৈশবের স্মৃতি, তাদের কাছে সেটাই নিজেদের শিকড় চেনার পথ।

পুজো শেষে প্রতিমাকে আবার যত্ন করে রেখে আসতে হয়। খুলে যায় সাজসজ্জা, ফাঁকা হয়ে যায় হল। প্রত্যেকে ফিরে যান নিজের কর্মব্যস্ত জীবনে।

কিন্তু এই কয়েকটা দিনের মধ্যে তৈরি হওয়া সম্পর্কগুলো রয়ে যায়।

কলকাতার পুজোয় মানুষ ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। আর মিউনিখে, হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে, পুজো যেন আমাদের জন্য একটা নতুন ঘর তৈরি করে দেয়।

সেই ঘরে আত্মীয়তার জন্য রক্তের সম্পর্ক লাগে না। লাগে শুধু একসঙ্গে কিছু করার ইচ্ছা, একটু সময় আর অনেকখানি ভালোবাসা।

তাই আমার কাছে প্রবাসের দুর্গাপুজো শুধু মায়ের আরাধনা নয়। এ একসঙ্গে থাকার আনন্দ, পুরোনো স্মৃতিকে নতুন করে বাঁচিয়ে রাখা এবং বিদেশের মাটিতে নিজেদের একটু কলকাতা তৈরি করে নেওয়ার গল্প।