বাংলা স্ফিয়ার: পাঁচ বছরের একটি শিশুকে ছবি আঁকতে বলুন। প্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সে তুলির দিকে হাত বাড়াবে। কিন্তু একই কথা একজন প্রাপ্তবয়স্ককে বললে তিনি অনেক সময় ইতস্তত করবেন, পিছিয়ে যাবেন। গবেষকেরা এখন বলছেন, এর কারণ তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন।

শিশুরা বড়দের চেয়ে বেশি সৃজনশীল—এমন ধারণা বহুল প্রচলিত। কিন্তু নতুন একটি গবেষণা সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে প্রাক্‌বিদ্যালয় বয়সের শিশুদের চেয়ে প্রাপ্তবয়স্কেরা ভালো করেন। অথচ ওই কাজ করতে গিয়ে সাধারণত তাঁদের আত্মবিশ্বাস কম থাকে এবং উদ্বেগ বেশি হয়।

অস্ট্রিয়ার গ্রাৎস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং গবেষণাপত্রটির জ্যেষ্ঠ লেখক ডক্টর ম্যাথিয়াস বেনেডেক বলেন, “শিশুরা নিজেদের আগ্রহে এতটাই উজ্জীবিত থাকে এবং খেলায় এত গভীরভাবে ডুবে যায় যে, আমরা প্রায়ই তাদের এই তন্ময়তাকেই বেশি সৃজনশীল ক্ষমতা বলে ভুল করি।”

একটি পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণায় চার থেকে সাত বছর বয়সি ৯২ জন প্রাক্‌বিদ্যালয় পর্যায়ের শিশু এবং ৭০ জন প্রাপ্তবয়স্ককে তিনটি কাজ করতে দেওয়া হয়েছিল। প্রাপ্তবয়স্কদের অধিকাংশের বয়স ছিল কুড়ির কোঠায়।

প্রথম কাজে তিন মিনিটের মধ্যে একটি টিনের কৌটোকে যত রকম সৃজনশীল উপায়ে ব্যবহার করা যায়, তা ভাবতে বলা হয়েছিল। দ্বিতীয় কাজে অংশগ্রহণকারীদের ইচ্ছেমতো ছবি আঁকতে বলা হয়; এর জন্য কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি। তৃতীয় কাজে আট মিনিটের মধ্যে একটি কাল্পনিক প্রাণীর ছবি আঁকতে বলা হয়েছিল।

এর পরে মূল্যায়নকারীরা কাজগুলির মৌলিকতা, উপযোগিতা এবং সামগ্রিক সৃজনশীলতা বিচার করেন।

পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীদের জানাতে বলা হয়, প্রতিটি কাজ করতে তাঁদের কতটা ভালো লেগেছে, তাঁরা কতটা উৎসাহ ও আত্মবিশ্বাস বোধ করেছেন এবং কাজের সময় কতটা উদ্বিগ্ন ছিলেন।

মূল্যায়নকারীদের বিচারে শিশুদের তুলনায় প্রাপ্তবয়স্কদের কাজ ছিল বেশি মৌলিক, উপযোগী এবং সৃজনশীল। বিশেষ করে যখন স্পষ্ট লক্ষ্য ও সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, তখন এই পার্থক্য বেশি ধরা পড়ে। অন্য দিকে, শিশুদের নিজেদের দেওয়া মূল্যায়নে দেখা যায়, কাজগুলি করার সময় তারা বেশি আত্মবিশ্বাসী ও উৎসাহী ছিল এবং কম উদ্বেগ বোধ করেছে।

বেনেডেক বলেন, “প্রাপ্তবয়স্কেরা শিশুদের চেয়ে ভালো করেছেন। তাঁদের মধ্যে সৃজনশীলতার সম্ভাবনাও বেশি দেখা গিয়েছে। অথচ তাঁদের আত্মবিশ্বাস ছিল অনেক কম। নিজেদের মৌলিক ভাবনা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা বড়দের কেন এত উদ্বিগ্ন করে তোলে, তা আমাদের খতিয়ে দেখা দরকার।”

তাঁর কথায়, শিশুরা নিজেদের আগ্রহের টানে কাজ শুরু করে এবং খেলার প্রক্রিয়াটিই উপভোগ করে। “অন্য দিকে, প্রাপ্তবয়স্কেরা লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের উপরে বেশি জোর দেন”—যা তাঁদের আনন্দ পাওয়ার সুযোগ কমিয়ে দেয়।

এর ফলে শিশুরা অনেক বেশি স্বাধীনভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এবং ভুলকে গোটা প্রক্রিয়ারই অংশ হিসেবে নেয়। কিন্তু অন্যেরা কী ভাববে বা কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেই আশঙ্কায় প্রাপ্তবয়স্কেরা প্রায়ই অচেনা বা অপ্রচলিত কোনও ভাবনা চেষ্টা করে দেখার আগেই বাতিল করে দেন।

বেলজিয়ামের ইউসিলুভাঁ এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় অস্ট্রিয়ার গ্রাৎস বিশ্ববিদ্যালয়ে এই গবেষণা করা হয়েছে। তবে গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। যেমন, একটি নির্দিষ্ট সময়ে মাত্র দু’টি বয়সের গোষ্ঠীর মধ্যে তুলনা করা হয়েছে। ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সৃজনশীলতার কী পরিবর্তন হয়, তা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন। তা ছাড়া, কোনও অভিজ্ঞতার মাত্রা বোঝাতে দেওয়া মূল্যায়ন-স্কেলে শিশুরা একেবারে দুই প্রান্তের উত্তর বেছে নেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখায়। তাদের চিন্তা ও বোঝার ক্ষমতার সঙ্গেও প্রাপ্তবয়স্কদের স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

তা সত্ত্বেও বেনেডেক ও তাঁর সহকর্মীদের মতে, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৃজনশীলতা ফিকে হয়ে যায়—এই ধারণা ভ্রান্ত।

বেনেডেকের কথায়, “প্রাপ্তবয়স্কেরা তাঁদের সৃজনশীলতা হারান না। তাঁরা হারিয়ে ফেলেন সেই সৃজনশীলতাকে কাজে লাগানোর আত্মবিশ্বাস।”