হেমন্ত সোরেনের পদত্যাগ দাবি, বাসভবন ঘেরাওয়ের ডাক ঝাড়খণ্ডের চাকরিপ্রার্থীদের

যা জানা জরুরি
- ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন আরও তীব্র হচ্ছে।
- টানা অবস্থান-বিক্ষোভের মধ্যেই আন্দোলনকারীরা ঘোষণা করেছেন, আগামী ২০ আগস্ট মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের সরকারি বাসভবন ঘেরাও করা হবে।
- পরীক্ষায় কথিত দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে বলেও তাঁরা দাবি তুলেছেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন আরও তীব্র হচ্ছে। টানা অবস্থান-বিক্ষোভের মধ্যেই আন্দোলনকারীরা ঘোষণা করেছেন, আগামী ২০ আগস্ট মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের সরকারি বাসভবন ঘেরাও করা হবে। পরীক্ষায় কথিত দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে বলেও তাঁরা দাবি তুলেছেন।
শনিবার আন্দোলনকারীদের সংগঠন ‘জেপিএসসি-জেএসএসসি রিফর্মস মঞ্চ’-এর মুখপাত্র পীযূষ সিংহ এই কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেন। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও সরকারের সর্বোচ্চ স্তরে কোনও দায় নির্ধারণ করা হয়নি। তাই আন্দোলনের এই পর্যায়ে এসে মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তোলা হচ্ছে।
পীযূষ বলেন, “এই প্রথম আমরা মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছি। পরীক্ষায় একের পর এক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। এখন শুধু তদন্তের আশ্বাস দিলে চলবে না। এই অনিয়মের জন্য কারা দায়ী, তা নির্ধারণ করার সময় এসেছে।”
টানা ২২ দিনের আন্দোলন
ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন সরকারি পদে নিয়োগের পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস, ফল প্রকাশে অস্বচ্ছতা এবং প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে চাকরিপ্রার্থীরা অনির্দিষ্টকালের আন্দোলন শুরু করেছিলেন। শনিবার সেই আন্দোলন ২২ দিনে পড়ে। এত দিন ধরে অবস্থান চালিয়েও দাবি পূরণ না হওয়ায় আন্দোলনকারীরা এবার সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাওয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
শনিবার চাকরিপ্রার্থীরা একটি ‘তিরঙ্গা যাত্রা’ও বের করেন। জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে আন্দোলনকারীরা দাবি জানান, নিয়োগব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে এবং যোগ্য প্রার্থীদের প্রতি অবিচার বন্ধ করতে হবে। তাঁদের বক্তব্য, এটি কেবল কয়েকজন পরীক্ষার্থীর চাকরি পাওয়ার আন্দোলন নয়; ঝাড়খণ্ডের নিয়োগব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার লড়াই।
তিরঙ্গা যাত্রাকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে উত্তেজনাও তৈরি হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে পুলিশ। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
প্রশ্নের মুখে নিয়োগব্যবস্থা
ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের অধীনে হওয়া একাধিক পরীক্ষা নিয়ে গত কয়েক বছরে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। কোথাও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে, কোথাও ফল প্রকাশ এবং প্রার্থী বাছাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন চাকরিপ্রার্থীরা। কয়েকটি পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় বহু প্রার্থীর দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। যে সব আধিকারিক, কমিশনের সদস্য অথবা অন্য কোনও ব্যক্তি দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিতর্কিত পরীক্ষাগুলির ফল এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া নতুন করে পর্যালোচনা করার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
চাকরিপ্রার্থীদের বক্তব্য, রাজ্য সরকার আলোচনা এবং তদন্তের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে নিয়োগব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলির সমাধান হয়নি। ফলে বারবার একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসছে। তাঁদের মতে, সরকারের সদিচ্ছা থাকলে পরীক্ষার প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল।
কেন মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি
এত দিন আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা বাতিল, কমিশনের সংস্কার এবং অনিয়মের তদন্ত। মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তোলার মাধ্যমে আন্দোলনটি এবার স্পষ্ট রাজনৈতিক মাত্রা পেল। আন্দোলনকারীদের যুক্তি, রাজ্যের নিয়োগব্যবস্থায় ধারাবাহিক ব্যর্থতার দায় প্রশাসনের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এড়াতে পারে না।
পীযূষ সিংহের কথায়, ছোট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বা তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সরকারি নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর জীবনকে প্রভাবিত করেছে। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
আন্দোলনকারীরা আরও জানিয়েছেন, ২০ আগস্টের কর্মসূচিতে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে চাকরিপ্রার্থীরা রাঁচিতে আসবেন। মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও শান্তিপূর্ণ রাখা হবে বলে সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে প্রশাসন বাধা দিলে তার দায় সরকারকেই নিতে হবে বলে তাঁদের হুঁশিয়ারি।
সরকারের উপর বাড়ছে চাপ
দীর্ঘদিন ধরে চলা আন্দোলন ইতিমধ্যেই ঝাড়খণ্ড সরকারের অস্বস্তি বাড়িয়েছে। কয়েক দফায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারি প্রতিনিধিদের আলোচনা হলেও স্থায়ী সমাধানসূত্র মেলেনি। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু দাবি বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হলেও চাকরিপ্রার্থীরা লিখিত এবং সময়বদ্ধ প্রতিশ্রুতি চাইছেন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রতিবার আন্দোলন তীব্র হলে সরকার আলোচনার ডাক দেয়, কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় না। এই অভিজ্ঞতার কারণেই তাঁরা এবার আশ্বাসের পরিবর্তে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দাবি করছেন।
২০ আগস্টের ঘেরাও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাঁচিতে নিরাপত্তা বাড়ানো হতে পারে। মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের আশপাশে জমায়েত নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বিশেষ ব্যবস্থা নিতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, গণতান্ত্রিক উপায়ে সরকারের কাছে নিজেদের বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার অধিকার তাঁদের রয়েছে।
ঝাড়খণ্ডের এই আন্দোলনের পরবর্তী পর্ব এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করবে, নাকি প্রশাসনিক কঠোরতার পথে হাঁটবে—তার উপর ২০ আগস্টের কর্মসূচির গতিপ্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করবে। তবে মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তুলে চাকরিপ্রার্থীরা বুঝিয়ে দিয়েছেন, নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে তাঁদের আন্দোলন আর শুধু কমিশনের সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই; তা এখন সরকারের রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্নে পৌঁছে গিয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



