সময় যে কতটা নিষ্ঠুর, সেই সত্য পৃথিবীর তাবড় রাষ্ট্রনেতা থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদরা বারবার বুঝতে পেরেছেন। রাজনীতিতে সেজন্যই সময়ের মূল্য প্রচুর। সময় হলে রাজনীতিতে এমন বহু বদল আসে যার ধারনাও করা যায় না। শুধু ঘটনাকে পরিপক্ক হওয়ার সময় দিতে হয়। আর তারপরেই ঘটে যায় “মিরাকল” অথবা “ডিজাস্টার”।
তৃণমূলের জন্য বাংলার ভাগ্যবিধাতা এবং সময় যে এমন নিষ্ঠুর পরিহাস তুলে রেখেছিল তা কি আজ থেকে মাস দুয়েক আগেও ধারণা করতে পেরেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী, তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! পরিহাস ছাড়া আর কিই বা বলা যায়! দু মাসের মাথায় রাজ্যের চিত্রটা আমূল বদলে গিয়েছে। যারা বিরোধী দলের আসনে ছিল তারা আজ শাসকের সিংহাসনে, অন্যদিকে যিনি শাসক হয়ে বিরোধীদের প্রতি মুহূর্তে চাপে রেখেছিলেন তিনি আজ বিরোধী হয়ে রাস্তায় নেমেছেন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে। বুধবার, ১৭ জুন রাজ্যজুড়ে হকার উচ্ছেদের প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ধর্মতলায় মানববন্ধন করেছেন তিনি। এরপর তার নেতৃত্বে শুরু হলো লেনিন সরণী ধরে সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার পর্যন্ত পদযাত্রা। অন্যদিকে ঠিক দু মাস আগে এপ্রিলে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের একেবারে শেষ বেলায় দক্ষিণ কলকাতার এলাকায় এক বিরাট পদযাত্রার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
একই নেত্রী, অথচ তার আশপাশের চিত্রটা সম্পূর্ণ আলাদা। দুমাস আগেও যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে সামান্য জায়গা করে নেওয়ার জন্য দাপুটে নেতা-নেত্রী থেকে শুরু করে চিত্র তারকা কে না প্রতিযোগিতা করেছিলেন! মুখ্যমন্ত্রী আশপাশ ঘিরে ছিল চাঁদের হাট। অথচ দুমাস পরে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে শুধুমাত্র দোলা সেন এবং কুনাল ঘোষ ছাড়া আর প্রায় কাউকেই দেখতে পাওয়া গেল না। গত ১৫ বছর ধরে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেক নজরে পড়বার তাড়া ছিল তৃণমূল আলো করে থাকা সাংসদ বিধায়কদের, ১৫ বছরের তৃণমূলী শাসন শেষ হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল নেত্রীর সঙ্গ ছাড়ার বাসনা দেখা গেল সেই নেতা নেত্রীদের মধ্যেই। বর্তমানে বিরোধী আসনে থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশপাশ এখন শূন্য। বেশিরভাগই এখন বিক্ষুব্ধ, কেউ নাম লিখিয়েছেন এনসিপিআই শিবিরে। কেউবা ভোটে জিততে না পেরে নিজেও নিজ নিজ পেশায় মনোনবেশ করছেন। কেউবা সুযোগ বুঝে পাশ কাটিয়েছেন এবং অনেকেই এখন হাজতে। ১৫ বছরের যে পরিচিত ভিড় দেখা যেত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশপাশে বুধবার সেই ভিড় আর দেখতে পাওয়া গেল না।
সূত্রের খবর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের কয়েকজনকে জানিয়েছিলেন হকারদের সঙ্গে তিনি কথা বলতে চান। পুনর্বাসন না দিয়ে যেভাবে হকার উচ্ছেদ হচ্ছে তাদের পাশে থাকার বার্তা দিতে হবে। তিনি কোথায় যাবেন তেমন আগাম খবর দেননি। বুধবার বেলা ৩.৩০ নাগাদ কালীঘাটের বাড়ি থেকে বেলেঘাটার বিধায়ক কুনাল ঘোষ এবং দোলা সেন কে সঙ্গে নিয়ে তিনি সোজা পৌঁছে যান ধর্মতলায়। সেখানে মানববন্ধনও করেন। তৃণমূল নেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে দেখতে ভাল ভিড়ও জমে ধর্মতলায়। তবে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে যথেষ্ট কড়া নজর রেখেছিলেন । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য মোতায়েন করা হয়েছিল বিরাট পুলিশ বাহিনী।
হকার উচ্ছেদের প্রতিবাদে এর আগেও পথে নামের তৃণমূল। দাবি ছিল উচ্ছেদ নয় পুনর্বাসন চাই। শিয়ালদার প্রাচী সিনেমায় অবস্থান বিক্ষোভ করেছিলেন দলের নেতারা। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্রের অনুরোধেই এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তৃণমূল নেত্রী। কলকাতা শহরে হকার সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে মদন মিত্রের। সম্প্রতি বিভিন্ন জায়গায় উচ্ছেদ নিয়ে হকারদের মধ্যে ক্ষোভ এবং উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় তারা প্রতিবাদ কর্মসূচির দাবি জানিয়েছিলেন।। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই মদন মিত্র বিষয়টি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নজরে আনেন এবং পরে ধর্মতলায় প্রতিবাদ সবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দলীয় নেতাদের নিয়ে ডাকা একাধিক বৈঠকে চোখে পড়ার মতো কম উপস্থিতি দেখা গিয়েছে বিধায়ক সাংসদদের। এবার মাঠে নেমে শুরু করা প্রথম কর্মসূচিতেই বিরাট ধাক্কা খেলো তৃণমূল কংগ্রেস। কারণ অনুপস্থিত ছিলেন তৃণমূলের অর্ধেকের বেশি বিধায়ক।
কারণ, সেই কাল চক্র!