Table of Contents
হাইলাইটস:
- আন্দোলনের ময়দানে লাঠিচার্জ, ধস্তাধস্তি ও ব্যাপক বিশৃঙ্খলার মধ্যে আহত বহু ছাত্রছাত্রী।
- হাসপাতালের বাইরে সন্তানের অপেক্ষায় উদ্বিগ্ন পরিবারগুলির দীর্ঘ প্রতীক্ষা।
- এক মায়ের আর্তনাদ—“দেশের সন্তানদের উপর এভাবে হামলা কেন?”
- রাস্তায় পড়ে থাকা ব্যাগ, ছেঁড়া প্ল্যাকার্ড, রক্তমাখা জামা—সহিংস দিনের নীরব সাক্ষী।
- ছাত্রদের দাবি, পুলিশ অযথা বলপ্রয়োগ করেছে; পুলিশের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ন্যূনতম শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে।
বাংলাস্ফিয়ার: দিল্লির দুপুরটা শুরু হয়েছিল স্লোগানে। শেষ হল কান্নায়।
যেখানে কয়েক ঘণ্টা আগেও হাজার হাজার তরুণ-তরুণী শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, পরীক্ষায় অনিয়মের তদন্ত এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে কণ্ঠ মিলিয়েছিল, সন্ধ্যা নামার আগেই সেই জায়গা ভরে গেল অ্যাম্বুল্যান্সের সাইরেন, পুলিশের ব্যারিকেড আর উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের ছুটে বেড়ানোয়।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বাইরে এক মা ভেঙে পড়ে বারবার বলছিলেন, “ও তো শুধু পড়াশোনা করতে চেয়েছিল। ও কি অপরাধ করেছে? দেশের সন্তানদের উপর এভাবে হামলা হয়?”
তার ছেলের মাথায় ব্যান্ডেজ। জামার হাতা ছিঁড়ে গেছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, আঘাত গুরুতর নয়। কিন্তু মায়ের চোখে সেই আশ্বাস পৌঁছয় না। তিনি শুধু সন্তানের কপালে হাত রেখে কাঁদছেন।
মাঠ থেকে হাসপাতাল
বিক্ষোভ যখন তুঙ্গে, তখন হঠাৎই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। সামনের সারিতে থাকা ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। কেউ দৌড়ে পালাচ্ছে, কেউ মাটিতে পড়ে যাচ্ছে, কেউ আবার আহত বন্ধুকে কাঁধে তুলে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে জলের বোতল, বই, মোবাইল ফোন, ব্যাকপ্যাক, ছেঁড়া পোস্টার। অনেকেই পরে ফিরে এসে নিজের জিনিস খুঁজে পাননি।
এক ছাত্রের সাদা টি-শার্টে লাল দাগ। বন্ধু তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আরেকজনের চশমা ভেঙে রাস্তার ধারে পড়ে আছে। কেউ মোবাইলে বাড়িতে ফোন করে শুধু বলছে, “আমি ঠিক আছি… চিন্তা করো না।” কণ্ঠস্বরেই ধরা পড়ছে আতঙ্ক।
অভিভাবকদের দীর্ঘ অপেক্ষা
সন্ধ্যার পর হাসপাতালের বাইরে ভিড় বাড়তে থাকে। অনেকেই জানেন না তাঁদের ছেলে বা মেয়ে কোন হাসপাতালে আছে। কেউ সামাজিক মাধ্যমে ছবি দেখে খোঁজ করছেন। কেউ পুলিশকে নাম বলছেন। কেউ চিকিৎসকদের কাছে অনুরোধ করছেন, “একবার শুধু দেখতে দিন।”
এক বাবা ছেলের হাত শক্ত করে ধরে বসে ছিলেন। বললেন, “ও প্রথমবার কোনও আন্দোলনে গিয়েছিল। আমি ভাবিনি এভাবে ফিরবে।”
পাশেই আরেক মা বারবার জল খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন আহত মেয়েকে। মেয়েটি বলছে, “আমি ঠিক আছি।” কিন্তু মায়ের হাত কাঁপছে।
যারা আহত হয়েও ফিরতে চাননি
অনেক ছাত্র চিকিৎসার পরেও হাসপাতাল ছাড়তে চাইছিলেন না, কারণ তাঁদের বন্ধুদের খবর তখনও অজানা।
একজন বললেন, “আমাদের অনেককে আলাদা করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সবাই ফিরেছে কি না, না জেনে বাড়ি যাব না।”
কেউ ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতেই ফোনে তালিকা তৈরি করছেন—কে কোথায় ভর্তি, কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, কার এখনও খোঁজ নেই।
নীরব সাক্ষী সেই রাস্তা
বিক্ষোভ শেষ হওয়ার বহু পরে ঘটনাস্থলে রয়ে যায় দিনের স্মৃতি।
উল্টে থাকা ব্যারিকেড।
মাটিতে পড়ে থাকা জুতো।
ছেঁড়া ব্যানার।
ভাঙা চশমা।
রক্তের ছোট ছোট দাগ, যা জল ঢেলেও পুরোপুরি মুছে যায়নি।
যে রাস্তায় কয়েক ঘণ্টা আগে হাজারো কণ্ঠ একসঙ্গে স্লোগান তুলেছিল, সেখানে তখন শুধু পুলিশের গাড়ির শব্দ আর পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ঝাঁটার আওয়াজ।
দুই ভিন্ন বয়ান
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ করা হয়েছে এবং বহু ছাত্রকে মারধর করা হয়েছে।
অন্যদিকে দিল্লি পুলিশের দাবি, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। বিক্ষোভকারীদের একাংশ আক্রমণাত্মক আচরণ করায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এই দুই বয়ানের মাঝখানে রয়ে গিয়েছে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা তরুণ মুখগুলো এবং তাঁদের উদ্বিগ্ন পরিবার।
একটি দিনের প্রতীক
দিন শেষে এই আন্দোলনের রাজনৈতিক ফলাফল যা-ই হোক, রাজধানীর সেই দিনটি বহু পরিবারের স্মৃতিতে থেকে যাবে অন্যভাবে।
একজন মায়ের কান্না, যিনি ছেলের ব্যান্ডেজে হাত বুলিয়ে বলছিলেন, “ও তো দেশের বিরুদ্ধে নয়, নিজের ভবিষ্যতের জন্য রাস্তায় নেমেছিল।”
আরেক বাবা সন্তানের কাঁধে হাত রেখে ধীরে ধীরে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসছিলেন। তাঁর মুখে কোনও স্লোগান ছিল না। ছিল শুধু ক্লান্তি, উদ্বেগ এবং একটি প্রশ্ন—একটি গণতান্ত্রিক দেশে নিজের দাবি জানাতে এসে কেন এত তরুণকে হাসপাতালে যেতে হল?
দিল্লির রাস্তায় যুবসমাজের বিস্ফোরণ: আলোচনায় বাধ্য হল কেন্দ্র